
X
ফাইল ছবি
সম্প্রতি বগুড়ার সারিয়াকান্দি থেকে শারীরিক নির্যাতন ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ২১ বছরের এক নারীকে উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধারের পর সেই নারীকে উল্টো মানব পাচার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরবর্তীতে অবশ্য সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগেও মামলা হয়েছে। মামলায় দুই জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
এ ঘটনায় পুলিশের দাবি, উদ্ধার হওয়া নারীকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়ার সময় ধর্ষণের বিষয়টি উঠে আসে। এখানে আইনের ব্যতয় ঘটানো হয়নি। গত বুধবার (১০ জুন) বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার হাট ফুলবাড়ী এলাকা থেকে ওই নারী ও আতিকুল ইসলাম (২৮) নামে তার এক পুরুষ সহযোগীকে মারপিটে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে থানা পুলিশ।
তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, মঙ্গলবার (৯ জুন) রাতে জুঁই খাতুন (২১) নামে এক নারীকে ফুসলিয়ে পাচারের উদ্দেশ্যে সারিয়াকান্দি নিয়ে যাচ্ছিলেন তারা। পথে হাটফুলবাড়ী এলাকায় তাদেরকে আটক করে জুঁইয়ের স্বামী রিপন মিয়া ও তার লোকজন। পরের দিন সকালে খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।
পরে তাদের বিরুদ্ধে মানব পাচারের মামলা হলে আতিকুলকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। আতিকুল ইসলাম গাবতলী উপজেলার তরফমেরু এলাকার বাসিন্দা। আর নির্যাতনের শিকার নারীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার সময় ধর্ষনের বিষয় জানা যায়। তখন তাকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে নেয়া হয়। সেখানে পুলিশি হেফাজতে চিকিৎসাধীন আছে ওই নারী।
ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারীটির শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে এবং যৌন নির্যাতনের চিহ্নও রয়েছে। তার আরও পরীক্ষা চলছে। সারিয়াকান্দি থানায় পতিতা বৃত্তি ও মানব পাচারের মামলা দায়ের করেন জুঁই খাতুনের বোন জ্যোতি খাতুন। মামলায় ধর্ষণের শিকার ওই নারী ও আতিকুল ইসলামকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারের সূত্রে জানা যায়, গত ৭-৮ মাস আগে বগুড়া শহরের নারুলী এলাকার জ্যোতির বাড়িতে বেড়াতে গেলে জুঁই খাতুনের সাথে (ধর্ষিত) সেই নারীর পরিচয় হয়। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে সখ্যতা গড়ে উঠে।
ওই নারী ( ধর্ষণের শিকার) সমকামী হওয়ায় জুঁইকে সংশোধনের চেষ্টা করে তার বোন জ্যোতি খাতুন। গত ৯ জুন রাতে জুঁইকে আবার সেই নারী এবং তার বন্ধু যৌন শোষণ ও নিপীড়নমূলক কাজের নিয়োগের উদেশ্যে পাচারকালে ফুলবাড়ী সিএনজি স্ট্যান্ড থেকে তাদেরকে আটক করে জুঁইয়ের স্বামী রিপন মিয়া ও তার লোকজন।
পরের দিন সকালে পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। এর আগে জনতার মারপিটে আহত হলে ভিকটিম ও তার বন্ধুকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। এর আগে ২০২৫ সালেও প্রলোভন দেখিয়ে পতিতাবৃত্তি ও যৌন শোষণের জন্য জুঁইকে পাচারের চেষ্টা করেছিল সেই নারী। সেই সময় জুঁইকে পরিবারের লোকজন উদ্ধার করে বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
এই মামলার পরের দিন ১১ জুন সারিয়াকান্দি থানায় পাল্টা আরেকটি মামলা হয়। এ মামলায় মানব পাচারে অভিযুক্ত ওই নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। মামলার বাদী নির্যাতনের শিকার নারীর বাবা। মামলার আসামিরা হলেন সারিয়াকান্দির নারচি ইউনিয়নের চর হরিনা গ্রামের জুঁই খাতুনের স্বামী রিপন মিয়া (২৭), তার সহযোগী আতিকুর রহমান গিট্টু (২৮), মো. আবু রায়হান (২৪), আব্দুল করিম (২৪) এছাড়া অজ্ঞাতনামা আসামি ৩ জন।
এদের মধ্যে আতিকুর রহমান গিট্টু এবং রিপন মিয়াকে ১১ জুনে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠিয়েছে পুলিশ। আদালতে গিয়ে আতিকুর রহমান গিট্টু স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে বলে জানিয়েছেন সারিয়াকান্দি থানার ওসি আ.ফ.ম আছাদুজ্জামান।
ধর্ষণের এ মামলার সূত্রে জানা গেছে, জুঁই খাতুনের স্বামী রিপন মিয়া তার স্ত্রীকে মাঝে মাঝে শারীরিক নির্যাতন করতো। সেই কথা জুঁই ধর্ষণের শিকার নারীকে মোবাইলে জানাতো। ৯ জুন একই রকমভাবে জুঁই সেই নারীকে জানায়। পরে মেয়েটির কাছে চলে আসতে চায় জুঁই। এ জন্য ওই নারী এবং তার বন্ধু আতিকুল ইসলামকে নিয়ে উপজেলার ফুলবাড়ী সিএনজি স্ট্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছালে আগে থেকে উপস্থিত রিপন মিয়া ও তার লোকজন সেই নারী ও আতিকুলকে মারধর করে সিএনজি চালিত অটো রিকশায় তুলে নিয়ে রিপন মিয়ার বাড়িতে নিয়ে যায়।
সেখানে তাদেরকে আবার মারধর করে এবং সেই দৃশ্যের ভিডিও ধারণ করে। এক পর্যায়ে ভুক্তভোগীকে রিপনের শয়ন কক্ষে নিয়ে গিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। পরের দিন সকালে স্থানীয় লোকজনের মারফতে খবর পেয়ে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।
নারীটির মা জানালেন, এক বছর ধরে তার মেয়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন না। তারাও যোগাযোগ করেন না। ঘটনার পর সারিয়াকান্দি থানা থেকে পুলিশ ধর্ষণের বিষয়টি জানায়। তবে মেয়ের নামে মানব পাচারের মামলা হয়েছে কিনা তা জানেন না তিনি।
ধর্ষণের শিকার নারীর মা আরও বলেন , পুলিশের কাছে খবর পেয়ে আমার স্বামী থানায় গিয়েছিল। সেখানে জুঁই নামে ওই মেয়ের সঙ্গেও কথা হয়েছে। আমার মেয়ে অপহরণ বা মানবপাচারে জড়িত না। ওই মেয়েই মোবাইল করে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। মোবাইল পেয়ে যাওয়ার পরে জুঁইয়ের স্বামী ও অন্যরা আমার মেয়েকে মারধর করেছে, নির্যাতন করেছে। এতটুকুই আমরা শুনেছি। সেই অনুযায়ী আমার স্বামী মামলা করেছেন।
সারিয়াকান্দি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আ.ফ.ম আছাদুজ্জামান বলেছেন, ধর্ষণের শিকার সেই নারী পুলিশের কাছে আগে বিষয়টি বলেনি। তার বিরুদ্ধে মানব পাচারের মামলা হওয়ার পরে যখন চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে তখন জিজ্ঞাসাবাদে ধর্ষণের কথা জানা গেছে। পরে বিষয়টি উর্দ্ধতনকে জানানো হয়। এরপর বিধি মোতাবেক ১১ জুন সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মামলা রেকর্ড করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার ধারাবাহিকতা এবং অভিযোগের ধারাবাহিকতা মেনে দুইটি মামলায় নেওয়া হয়েছে। এখানে আইনের কোনো ব্যতয় ঘটেনি। ইতিমধ্যে দুইটি মামলায় কয়েকজন আসামি গ্রেপ্তারও আছে। বাকি বিষয়ে তদন্ত স্বাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। সেই সঙ্গে ধর্ষণের অভিযোগ দুজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়। ধর্ষণের শিকার ওই নারীর পরিবারের সঙ্গে কথা বলা হয়।