রাণীনগরে চলছে সার সিন্ডিকেটের নৈরাজ্য

রাণীনগর (নওগাঁ) প্রতিনিধি

সারাবাংলা

খাদ্য উদ্বৃত্ত কৃষি প্রধান নওগাঁ জেলা দেশের সিংহভাগ চালের জোগান দিয়ে থাকে। ধান উৎপাদনে শীর্ষে থাকা এ জেলার

2026-02-02T15:06:11+00:00
2026-02-02T15:06:11+00:00
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬ ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬
   
রাণীনগরে চলছে সার সিন্ডিকেটের নৈরাজ্য
রাণীনগর (নওগাঁ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৩:০৬ পিএম   (ভিজিট : ২৮৪)
X

খাদ্য উদ্বৃত্ত কৃষি প্রধান নওগাঁ জেলা দেশের সিংহভাগ চালের জোগান দিয়ে থাকে। ধান উৎপাদনে শীর্ষে থাকা এ জেলার ১১টি উপজেলা জুড়ে এখন চলছে ইরি-বোরো আবাদের মৌসুম। তাই ফসল ফলাতে এখন বেশি প্রয়োজন রাসায়নিক সার।

অথচ ইরি-বোরো কিংবা আমন এই দুই মৌসুম এলেই জেলা জুড়ে শুরু হয় ব্যবসায়ীদের সার সিন্ডিকেটের নৈরাজ্য। সারের অবৈধ মজুদ করে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে কৃষকের পকেট কাটতে ব্যস্ত হয়ে যায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী।

তেমনি নওগাঁর একটি উপজেলা রানীনগর। এ উপজেলায় সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বস্তা প্রতি দুই’শ থেকে আড়াই’শ টাকা অতিরিক্ত দামে কিনতে হচ্ছে রাসায়নিক সার।

কৃষক, স্থানীয় সচেতন ব্যক্তি ও খুচরা ব্যবসায়ীর অভিযোগ, ডিলাররা সার মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন এবং বেশি লাভের আশায় নির্দিষ্ট এরিয়ার বাহিরে বিক্রি করছে। ফলে মৌসুমের শুরুতেই সিন্ডিকেটের কবলে পড়তে হচ্ছে তাদের।

তবে ব্যবসায়ীদের দাবি চাহিদার তুলনায় রাসায়নিক সারের আমদানি কম এবং বাইরে থেকে সার কেনার ফলে দাম কিছুটা বেশি রাখতে হচ্ছে। অথচ কৃষি অফিস বলছে চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্ধ ঠিকঠাক রয়েছে। সারের কোন ঘাটতি নেই। আর কেউ অনিয়ম করলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। 

এদিকে শ্রমিক সংকটে বাড়তি মজুরি গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। কাজেই মৌসুমের শুরুতেই বাড়তি খরচে পড়তে হচ্ছে কৃষকদের।

এদিকে সম্প্রতি অবৈধভাবে চার'শ বস্তা সার কিনে মজুদ করছিল উপজেলার আবাদপুকুর বাজারের আকরাম নামের এক ব্যবসায়ী। বিষয়টি কৃষি অফিস জানার পরও ঘটনার দিন নেওয়া হয়নি কোন ব্যবস্থা। পরের দিন নেওয়া হয়েছে দায়সারা পদক্ষেপ। যেখানে এখনও অজানা রয়েছে সেদিনের সেই চার'শ বস্তুা সার গেল কোথায়?

অপরদিকে আকরামের বিরুদ্ধে কৃষি অফিস থেকে নেওয়া পদক্ষেপের কারণে ক্ষিপ্ত তিনি। তাই আকরামসহ সাবেক এক জনপ্রতিনিধি ক্ষোভ নিয়ে জানালেন- এলাকায় এমন অনেক বিসিআইসি ও বিএডিসির ডিলার আছে, যাদের গোডাউন একজায়গায় আর সার বিক্রি করছে আরেক জায়গায়। যে জায়গার নাম করে ডিলার নিয়েছে সেই এলাকার লোকজন সার পাচ্ছে না। এমনকি কৃষি অফিসার জাহিদ অনেক গোডাউন চিনেন না অভিযোগের সুরে বলেন তারা। 

এছাড়া বেশি দামে সার বিক্রি তো ওপেন সিক্রেট। আছে কৃত্রিম সংকট। এখানে এমন অনেক ব্যবসায়ী আছে, যাদের সার বিক্রির বৈধ কোনো কাগজ নেই, অথচ তাদের ঘরে শত শত বস্তা সার মজুদ থাকে। যেগুলো চোখে দেখতে পায় না কৃষি অফিসার। সরেজমিনে উপজেলার আবাদপুকুর বাজারসহ আশেপাশে এমনই অনেক সার ব্যবসায়ীর দোকান দেখা যায়। 

উপজেলার মাঝগ্রাম এলাকার রানা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী রানা জানালেন তিনি কীটনাশক বিক্রি করেন। তিনি কোন সারের ডিলার না। প্রয়োজনে ১০-২০ বস্তা করে সার বিক্রি করেন। সরল স্বীকারোক্তি হিসেবে তিনি বলেন- বিসিআইসির দোকান থেকে সার কিনে থাকেন। ডিএপি সার সেই দোকান থেকে কিনতে হয়েছে বস্তা প্রতি ১৩০০ টাকায়, ইউরিয়া ১৩২০-৩০ এবং টিএসপি ১৬০০ টাকায়। বস্তা প্রতি ২০০ টাকা বেশি। এর মধ্যে সারগুলো নিয়ে আসতে ভাড়া লাগে। আবার আমাকেও বস্তা প্রতি ৫০টাকা লাভ তো করতেই হবে। এছাড়া মাঝে মাঝে ডিএপি ও টিএসপি ২০০০-২২০০ টাকায়ও কিনতে হয় ভাই।

মালশন গ্রামের তানভীর নামের এক কৃষক জানালেন, ডিলারের কাছ থেকে সরকারি রেটে সার কেনার জন্য কৃষি অফিসে সুপারিশ নিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু প্রথমে কোনো গুরুত্বই দেয়নি। পরে পরিচয় দেওয়ার পর আইডি কার্ড দিয়ে কিছু সার নিতে পেরেছি। 

তিনি বলেন, এলাকায় কৃষকেরা অনেক বেশি দামে সার কিনছে। এরকম শতশত প্রমাণ আছে আমার কাছে। আমাদের এলাকার সাইদুর রহমান নামের এক কৃষক ডিএপি কিনেছে ১৩৫০ টাকায় এবং টিএসপি কিনেছে ১৬০০ টাকায়। আরেক কৃষক উজ্জ্বল সরকারও বেশি দামে কিনেছে। 

সম্মতি জানিয়ে কৃষক উজ্জ্বল সরকার বলেন, আমি কিছু টাকা দিয়ে বাঁকিতে ৬ বস্তা ডিএপি সার কিনেছি। দাম ধরা হয়েছে প্রতি বস্তা ১৩৫০ টাকা করে। বাঁকি নেওয়ার কারণে হয়তো বেশি নিতে পারে। 

উপজেলার সুজন নামের এক কৃষক আক্ষেপ নিয়ে বলেন- প্রতিবছর ধান লাগানোর মৌসুম আসলেই সারের বড় বড় ডিলাররা একটা পাঁয়তারা শুরু করে। তারা গোডাউনে সার রেখে তালা মেরে বলে সার নাই, সারের সংকট। তখন আমাদেরকে বেশি দামে সার কেনা লাগে। এতে করে আমাদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

আবাদপুকুরের কৃষক নুরুল ইসলাম বলেন- কৃষি অফিসের যোগসাজশে ডিলাররা প্রতি মৌসুমে একটা সারের সিন্ডিকেট তৈরি করে। যার ফলে সরকারি রেটে আমারা সার পাইনা, বস্তা প্রতি ১শ-২শ টাকা দাম বেশি দিয়ে ঘুরে ঘুরে সার কিনতে হয়। কৃষি অফিসাররা ঠিকমত বাজার মনিটরিং করেনা। এতে আমাদের ভোগান্তি বাড়ে, দ্রুত এ বিষয়ে পদক্ষেপ কামনা করছি।

