
X
ববিতা
জুলাই যেন উৎসবের মাস আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেসে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে। সেই উৎসবের প্রধান আকর্ষণ-‘আনন্দ মেলা’। প্রতিবছর এই মাসটিতে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস শহরের ‘লিটল বাংলাদেশ’ এলাকায় আয়োজিত হয় বর্ণাঢ্য এ আয়োজন। যে আয়োজনের মাধ্যমে কয়েক হাজার বাঙালির সমাবেশ ঘটে।
আনন্দ মেলার প্রতি আয়োজনে অংশ নেন বাংলাদেশের একঝাঁক তারকাশিল্পী। প্রবাসী আমেরিকানদের নেচে গেয়ে মাতিয়ে আসেন তারা। এবারও হচ্ছে এ আয়োজন। আগামী ২৫ ও ২৬ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে বিখ্যাত হলিউড সাইন-সংলগ্ন এলাকায় অনুষ্ঠিত হবে ‘আনন্দ মেলা অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’।
ইতোমধ্যে অনুষ্ঠানটিতে পারফর্ম করার জন্য বাংলাদেশ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে আঁখি আলমগীর, দিলশাদ নাহার কণা, ইমরান মাহমুদুলসহ আরও অনেককে। তাই প্রতিবারের মতো এবারও বাংলাদেশ ও প্রবাসী শিল্পীদের পরিবেশনায় দুই দিনজুড়ে গান, নাচ, আবেগ আর দেশীয় সংস্কৃতির উচ্ছ্বাসে ভরে উঠবে লস অ্যাঞ্জেলেসের আবহাওয়া।
এবারের ‘আনন্দ মেলা অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’-এর আসরে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত করা হচ্ছে অভিনেত্রী ববিতাকে। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও খান মোহাম্মদ আলী গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, ‘প্রবাসীদের আনন্দ মেলা অ্যাওয়ার্ড হচ্ছে প্রাণের স্পন্দন। নান্দনিক আয়োজনের পাশাপাশি আমরা ব্যবসা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য সম্মাননা জানিয়ে থাকি। পাশাপাশি একজন কীর্তিমানকে আজীবন সম্মাননা জানাই। এবার বাংলাদেশের বরেণ্য অভিনেত্রী ববিতাকে আমরা আজীবন সম্মাননা জানাচ্ছি। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি লস অ্যাঞ্জেলেসের বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল ববিতার হাতে এই সম্মাননা তুলে দেবেন।’
এর আগে ২০২৩ সালে টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ডালাস শহরে কিংবদন্তি এই অভিনেত্রীকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সে আয়োজনে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়। ওই উৎসবে ববিতার সম্মানে প্রতি বছরের ৫ আগস্টকে ‘ববিতা দিবস’ হিসেবেও ঘোষণা করা হয়। সেই অভিনেত্রী এবার দ্বিতীয়বারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি অঙ্গরাজ্যে পাচ্ছেন আজীবন সম্মাননা।
বিষয়টি নিশ্চিত করে ববিতা বলেন, ‘এর আগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কয়েকটি সংগঠন আমাকে আজীবন সম্মাননা দিতে চেয়েছিল। নানান কারণে ব্যাটে বলে সময় মেলেনি। ডিসট্রেসড চিলড্রেন অ্যান্ড ইনফ্যান্টস ইন্টারন্যাশনালের গুড উইল অ্যাম্বাসাডর হিসেবে যখন যুক্তরাষ্ট্রেও কাজ করেছি, তখন বিভিন্ন স্টেট-এ গিয়েছি, বাংলাদেশিরা আমাকে সম্মানিত করেছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে আনন্দ মেলা’র এই আজীবন সম্মাননা আমার জন্য সত্যিই অনেক বড় বিষয়। আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আনন্দ মেলা-সংশ্লিষ্ট সবাইকে।
চলচ্চিত্রে আসার পেছনে ববিতার জন্য সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা তার বড় বোন সুচন্দ। কিংবদন্তি নির্মাতা জহির রায়হানের ‘সংসার’ সিনেমায় শিশুশিল্পী হিসেবে ১৯৬৮ সালে অভিষেক হয় ববিতার। এই চলচ্চিত্রে তিনি রাজ্জাক-সুচন্দার মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেন। ববিতার নাম ফরিদা আক্তার পপি থেকে ‘ববিতা’ হয় জহির রায়হানের ‘জ্বলতে সুরুজ কি নিচে’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে।
নায়িকা হিসেবে ববিতার প্রথম সিনেমা ‘শেষ পর্যন্ত’। এটি মুক্তি পায় ১৯৬৯ সালের ১৪ আগস্ট, যেদিন ববিতার মা মৃত্যুবরণ করেছিলেন। এরপর থেকে অভিনয়ে নায়িকা হিসেবে শাসন করেন ৭০ দশক। অর্জন করেন তুমুল জনপ্রিয়তা। বাণিজ্যিক সিনেমার অন্যতম সফল নায়িকা হিসেবে গণ্য করা হয় ববিতাকে। কেননা গ্রামীণ মেয়ের চরিত্রে কিংবা শহরের মডার্ণ তরুণী, সব চরিত্রেই তিনি সমান দক্ষতা দেখিয়েছেন।
জহির রায়হান পরিচালিত ‘টাকা আনা পাই’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ববিতার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরলেও তার জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র বলা হয় ‘অশনি সংকেত’কে। সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় এই সিনেমায় অভিনয় করে ববিতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দারুণ প্রশংসা অর্জন করেন।
ক্যারিয়ারে প্রায় ২৫০টির বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন ববিতা। এর মধ্যে ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’, ‘আলোর মিছিল’, ‘ডুমুরের ফুল’, ‘বসুন্ধরা’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘নয়নমনি’, ‘লাঠিয়াল’, ‘মা’, ‘কসাই’, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’, ‘দহন’, ‘দিপু নাম্বার টু’, ‘অশনি সংকেত’, ‘রামের সুমতি’, ‘নাগ-নাগিনী’, ‘প্রতিজ্ঞা’, ‘চ্যালেঞ্জ’, ‘মিস লংকা’, জীবন সংসার’, ‘লাইলি মজনু’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘পোকা মাকড়ের ঘর বসতি’ সিনেমাগুলো উল্লেখযোগ্য।
অভিনয়ের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ক্যারিয়ারে অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন ববিতা। একটানা ৩ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ছাড়াও বাংলা চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি থেকে সর্বভারতীয় শ্রেষ্ঠ নায়িকার পুরস্কার পান তিনি। এছাড়াও সরকারি ও বেসরকারি অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন ববিতা। তিনিই বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে সবচেয়ে বেশিবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনের চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিয়েছেন।
এবারের আনন্দ মেলাও থাকবে সবার জন্য উন্মুক্ত, কোনো প্রবেশ মূল্য ছাড়াই। গত বছর আনন্দ মেলা লাইভ টাইম অ্যাচিভমেন্ট পেয়েছেন বিশিষ্ট গীতিকার লিটন অধিকারী রিন্টু।