রেলের রক্ষকই ভক্ষকের ভূমিকায়, হাবিলদার পংকজের নিয়ন্ত্রণে এসআরবি স্টেশন

​সায়মুন শেখ, চট্টগ্রাম

সারাবাংলা

চট্টগ্রাম নগরীর বাংলাবাজার এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক এসআরবি রেলওয়ে স্টেশনটি এখন কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ, বাস্তবে এর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে

2026-03-11T14:26:40+00:00
2026-03-11T14:26:40+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
রেলের রক্ষকই ভক্ষকের ভূমিকায়, হাবিলদার পংকজের নিয়ন্ত্রণে এসআরবি স্টেশন
​সায়মুন শেখ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: বুধবার, ১১ মার্চ, ২০২৬, ২:২৬ পিএম   (ভিজিট : ৮৬৬)
সংগৃহীত ছবি
X

সংগৃহীত ছবি

চট্টগ্রাম নগরীর বাংলাবাজার এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক এসআরবি রেলওয়ে স্টেশনটি এখন কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ, বাস্তবে এর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে দখলদারদের কালো থাবায়। ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত এই স্টেশনটি একসময় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি হওয়া পাথর, সার ও ভারী যন্ত্রপাতি পরিবহনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল। 

অথচ যেখানে ট্রেনের শব্দ আর যাত্রীদের কোলাহল থাকার কথা, সেখানে এখন দিনরাত চলে ট্রাকের গর্জন আর অবৈধ ব্যবসার রমরমা কারবার। পরিত্যক্ত হওয়ার সুযোগ নিয়ে স্টেশনটিকে এখন পুরোপুরি একটি অবৈধ ট্রাক স্ট্যান্ডে রূপান্তর করা হয়েছে। চট্টগ্রাম স্টেশন থেকে মাদারবাড়ী মুখে রেললাইন হয়ে হালিশহর সিজিপিওয়াই ইয়ার্ডের সাথে যুক্ত এই গুরুত্বপূর্ণ রুটটি এখন প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের দখলে। বারবার উচ্ছেদ অভিযানের কথা শোনা গেলেও কোনো এক অদৃশ্য কারণে তা বারবার থমকে যায়। অভিযোগের আঙুল সরাসরি উঠেছে স্টেশনের নিরাপত্তায় নিয়োজিত রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর পোস্টিং হাবিলদার পংকজ রায়ের দিকে। 

একজন নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে যেখানে রেলওয়ের রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করার কথা, সেখানে পংকজ রায়ের প্রত্যক্ষ মদদে স্টেশনের ভেতরে গড়ে উঠেছে গাড়ির গ্যারেজ, ভাঙ্গারির দোকান, লেদ কারখানা ও ওয়ার্কশপ।

​স্টেশন এলাকায় সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মূল গেটটি ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং প্ল্যাটফর্মের ওপর দখলদাররা সারি সারি ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান পার্ক করে রেখেছে। বাইরে থেকে দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই যে এটি একটি সরকারি রেলওয়ে স্টেশন। অনুসন্ধানে জানা যায়, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী ও মাঝির ঘাট ট্রাক পরিবহন মালিক সমিতির নাম ভাঙিয়ে এখানে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে।

 এই সিন্ডিকেট প্রতিটি ট্রাক থেকে প্রতি মাসে সাড়ে ৩ হাজার টাকা করে প্রায় ৩৫০টি গাড়ি থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। পার্কিং ও মেরামতের গ্যারেজ থেকে বছরে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয়, যার একটি বড় অংশ চলে যায় পংকজ রায়সহ সংশ্লিষ্ট অসাধু কর্মকর্তাদের পকেটে। 

অভিযোগ রয়েছে, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা বাহিনীর চিফ কমান্ড্যান্ট জহিরুল ইসলাম, কমান্ড্যান্ট শহিদুল ইসলাম, সিজিপিওয়াই ইয়ার্ডের মৌখিক দায়িত্বপ্রাপ্ত সিআই আবু সুফিয়ান এবং স্টেশন মাস্টার সৈকত নাথ নিয়মিত মাসিক মাসোহারা হিসেবে একটি নির্দিষ্ট অংশ গ্রহণের মাধ্যমে এই অবৈধ দখল বাণিজ্যকে টিকিয়ে রেখেছেন। সচেতন মহলের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নীরব সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই সিন্ডিকেটটি দীর্ঘদিন ধরে কোনো বাধা ছাড়াই এই কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছে।

শুধু তাই নয়, স্টেশনে থাকা ট্রেনের বগি, চাকা ও বিভিন্ন মূল্যবান লোহার সরঞ্জাম প্রতিদিন একটু একটু করে চুরি হয়ে যাচ্ছে, যার নেপথ্যেও পংকজ রায়ের হাত রয়েছে বলে দাবি করেন স্থানীয়রা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ওয়ার্কশপ কর্মী জানান, এখানে ব্যবসা করতে হলে শুরুতেই মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয় এবং প্রতি মাসে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা ভাড়া পরিশোধ করতে হয়। এমনকি রেলওয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পরিদর্শনে আসার খবরও পংকজ রায় ও তার সহযোগীরা আগেভাগেই সিন্ডিকেটকে পৌঁছে দেন, যাতে তারা সাময়িকভাবে ট্রাক সরিয়ে নিতে পারে।

​হাবিলদার পংকজ রায়ের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাউজানের সাবেক এমপি ফজলে করিমের দাপট দেখিয়ে সহকর্মী ও উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হুমকি-ধমকি দিয়ে নিজের প্রভাব বিস্তার করতেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজেকে আড়াল করতে তিনি এসআরবি স্টেশনকে বেছে নিলেও তার অপকর্ম থামেনি। 

সেখানে মাদক কেনাবেচা এবং চোর চক্রের সাথে তার গভীর সখ্যতা রয়েছে বলে জানা গেছে। স্টেশনের সীমানার ভেতর গড়ে তোলা হয়েছে পোড়া তেলের আড়ত ও স্ক্র্যাপের দোকান, যা পুরো এলাকাটিকে একটি বাণিজ্যিক বস্তিতে পরিণত করেছে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পংকজ রায় বাংলাদেশ বুলেটিনকে বলেন, আমি চাঁদাবাজি বা দখলবাজির সাথে যুক্ত নই। আমাকে নিয়ে একটি মহল ষড়যন্ত্র করছে, আমি বিভিন্ন দপ্তরে বাউন্ডারী ওয়াল নিমার্ণ সহ বিভিন্ন সমস্যার জন্য উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি দিলেও কোন স্থায়ী সমাধান পাইনি। 
এ বিষয়ে জানতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তার মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। 

রেলের শত শত কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ এভাবে অরক্ষিত পড়ে থাকলেও রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি বিভাগ ও নিরাপত্তা বাহিনীর নীরবতা জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। রক্ষক যখন ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন রাষ্ট্রীয় সম্পদের নিরাপত্তা যে কতটা ঠুনকো হতে পারে, এসআরবি স্টেশন তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ। এই বিশাল লুটপাট ও দখল বাণিজ্য বন্ধ করতে অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।





Loading...
Loading...


সারাবাংলা এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy