লাকসামে সামিয়ার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে যৌন নিপীড়নের আলামত

লাকসাম (কুমিল্লা) প্রতিনিধি

সারাবাংলা

লাকসাম ইক্বরা মহিলা মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী সামিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে যৌননিপীড়নের আলামত পাওয়া গেলেও এখনো পর্যন্ত

2026-04-30T19:08:29+00:00
2026-04-30T19:08:29+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
লাকসামে সামিয়ার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে যৌন নিপীড়নের আলামত
লাকসাম (কুমিল্লা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ৭:০৮ পিএম   (ভিজিট : ২২৩)
নিহত সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী সামিয়া
X

নিহত সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী সামিয়া

লাকসাম ইক্বরা মহিলা মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী সামিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে যৌননিপীড়নের আলামত পাওয়া গেলেও এখনো পর্যন্ত মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি পুলিশ। 

ঘটনার এক বছর পর সামিয়ার মৃত্যুর রহস্য নিয়ে আবারও উত্তাল হয়ে উঠেছে লাকসাম। মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বিলম্ব হওয়ায় সুষ্ঠু বিচার নিয়ে শঙ্কিত সামিয়ার পরিবার ও সচেতন মহল। ফলে জনমনে দেখা দিয়েছে চরম ক্ষোভ ও হতাশা। 

ঘটনার এক বছর অতিবাহিত হলেও আদালতে এখনও পর্যন্ত তদন্ত রিপোর্ট জমা দিতে পারেনি পুলিশ। এনিয়ে নিহত সামিয়ার পরিবার ও সচেতন নাগরিকদের মধ‍্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। সামিয়ার মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ‍্যম ফেসবুক, অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকাসহ টেলিভিশন চ‍্যানেলে নিউজ হয়েছে বহুবার। এছাড়াও  সামিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় লাকসামে মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনও হয়েছে। কিন্তু টনক লড়েনি প্রশাসনের। তাই সুষ্ঠু বিচার নিয়ে শঙ্কিত সামিয়ার পরিবার ও সাধারণ মানুষ। 
গত বছরের ২৪ জুন ২৫/১২৯০ নম্বর স্মারকে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট দেন সংশ্লিষ্ট ফরেনসিক বিভাগ। এরপর ওই বছরের ২৭ আগষ্ট কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম‍্যাজিষ্ট্রেট আদালত ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনটি আমলে নেন। আদালতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনটি দাখিল করলেও এখনো পর্যন্ত মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে পারেনি পুলিশ এবং উদঘাটিত হয়নি মৃত্যুর আসল রহস্য। ফলে ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাহিরে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে ওই মাদ্রাসা শিক্ষার্থী সামিয়া যৌননিপীড়নের শিকার হয়েছেন বলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ্য করা হলেও ময়নাতদন্তের এমন প্রতিবেদন প্রকাশের ৮ মাস পার হলেও এখনো পর্যন্ত কিছুই করতে পারেনি পুলিশ এবং সন্দেহভাজন কাউকে গ্রেফতারও করেনি। এটিকে পুলিশের ব্যর্থতা, নাকি অপরাধীদের সঙ্গে রফাদফা। এমন প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সচেতন মহলের কাছে। 

কুমিল্লার নাঙ্গলকোট পৌরসভার ২নম্বর ওয়ার্ডের নাওগোদা গ্রামে সামিয়ার বাড়ি। বাবা নিজাম উদ্দিন প্রবাসে থাকেন। ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ মা শারমিন আক্তার মেয়ে সামিয়াকে লাকসাম ইক্বরা মহিলা মাদ্রাসায় (আবাসিক) ভর্তি করেন। রমজান ও ঈদের ছুটি শেষে শ্রেণি কার্যক্রম শুরু হলে পূনরায় তাকে মাদ্রাসায় রেখে যান তার মা। 

এরপর ১৭ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে কুমিল্লার লাকসাম পৌরসভা কার্যালয় সংলগ্ন ইক্বরা মহিলা মাদ্রাসার পাঁচতলা ভবনের পাশে পৌরসভা সড়কের ওপর থেকে ওই মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিয়া আক্তারকে স্থানীয় লোকজন আহত অবস্থায় উদ্ধার করে এবং স্থানীয় একটি হাসপাতালের জরুরী বিভাগে ভর্তি করেন। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে রাজধানী ঢাকায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওইদিনই (১৮ এপ্রিল, শুক্রবার) দুপুরে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সামিয়া মারা যায়।

মাদ্রাসার সামনে থেকে সামিয়াকে জীবিত উদ্ধারের পর স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত নার্সদের সামিয়া বলেন, মাদ্রাসায় কালো বোরকা পরা মহিলার মতো একজন ব‍্যাগ নিয়ে তার সঙ্গে সামিয়াকে যেতে বলেছে। পরে সে সামিয়াকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ‍্যম ফেসবুকে ঘুরপাক খাচ্ছে। ওই ভিডিওতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সামিয়ার আরো কথোপকথন রয়েছে। 

সামিয়ার মা শুরু থেকেই অভিযোগ করে আসছেন, তাঁর মেয়েকে পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করা হয়েছে। তিনি আরো অভিযোগ করেন, ওই সময়ে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি মিমাংসার জন্য স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যস্থতায় সামাজিক ভাবে সমঝোতার জন্য চাপ দেন।
 