অভিযোগ রয়েছে উপজেলায় অবস্থিত একাধিক বিএডিসি ও বিসিআইসির ডিলাররা অধিক মুনাফার লোভে নির্দিষ্ট এলাকা ব্যতীত অন্য এলাকায় সার বিক্রি করছে। এমনকি একেকজনের একাধিক ডিলার আছে। 

জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিসিআইসির এক সার ডিলার কোন মন্তব্য করতে রাজি না। তবে গল্পের ছলে তিনি বলেন, সরকারি বরাদ্দ দিয়ে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব না। তাই কৃষি অফিসের সাথে সমন্বয় করে নওগাঁসহ একাধিক জায়গা থেকে অতিরিক্ত সার কেনা হয়। সেক্ষেত্রে বেশি দামে কিনলেও তিনি কিছু বলতে রাজি না। এতে সরকারের বিপক্ষে যাবে বলে মন্তব্য করেন। তবে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে না বলে জানালেন তিনি। আর খুচরা ব্যাবসায়ীদের কাছে অল্প করে বিক্রি করা হয় বলে স্বীকার করেন তিনি।

একইভাবে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি না রাণীনগর উপজেলা সার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ছাত্তার শাহ। তবে তিনিও স্বীকার করলেন চাহিদার তুলনায় আমদানি কম। তাই নোয়াপাড়াসহ একাধিক জায়গা থেকে বেশি দামে সার  কিনতে হচ্ছে। আর এক জায়গার ব্যবসায়ী হয়ে অন্য জায়গায় সার বিক্রি করার নিয়ম নেই। এছাড়া কেউ অবৈধভাবে মজুদ রাখতে পারবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে- চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১৮ হাজার ৭৯০ হেক্টর জমিতে ইরিবোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে চাহিদা ছিল ডিএপি সার ২৮০০ মে:টন, এমওপি ২২০০ মে:টন, টিএসপি ১৪০০ মে:টন ও ইউরিয়া ২৯০০ মে:টন। তবে বোরোকে টার্গেট করে তিন দফায় রাসায়নিক সারের বরাদ্দ আসে।

আর চাহিদা মতো সার পাওয়া যায় বলে দায়সারা জবাব দিলেন কৃষি কর্মকর্তা জাহিদ ও মোস্তাকিমা খাতুন। 

জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমাদের রানীনগর উপজেলার বিসিআইসি এবং বিএডিসি যত ডিলার আছে সবার ঘরে গিয়ে আমরা প্রতিমাসে পরিদর্শন করে আসি। আর আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তা সম্পূর্ন মিথ্যা। এছাড়া অভিযোগ পাওয়া মাত্রই জরিমানাসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। 

উপজেলা কৃষি অফিসার মোস্তাকিমা খাতুন বলেন, রানীনগরে সারের কোন সংকট নাই। ডিলাররা চাহিদা মত সার পাচ্ছে। আমরা নিয়মিত বাজার মনিটরিং করি। যদি কেউ বেশি দামে সার বিক্রি করে বা মজুদ রাখে আমাদের জানালে আমরা ব্যবস্থা নিবো।

তবে এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায় বিক্রি হচ্ছে সার এমন প্রশ্নে তিনি কোন বক্তব্য দিতে চাননা জানিয়ে বলেন, আপনারা বিষয়টা এত জটিল কেন করছেন আমি বুঝতেছিনা। আপনারা তো জানেন সার কিভাবে কেনা বেচা হচ্ছে। যেভাবেই হোক কৃষকরা সার পাচ্ছে এটা কৃষকদের উপকার। কিন্তু এই সিন্ডিকেটের কারনে কৃষকদের বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে এমন প্রশ্নেও তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।





Loading...
Loading...


সারাবাংলা এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy