
X
ফাইল ছবি
সরকারি বরাদ্দের সার কালোবাজারে বিক্রি, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি এবং সরকারের কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির অভিযোগে শেরপুর সদর উপজেলার ২০ জন সার ডিলারের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
মামলার বাদী শেরপুর সদর উপজেলার সাবেক কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেন। তিনি শেরপুর সদর থানায় দায়ের করা এজাহারে উল্লেখ করেন, গত ২৪ জুন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুসরাত জাহানকে সঙ্গে নিয়ে শেরপুর শহরের নিউমার্কেট, রঘুনাথ বাজার, নতুন বাসস্ট্যান্ডসহ সদর উপজেলার বিভিন্ন সার ডিলারের দোকান পরিদর্শন করা হয়।
পরিদর্শনের সময় সার ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৬-এর ৯(২) ধারা অনুযায়ী বিভিন্ন অনিয়ম ধরা পড়ে। পরে সংশ্লিষ্ট ডিলারদের সার বিক্রির রেজিস্টার ও ক্যাশ মেমো জব্দ করে যাচাই-বাছাই করলে ব্যাপক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, অভিযুক্ত ডিলাররা সরকারি বরাদ্দের ৪ হাজার ৪১২ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার (মূল্য প্রায় ১১ কোটি ৯১ লাখ ২৪ হাজার টাকা), ৮২১ মেট্রিক টন ডিএপি সার (মূল্য প্রায় ১ কোটি ৭২ লাখ ৪১ হাজার টাকা), ১৩৪ মেট্রিক টন টিএসপি সার (মূল্য প্রায় ৩৬ লাখ ১৮ হাজার টাকা) এবং অন্যান্য সার বাবদ প্রায় ৩৪ লাখ ৪০ হাজার টাকার সার অধিক মুনাফার আশায় কালোবাজারে বিক্রি করেন।
এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয় এবং কৃষকদের সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হতে হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের কর্মকাণ্ডে শেরপুর সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের কৃষকরা ব্যাপক ভোগান্তির শিকার হয়েছেন এবং সরকারের কয়েক কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়।
মামলার আসামিরা হলেন ছামিদুল ইসলাম ফারাজী, বোরহান উদ্দিন, রেজাউল করিম, মাজাহারুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, মনিরুজ্জামান মনির, প্রশান্ত সাহা, মো. রতন মিয়া, মো. বাদশা মিয়া, মো. রাসেদুল ইসলাম, সুফিয়া বেগম, মো. রফিকুল ইসলাম, সুবর্ণা সাহা রায়, মীর দেলোয়ার হোসেন, মরিয়ম আক্তার মুন্নি, মো. ফরহাদ আলী, ইলিয়াস আলী, তাপস নন্দী, কামরুন নাহার হাসেম ও সিরাজুল ইসলাম।
কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন আক্ষেপ প্রকাশ করে জানান, সার পাচারের সত্যতা প্রমাণ করতে গিয়ে গত এক মাস ধরে তিনি চরম হেনস্তার শিকার হয়েছেন। নিজ বিভাগসহ স্থানীয় প্রশাসন ও প্রভাবশালী মহল থেকে তিনি কোনো সহযোগিতা পাননি; উল্টো তাকে মাত্র ২০ দিনে ৮ বার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও ঘুষ দাবির মিথ্যা অভিযোগও তোলা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, "পুলিশ বিভাগ ছাড়া এই কঠিন সময়ে আমাকে কেউ সহায়তা করেনি। অর্পিত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রের স্বার্থে আমি মামলা করেছি। এখন বলা হচ্ছে আমি নাকি সরকারকে বিব্রত করতে মামলা করেছি! একটি মহল কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে চেয়েছিল, আমি কেবল তা প্রতিহত করেছি। এখন আমি চরম জীবনের ঝুঁকিতে আছি।"
এবিষয়ে স্থানীয় সাব-ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা মীম এন্টারপ্রাইজের মালিক আকবর আলী জানান, সময়মতো সার না পেয়ে কৃষকরা বাধ্য হয়ে বেশি দামে সার কিনছেন।
অন্যদিকে, প্রধান অভিযুক্ত ডিলার রাশেদুল ইসলাম অসুস্থতার কথা বলে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। হাছনা ট্রেডার্সের আরিফুল ইসলাম সাব-ডিলারদের ওপর দায় চাপিয়ে দাবি করেন, "আমাদের অন্যায়ভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে।"
শেরপুর সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মুসলিমা খানম নিলু জানান, মামলাটি এখন আদালতে বিচারাধীন।
এবিষয়ে শেরপুর সদর থানার ওসি সোহেল রানা জানান, মামলার তদন্ত চলছে, বেশ কিছু রেজিস্টারপত্র জব্দ করা হয়েছে। আসামিরা হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়েছেন বলে তিনি শুনেছেন।
তবে শেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাখাওয়াত হোসেনের দাবি, মাঠপর্যায়ের পূর্ণাঙ্গ যাচাই ও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত নির্দেশনা আসার আগেই কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন মামলাটি করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী মামলা করতে প্রশাসনিক অনুমতির প্রয়োজন ছিল।