প্রকাশ: সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:১৩ এএম আপডেট: ২০.০৪.২০২৬ ১১:১৭ এএম (ভিজিট : ৭৩)

X
কেরানীগঞ্জে ‘মৃত্যুফাঁদ’ রাসায়নিক গুদাম: বারবার প্রাণহানি, নেই কার্যকর পদক্ষেপ
ঢাকার অদূরের কেরানীগঞ্জ—রাজধানীর চাপ কমাতে গড়ে ওঠা এই অঞ্চল এখন যেন নীরব এক ‘মৃত্যুফাঁদে’ পরিণত হয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় গড়ে ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক গুদাম ও অনুমোদনহীন কারখানার কারণে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারাচ্ছেন শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ। তবে বারবার এমন মর্মান্তিক ঘটনার পরও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।
সর্বশেষ গত ৪ এপ্রিল কদমতলী আমবাগিচা বাজার সড়কে আবাসিক এলাকায় অবস্থিত ‘এসআর গ্যাস প্রো’ নামের একটি লাইটার তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ছয় শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এর আগে চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি গদাবাগ নিউ টাউন এলাকায় আগুনে পুড়ে মারা যান এক শ্রমিক।
এরও আগে ২০২৩ সালের ১৫ আগস্ট গদাবাগ এলাকায় বসতবাড়িতে আগুন লেগে একই পরিবারের পাঁচজন নিহত হন। স্থানীয়দের অভিযোগ, আশপাশের অবৈধ রাসায়নিক গুদাম থেকেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ২০১৯ সালের এপ্রিলে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া হিজলতলা এলাকায় ‘প্রাইম এন্ড পেট’ কারখানায় আগুনে পুড়ে মারা যান ২২ শ্রমিক। সেই ঘটনার পর দেশজুড়ে তোলপাড় হলেও বাস্তবে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি।
২০২০ সালের জানুয়ারিতে জিনজিরার বন্দ ডাকপাড়া এলাকায় রাসায়নিক গুদামে বিস্ফোরণে পুরো ভবন ধসে পড়ে। আশপাশের বাড়িঘর ও ধর্মীয় স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও ভাগ্যক্রমে প্রাণহানি ঘটেনি।
সরেজমিনে উপজেলার আতাসুর ও গদারবাগ এলাকায় দেখা যায়, বাইরে তালা ঝুলিয়ে ‘গোডাউন ভাড়া’ লেখা সাইনবোর্ড থাকলেও ভেতরে গড়ে তোলা হয়েছে রাসায়নিক গুদাম। দাহ্য পদার্থ মজুদ রাখা হচ্ছে কোনো নিরাপত্তা ছাড়াই।
স্থানীয়দের দাবি, কেরানীগঞ্জের ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে কালিন্দি ইউনিয়নের আতাসুর ও গদারবাগ এলাকাতেই সবচেয়ে বেশি রাসায়নিক গুদাম গড়ে উঠেছে। কয়েকশ’ ছোট-বড় গুদাম ও কারখানার বেশিরভাগই অনুমোদনহীন।
গদারবাগ এলাকার বাসিন্দা খোকন আহমেদ বলেন, দুর্ঘটনা ঘটলেই প্রশাসন কিছুদিন তৎপর থাকে, পরে সব আগের মতো হয়ে যায়। মালিকরা উপজেলা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে রাজনৈতিক দলের প্রভাব খাটিয়ে আবার ব্যবসা চালু করে।
আরেক বাসিন্দা সেলিম জানান, কেরানীগঞ্জ এখন আগুনের ঝুঁকিতে ভরা। অধিকাংশ গুদামের কোনো অনুমতি নেই, নেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা। রাজধানীর পুরান ঢাকার নিমতলী ও চকবাজার ট্র্যাজেডির পর রাসায়নিক গুদাম সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি। অস্থায়ী গুদাম প্রকল্প এখন প্রায় পরিত্যক্ত, আর বহু প্রতীক্ষিত কেরানীগঞ্জ উপজেলা রাসায়নিক শিল্পপার্ক এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে ব্যবসায়ীরা ছড়িয়ে পড়েছেন কেরানীগঞ্জের আবাসিক এলাকাগুলোতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সস্তা শ্রম, কম ভাড়া এবং তদারকির অভাবই এই অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের মূল কারণ।
জিনজিরার নজরগঞ্জ এলাকায় ‘রেড অ্যাপেল’ নামে একটি প্লাস্টিক কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, বাইরে তালা ঝুলিয়ে ভেতরে নারী ও শিশুশ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। নেই কোনো বৈধ কাগজপত্র।
কারখানার ম্যানেজার নিজেই স্বীকার করেন, তাদের কোনো অনুমোদন নেই। অগ্নিনির্বাপণের জন্য থাকা দুটি ফায়ার এক্সটিংগুইশারের একটির মেয়াদ ২০২৩ সালে এবং অন্যটির ২০২৫ সালে শেষ হয়ে গেছে। শ্রমিকদের কেউই এগুলো ব্যবহারের প্রশিক্ষণ পাননি।
এদিকে সম্প্রতি কেরানীগঞ্জ উপজেলা আইনশৃঙ্খলা সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য আমানউল্লাহ আমান বলেন, কেরানীগঞ্জে কোনো অবৈধ ফ্যাক্টরি থাকতে দেওয়া হবে না। আমরা এটিকে নিমতলী বা চুড়িহাট্টার মতো করতে চাই না, বরং আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।
একই সভায় উপস্থিত জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরী অভিযোগ করে বলেন, অবৈধ গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগের পেছনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অসাধু কর্মকর্তারা জড়িত।
কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. উমর ফারুক জানান, অবৈধভাবে গড়ে ওঠা কারখানাগুলো চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে কতগুলো অবৈধ কারখানা রয়েছে—তার সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব নেই প্রশাসনের কাছে।
সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলছেন, যথাযথ জোনিং, নিয়মিত তদারকি, লাইসেন্স যাচাই এবং কঠোর আইন প্রয়োগ ছাড়া এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়। অন্যথায় কেরানীগঞ্জে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
বারবার প্রাণহানি, তদন্ত, প্রতিশ্রুতি—তারপর আবার নীরবতা। কেরানীগঞ্জের মানুষ এখন প্রশ্ন তুলছেন—আর কত প্রাণ গেলে জাগবে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ববোধ?