
X
আঁশ ছাড়িয়ে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে বাজারজাতের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে ।
সকালের নরম রোদ। গ্রামের রাস্তার দুই পাশে সারি সারি শুকাতে দেওয়া পাট। কোথাও নারীরা আঁশ পরিষ্কার করছেন, কোথাও পাটের গাঁট বাঁধা হচ্ছে, আবার পাশের খালে চলছে জাগ থেকে পাট তোলার ব্যস্ততা। গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার এমন দৃশ্য যেন মনে করিয়ে দেয়—বাংলার ‘সোনালি আঁশ’ এখনও হারিয়ে যায়নি; বরং নতুন সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে আবারও মাঠে-ঘাটে ফিরছে।
জুলাই-আগস্ট এলেই মুকসুদপুরের বিভিন্ন এলাকায় পাট কাটার মৌসুম শুরু হয়। কৃষকেরা মাঠ থেকে পাট কেটে খাল-বিল বা জলাশয়ে জাগ দেন। নির্দিষ্ট সময় পর আঁশ ছাড়িয়ে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে বাজারজাতের প্রস্তুতি নেন। এ কাজে পরিবারের নারী-পুরুষ সবাই অংশ নেন। ফলে মৌসুমি কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হয়।
পাট শুধু একটি কৃষিপণ্য নয়; এটি বাংলাদেশের ঐতিহ্য, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল।
বর্তমানে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ২–৩ শতাংশ আসে পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে। অন্যদিকে, একসময় (স্বাধীনতার আগে ও পরবর্তী কয়েক দশক) এই খাত থেকেই মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৭০–৮০ শতাংশ পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হতো। পরে তৈরি পোশাক (RMG) শিল্পের ব্যাপক বিকাশের ফলে সেই অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
একসময় দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য ছিল এই সোনালি আঁশ। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ায় আবারও পাট ও পাটজাত পণ্যের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ এখনও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পাট উৎপাদনকারী দেশ এবং পাট ও পাটজাত পণ্যের শীর্ষ রপ্তানিকারকদের একটি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তি, ন্যায্যমূল্য এবং বহুমুখী পাটপণ্যের উৎপাদন বাড়ানো গেলে এই খাত দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারে। বর্তমানে পাট থেকে ব্যাগ, কার্পেট, জিওটেক্সটাইল, হোম ডেকোর, ফ্যাশন সামগ্রী, কাগজসহ নানা ধরনের পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরি হচ্ছে, যার আন্তর্জাতিক বাজারও ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।
মুকসুদপুরের কৃষকেরা জানান, উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও ভালো দাম পেলে পাট চাষ এখনও লাভজনক। তবে তারা সহজ শর্তে কৃষিঋণ, উন্নত মানের বীজ, জাগ দেওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবি জানান।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলা এবং রপ্তানিমুখী বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে ‘সোনালি আঁশ’ আবারও দেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।
মুকসুদপুরের মাঠে শুকাতে দেওয়া পাটের সারি আর কৃষকের ব্যস্ততা তাই শুধু একটি মৌসুমি কৃষিচিত্র নয় এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং সবুজ শিল্পায়নের এক আশাব্যঞ্জক প্রতীক।
মুকসুদপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, "পাট বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী অর্থকরী ফসল। বর্তমানে পরিবেশবান্ধব পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধির ফলে পাটের গুরুত্ব আবারও বাড়ছে। কৃষকরা যাতে উন্নত জাতের বীজ, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ও ন্যায্যমূল্য পান, সে লক্ষ্যে কৃষি বিভাগ নিয়মিত পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি মানসম্মত পাট উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে কৃষকের আয় যেমন বাড়বে, তেমনি দেশের অর্থনীতিতেও পাট আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।"