সামিয়ার মা শারমিন বেগম আরও অভিযোগ করে বলেন, তাঁর মেয়ে সামিয়ার রহস্যজনক মৃত্যুর পর তিনি হত্যা মামলা দায়ের করার জন্য একাধিকবার লাকসাম থানায় গেলেও পুলিশ মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে সামিয়ার মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে সুষ্ঠু তদন্তসহ বিচারের দাবি জানিয়ে তৎকালীন লাকসাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) কাউছার হামিদ বরাবর তিনি একটি আবেদন করেন। অবশেষে ঘটনার ১০দিন পর ২৭ এপ্রিল তিনি লাকসাম থানায় হত্যা মামলাটি দায়ের করেন। তাঁর অভিযোগ, লাকসাম থানায় দায়েরকৃত হত্যা মামলায় মাদরাসার প্রধান, আবাসিক শিক্ষক এবং দারোয়ানসহ ৮ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করতে চাইলে থানা পুলিশ মামলায় কারো নাম উল্লেখ করতে দেয়নি। পুলিশ অজ্ঞাত আসামীদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করেন। তাঁর দাবি, মাদ্রাসা সুপার জামাল উদ্দিন, শিক্ষক শারমিন ও দারোয়ান খলিলকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ঘটনার সঠিক রহস্য উদঘাটন হবে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে পুলিশ কাউকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেনি। 

নিহত সামিয়ার মা অভিযোগ করে বলেন, তাঁর মেয়ের মৃত্যুর পর পুলিশসহ অনেকের দ্বারে দ্বারে ঘুরছি। কেউ-ই আমার মেয়ে সামিয়ার খুনিদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনছে না। ঘটনার এক বছর অতিবাহিত হলেও পুলিশ এখনো আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেনি! ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে তাঁর মেয়েকে যৌন নির্যাতনের বিষয়টি স্পষ্ট করা হলেও পুলিশের নিরব ভূমিকা নিয়ে তিনি অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করেন। যাঁরা তাঁর আদরের মেয়েকে হত্যা করেছে। তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তিনি। 

তবে ঘটনার সময় লাকসাম থানার অফিসার ইনাচার্জ (ওসি) ছিলেন নাজনীন সুলতানা। তিনি বদলী হয়ে বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা থানায় কর্মরত রয়েছেন এবং ওই সময়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) এসআই আলমগীর হোসেনও বদলী হয়ে বর্তমানে কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট থানায় আছেন। এই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও ঘটনাটি ভিন্নখাতে প্রভাবিত করার অভিযোগ করেছেন অনেকেই। 

সামিয়ার মা ও তার পরিবার এখনও সামিয়ার স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন। তার জামা-কাপড়, বই, খাতা-কলম সবই পড়ে রয়েছে। নেই শুধু সামিয়া। তার এসব স্মৃতি বহন করে চলছে মা। কিন্তু থামছে না কান্না। আদালতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন দাখিলের ৮ মাস পার হলেও পুলিশ এখনো তদন্ত প্রতিবেদন না দেয়ায় সুষ্ঠু বিচার নিয়ে শঙ্কিত সামিয়ার পরিবার। 

অভিযুক্ত ইক্বরা মহিলা মাদ্রাসার প্রধান মো. জামাল উদ্দিন তাঁর বিরুদ্ধে আণীত অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে সাংবাদিকদের বলেন, ঈদের ছুটির পর সপ্তাহখানেক আগে ওই শিক্ষার্থীর নিয়মিত ক্লাস শুরু হয়। তবে সে মাদ্রাসার আবাসিকে থাকতে চায়নি। তাকে অনেকটা জোর করে রেখে গেছে। তিনি জানান, ঘটনার দিন (১৭ এপ্রিল) রাতে ওই শিক্ষার্থী তার মাকে ফোন দেয় এবং বাড়ি চলে যেতে বলে। পরে গভীর রাতে ওই ছাত্রী মাদরাসার পাঁচতলার একটি জানালার গ্রীলের ফাঁকা জায়গা দিয়ে পালাতে গিয়ে নিচে পড়ে আহত হয়। 

এমতবস্থায় স্থানীয় লোকজন দেখে আমাকে ফোন দিলে আমিসহ অন্যান্যরা ঘটনাস্থল থেকে তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যাই। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। সেখানে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার (১৮ এপ্রিল) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সে মারা যায়। 

এদিকে সামিয়ার মৃত্যুর পর পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে তার বাম হাতে একটি আঘাতের চিহ্ন ব্যতীত শরীরের অন্য কোথাও কোনোরকম আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে সামিয়ার যৌনাঙ্গ এবং পায়ুপথ উভয়ে যৌননিপীড়নের কথা স্পষ্ট উল্লেখ্য রয়েছে। 

এ ব্যাপারে লাকসাম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাকসুদ আহাম্মদ বাংলাদেশ বুলেটিনকে জানান, ঘটনাটি আমি এ থানায় যোগদানের অনেক আগে ঘটেছে। তবে বর্তমানে আমি আমার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এবিষয়ে কথা বলেছি। আমার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ এনিয়ে তদারকি করছেন। নিহত ওই শিক্ষার্থীর মরদেহের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে তার যৌনাঙ্গে এবং পায়ুপথে যৌননিপীড়নের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। তবে আরো কিছু সুক্ষ্ম বিষয় ও মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে তদন্ত চলমান রয়েছে। 

তিনি জানান, মামলার পূর্বের তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) এসআই আলমগীর হোসেন অন্যত্র বদলী হওয়ায় নতুন করে মামলাটির তদন্তভার অপর এক কর্মকর্তার ওপর ন্যস্ত হয়েছে। 





Loading...
Loading...


সারাবাংলা এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy