বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলায় অবস্থিত প্রায় চার'শ বছরের পুরনো স্থাপত্য যা বর্তমানে সনাতন সম্প্রদায়ের সার্বজনীন পিঠস্থান হিসেবে মাঙ্গলিক পূজা অর্চনা হয়ে আসছে। যেটি বর্তমানে মঘিয়া সার্বজনীন কালীবাড়ি ও শিববাড়ি মন্দির নামে পরিচিত।
এই স্থাপত্যটি অযত্ন অবহেলা আর সংরক্ষণের অভাবে দিনের পর দিন এর প্রকৃত রূপ ও সৌন্দর্য হারাতে বসেছিল। গত এক বছর যাবত স্থানীয় সুধীজন ও সুশীল সমাজের সমন্বয়ে সনাতন সম্প্রদায় এই স্থানটিকে আবারো পুনর্জীবিত করে ধর্মীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে সম্প্রসারিত করার পরিকল্পনা হাতে নেন।
তার ধারাবাহিকতায় প্রত্নতত্ত্ব হিসাবে গেজেট ভুক্ত করার জন্য তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মন্দির কমিটির অক্লান্ত প্রচেষ্টায়‘শিব ও কালিবাড়ি মন্দির সহ মন্দিরের পুরো জাইগাটি সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ হিসেবে ঘোষণা করেছে বর্তমান সরকার।
সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ হিসাবে ১৯৬৮ সালের (সংশোধিত, ১৯৭৬) প্রত্নসম্পদ আইনের ১০ ধারার (১) উপধারার ক্ষমতাবলে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে গত ৩০ জুন ২০২৫ তারিখ তবে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয় গত ৯ জুলাই ২০২৫ তারিখে, মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোঃ সাইফুল ইসলামের স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানাযায়, বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার মঘিয়া ইউনিয়নে অবস্থিত এই প্রাচীন মন্দিরটির মোট ১.৬৬ একর জমিকে প্রত্নসম্পদ হিসেবে সংরক্ষণের আওতাভুক্ত করা হয়েছে।
ভূমি রেকর্ড অনুযায়ী, বিআরএস ২৪৯ নম্বর খতিয়ানের ৭৩১, ৭৩২, ৭৩৩, ৭৩৪, ৭৩৫, ৭৪৬ এবং ৭৪৭ নম্বর দাগের মোট ১.৬৬ একর জমি ‘বারোয়ারী কালী মন্দির কমিটি’র পক্ষে সেবাইত শংকর ভট্টাচার্য (পিতা: অমূল্য কুমার ভট্টাচার্য)-এর নামে রেকর্ডভুক্ত রয়েছে এবং বর্তমানে এটি মন্দিরের দখলেই রয়েছে। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় এই প্রত্নসম্পদের মালিকানা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিকট হস্তান্তরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন।
তফসিল অনুযায়ী, সংরক্ষিত এই প্রত্নসম্পদ এলাকার পূর্বে মোঃ সাফায়াত হোসেনের জমি, পশ্চিমে কচুয়া-দেপাড়া পাকা সড়ক, উত্তরে মোঃ কামরুল ইসলাম শেখের জমি এবং দক্ষিণে আবুল হোসেন হাজরার জমি রয়েছে।
রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা এই প্রজ্ঞাপনের ফলে এখন থেকে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটির রক্ষণাবেক্ষণ, সংস্কার এবং সুরক্ষার সার্বিক দায়িত্ব পালন করবে সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।
মন্দিরটি সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ ঘোষণা হওয়ায় মন্দির কমিটির সভাপতি নিত্যরঞ্জন ঘোষ বলেন, গত ৫ই আগস্ট গনঅভ্যুত্থানের পরে এই মন্দিরের দায়িত্ব নিয়েছি,এখানে নানা বাঁধা বিপত্তি পেরিয়ে মন্দির কমিটির অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল হিসেবে‘শিব ও কালিবাড়ি মন্দির সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। তবে প্রত্নসম্পদ হিসেবে ঘোষণা করায় এই অঞ্চলের ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন। বর্তমান সরকার'কে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি আরও বলেন কচুয়া উপজেলার কোন মন্দির যাতে অবহেলিত না থাকে সেই লক্ষ্য আমরা নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছি।
কচুয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ আলী হাসান বলেন,আমার কচুয়ায় যোগদানের পর থেকে এই মন্দির নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি,আমদের কাছে অধিদপ্তর থেকে জমির তফসিল চাওয়া হয়েছিল, এবং জমি সংক্রান্ত কিছু সমস্যা ছিল সেটি সমাধান করে কাগজ পত্র যাচাই বাছাই ও বিশ্লেষণ করে মন্ত্রনালয়ে রিপোর্ট পাঠিয়েছিলাম এবং আমরা প্রথমত কথা বলে ছিলাম মন্দির সংরক্ষিত করার বিষয়ে পরে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের পরিচালকও এখানে এসেছিলেন, তাদেরকে অমরা অনুরোধ করছিলাম এটা খুবই জরুরি বিষয় আমাদের কচুয়ার জন্য। তার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের রিপোর্ট যায়।
পরবর্তীতে ডিসি স্যারের মাধ্যমে হোমমিনিস্ট্রি থেকে অনুমোদন হয়ে এসেছে এটা আমাদের জন্য পজেটিভ একটা বিষয়। এখন মঘিয়া কালীবাড়ি মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেন্জ।এই জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানাই তারা আমাদের উদ্যেগকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং যারা আমাদের সাথে ছিল তাদেরকেও ধন্যবাদ জানাই।
এদিকে গত ২০২৫ সালের ২০ জুলাই প্রত্নতত্ত্ব হিসাবে গেজেট ভুক্ত করার জন্য সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ৩ সদস্যের একটি দল মঘিয়া সর্বজনীন কালীবাড়ি ও শিববাড়ি মন্দির পরিদর্শনে আসেন। এসময় মন্দিরের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ,মন্দির কমিটি, স্থানীয় গণমাধ্যম, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ সহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের কাছ থেকে লিখিত ও মৌখিক ভাবে নানা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।