
X
সংগৃহীত ছবি
কম খরচে অধিক লাভ হওয়ায় পিরোজপুরের জিয়ানগরে দিন দিন বাড়ছে কুল চাষের জনপ্রিয়তা। অনুকূল মাটি ও আবহাওয়ার কারণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে কুল চাষ ছড়িয়ে পড়েছে।
অল্প খরচে ভালো ফলন এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকেরা অন্য ফলের তুলনায় কুল চাষে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
জানা গেছে, পিরোজপুর জেলার জিয়ানগর উপজেলার পত্তাশী গ্রামে কৃষির চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় যেখানে কৃষকেরা মূলত ধান ও কলা চাষের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন, সেখানে গত কয়েক বছরে কুল চাষ হয়ে উঠেছে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত। বর্তমানে গ্রাম ও আশপাশের এলাকায় শতাধিক কুল বাগান গড়ে উঠেছে। লাভের সম্ভাবনার পাশাপাশি এই খাতে পরিকল্পনা ও সরকারি সহায়তা নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে।
এই এলাকায় বর্তমানে আপেল কুল, বল সুন্দরী, থাই ও বাউ কুল জাতের কুল চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে বল সুন্দরী ও আপেল কুল বাজারে বেশি দামে বিক্রি হওয়ায় এসব জাতেই ঝুঁকছেন কৃষকেরা। বর্তমানে বাগান থেকে প্রতি কেজি কুল ৯০ থেকে ১১০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় বাজারে এই কুলের বেশ সুনাম রয়েছে। এখানকার কুল ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বড় বাজারেও সরবরাহ করা হচ্ছে।
তবে মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে, অনেক কৃষক নিজ উদ্যোগে কুল চাষ শুরু করলেও সরকারি প্রশিক্ষণ বা কৃষি বিভাগের নিয়মিত তদারকি তুলনামূলক কম। কীটনাশক ও সার ব্যবহারে সঠিক নির্দেশনার অভাবে কোথাও কোথাও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। কৃষকেরা বলছেন, প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে কৃষিঋণ পেলে তারা আরও বেশি বাগান সম্প্রসারণ করতে পারবেন।
কৃষক শাহ আলম হাওলাদার বলেন, “খুলনা থেকে কুলের চারা এনে প্রায় ১১ বছর ধরে কুল চাষ করছি। আল্লাহর রহমতে ভালো ফলন হচ্ছে। মাত্র ৪ কাঠা জমিতে কুল চাষ করেছি। এ মৌসুমে প্রায় ১ লাখ টাকার বেশি কুল বিক্রি হবে বলে আশা করছি।”
আরেক চাষি মো. জুয়েল হাওলাদার বলেন, “কুল চাষ ভালোভাবে করতে পারলে লাভ ভালো হয়। তবে ঝড় হলে ক্ষতি হয়। আমাদের এলাকায় প্রায় ১২টি কুল বাগান রয়েছে। অন্যদের সফলতা দেখে আমি ৩ কাঠা জমিতে চাষ শুরু করেছি। এবার আরও ৫ কাঠা জমিতে কুলের বাগান করবো।”
চাষি মনির হাওলাদার বলেন, “আমি প্রথমে জমি প্রস্তুত করে খুলনার পাইকগাছা থেকে চারা এনে রোপণ করেছি। প্রায় ৩ কাঠা জমিতে বাউ কুল চাষ করেছি। এ মৌসুমে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার কুল বিক্রি হবে বলে আশা করছি। আগামীতে বল সুন্দরী জাতের কুলের বাগান করার পরিকল্পনা রয়েছে।”
অসুস্থ কৃষক বেলায়েত বলেন, “অনেক বছর ধরে কুল চাষ করছি। কিন্তু এখন অসুস্থ হয়ে পড়েছি। চিকিৎসায় প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। এখন সার কিনবো নাকি ওষুধ কিনবো—সেই চিন্তায় আছি। কৃষির জন্য কোনো সহযোগিতা পাইনি।”
কৃষকেরা জানান, সরকার সহজ শর্তে কৃষিঋণ দিলে তারা আরও বেশি বাগান করতে পারবেন এবং উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হবেন।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধান চাষে উৎপাদন খরচ বেশি হলেও লাভ তুলনামূলক কম। অন্যদিকে কুল চাষে একবার বাগান গড়ে তুললে কয়েক বছর ফলন পাওয়া যায়, ফলে ঝুঁকি কম এবং লাভ বেশি। তবে আধুনিক চাষপদ্ধতি সম্পর্কে অনেক কৃষকের পর্যাপ্ত ধারণা নেই বলেও তারা জানান।
পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার বলেন, “জেলায় বিচ্ছিন্নভাবে প্রায় ১৪৭ থেকে ১৬০ হেক্টর জমিতে কুল চাষ হয় এবং বছরে প্রায় ১ হাজার ৩২১ মেট্রিক টন কুল উৎপাদন হয়। প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ কৃষক সরাসরি এই চাষের সঙ্গে যুক্ত। এতে প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। কৃষকদের আমরা নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছি এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও মাঠ দিবসের মাধ্যমে কুল চাষে উদ্বুদ্ধ করছি।”
তিনি আরও বলেন, “অন্যান্য ফসলের তুলনায় কুল চাষে কৃষকেরা বেশি লাভবান হচ্ছেন। সুস্বাদু হওয়ায় বাজারেও এর চাহিদা বাড়ছে।”
তবে কৃষকেরা দাবি করেছেন, সরকারি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ আরও জোরদার করা হলে জিয়ানগরে কুল চাষ আরও বিস্তৃত হবে এবং কৃষকের আয় বাড়বে।