
X
ছবি: প্রতিনিধি
পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর-কুড়িয়ানা অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ভাসমান পেয়ারার হাটে এখন মৌসুমের প্রাণচাঞ্চল্য।
ভোরের আলো ফুটতেই খালের বুকে সারি সারি ডিঙ্গি নৌকায় ভেসে আসে তাজা পেয়ারা। নৌকার ওপরই চলে দরদাম, বিক্রি ও পাইকারি কেনাবেচা। জলপথে গড়ে ওঠা শতবর্ষের এই ব্যতিক্রমী হাট শুধু স্থানীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তিই নয়, বরং দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবেও পরিচিত।
কৃষি বিভাগ জানায়, প্রতিবছর এই ভাসমান হাটে ১৫ কোটির টাকারও বেশি পেয়ারা বেচাকেনা হয়। তবে উৎপাদিত ফল সংরক্ষণ ও মূল্য সংযোজনের সুযোগ বাড়াতে স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে একটি জেলি কারখানা এবং আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন।
পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদে বর্তমানে প্রায় ৬০০ হেক্টর জমিতে পেয়ারার আবাদ হয়েছে। চলতি মৌসুমে প্রতি হেক্টরে গড়ে ৯.৫ থেকে ১০ টন পেয়ারা উৎপাদন উৎপাদন হচ্ছে, যার বড় অংশই আসে নেছারাবাদ উপজেলা থেকে।
মৌসুম শুরু হলে আটঘর-কুড়িয়ানা, আদমকাঠি, জিন্দাকাঠীসহ আশপাশের এলাকার খালগুলোতে নেমে আসে কর্মব্যস্ততা। চাষিরা বাগান থেকে সদ্য তোলা পেয়ারা ডিঙ্গি নৌকায় করে ভাসমান হাটে নিয়ে আসেন। সেখানে পাইকাররা সরাসরি নৌকায় উঠে দরদাম করে ফল কিনে ট্রাক ও নৌপথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়ে দেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, নেছারাবাদের বড় ও সুস্বাদু পেয়ারার চাহিদা ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় রয়েছে। পদ্মা সেতু চালুর পর যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় রাজধানীসহ বড় বাজারগুলোতে দ্রুত ফল পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে কৃষকরাও আগের তুলনায় ভালো দাম পাচ্ছেন।
স্থানীয় পেয়ারা ব্যবসায়ী রহিম হাওলাদার বলেন, “এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো এবং বাজারদর ও ভালো রয়েছে। বর্তমানে প্রতি মণ পেয়ারা ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় এখানকার পেয়ারার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।”
চাষি বীরেন হালদার জানান, তাঁর প্রায় ১০ বিঘা জমিতে পেয়ারার বাগান রয়েছে। প্রতিদিন ভোরে শ্রমিকদের নিয়ে বাগান থেকে ফল সংগ্রহ করে নৌকায় করে বাজারে আনেন। তিনি বলেন, “যদি একটি কোল্ড স্টোরেজ ও জেলি কারখানা স্থাপন করা হয়, তাহলে মৌসুমে কম দামে পেয়ারা বিক্রি করতে হবে না। সংরক্ষণের সুযোগ থাকলে কৃষকরা আরও লাভবান হবেন।”
ভাসমান এই হাটকে ঘিরে পর্যটনেরও বিকাশ ঘটেছে। পেয়ারার মৌসুমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো দর্শনার্থী এখানে ভিড় করেন। নৌকা কিংবা ট্রলারে করে তারা খালপথে ঘুরে ঘুরে পেয়ারার বাগান ও ভাসমান হাটের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করেন।
পর্যটকদের আগমনে স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠেছে হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও ছোট ছোট বিনোদনকেন্দ্র। স্থানীয় খাবারের মধ্যে সরিষা ইলিশ, ইলিশ ভর্তা, চিংড়ি ভুনা এবং হাঁসের মাংস দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটকরা বলেন, “প্রতিবছর পেয়ারার মৌসুমে এখানে আমারা আসি। খালের বুকে শত শত নৌকায় পেয়ারা কেনাবেচার দৃশ্য সত্যিই অসাধারণ। তবে পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তা, আবাসন ও মানসম্মত খাবারের ব্যবস্থা আরও উন্নত করা প্রয়োজন।”
নেছারাবাদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমিত দত্ত বলেন, “ভাসমান পেয়ারার হাটকে ঘিরে পর্যটন উন্নয়নের বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা, থাকা-খাওয়ার সুবিধা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে পর্যটন ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।”
নেছারাবাদ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান বলেন, “নেছারাবাদ উপজেলার মোট ৬০০ হেক্টর জমিতে এবার পেয়ারার আবাদ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষকদের আন্তরিক পরিচর্যার কারণে চলতি মৌসুমে প্রতি হেক্টরে গড়ে ৯.৫ থেকে ১০ টন পেয়ারা উৎপাদনের আশা করছি। বাজারেও পেয়ারার দাম সন্তোষজনক থাকায় চাষিরা লাভবান হবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “পেয়ারা চাষিদের সব সময় উপজেলা কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক চাষাবাদ, রোগবালাই দমন এবং ফলের গুণগত মান উন্নয়নে নিয়মিত প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া উপজেলার কিছু উদ্যোক্তা পেয়ারা থেকে জ্যাম, জেলি ও অন্যান্য মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদন করছেন, যা কৃষকদের আয় বৃদ্ধি এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।”