
X
ছবি : প্রতিনিধি
নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপ-বিভাগীয় কার্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরে কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। কর্মকর্তা-কর্মচারী না থাকায় নিয়মিত অফিস কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। অধিকাংশ সময় কার্যালয়ের কক্ষগুলোতে ঝুলছে তালা। এতে একদিকে যেমন নদীভাঙন প্রতিরোধ ও সেচ ব্যবস্থাপনাসহ জনগুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে অরক্ষিত কার্যালয়টি পরিণত হয়েছে মাদকসেবীদের আড্ডাস্থলে।
উপজেলা চত্বরসংলগ্ন প্রধান সড়কের পাশে সীমানাপ্রাচীর ঘেরা কার্যালয়টিতে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর সাইনবোর্ড। স্থানীয়দের দাবি, কয়েক বছর আগেও মাঝেমধ্যে কর্মকর্তাদের কার্যালয়ে আসতে দেখা গেলেও বর্তমানে নিয়মিত কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর দেখা মেলে না।
সরেজমিনে দেখা যায়, কার্যালয়ের অধিকাংশ কক্ষ তালাবদ্ধ। ভবনের আশপাশে আগাছা ও ময়লা-আবর্জনা জমে রয়েছে। সীমানাপ্রাচীরের ভেতরের বিশাল জায়গার একাংশে স্থানীয়রা কলাবাগান করেছেন। আবার কয়েকটি বারান্দায় ডেকোরেটর ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সরঞ্জাম রাখা হয়েছে।
দীর্ঘদিন অরক্ষিত থাকায় কার্যালয়ের বিভিন্ন অবকাঠামোর জানালা-দরজাও চুরি হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর কার্যালয়ের ভেতরে মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায়।
পাশাপাশি কার্যালয়ের ৮ থেকে ১০টি আবাসিক কোয়ার্টার স্থানীয়দের কাছে ভাড়া দেওয়া হলেও সেই ভাড়ার টাকা কোথায় যাচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
জানা যায়, তিস্তা সেচ প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৯৯০ সালে কিশোরগঞ্জে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর কার্যালয় স্থাপন করা হয়। শুরুর দিকে সৈয়দপুর ও রংপুরের অধীনে এখানে দুইজন এসডিও, ছয়জন এসও, চারজন অফিস সহকারী, ছয়জন কার্যসহকারী, ১০ জন এমএলএসএস, দুইজন নাইটগার্ড, দুইজন দারোয়ান ও চারজন সার্ভেয়ার কর্মরত ছিলেন। সে সময় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আবাসিক কোয়ার্টারে পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন।
বর্তমানে নদীভাঙন প্রতিরোধ, সেচ ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন সমস্যায় স্থানীয়রা কার্যালয়ে এসে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগের জন্য কার্যালয়ে কোনো মোবাইল নম্বরও প্রদর্শিত নেই।
চাঁদখানা ইউনিয়নের উত্তর চাঁদখানা সারোভাষা গ্রামের বাসিন্দা আহসান হাবিব বলেন, তাঁদের গ্রামের ঈদগাহ মাঠের কিছু অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে ছবি ও প্রয়োজনীয় তথ্য নিয়ে তিনি পাউবো কার্যালয়ে এসেছেন। কিন্তু তিন দিন ধরে এসে কোনো কর্মকর্তার দেখা পাননি।
তিনি বলেন, “প্রথম দিন এসে অফিস তালাবদ্ধ পেয়েছি। আজও এসে কাউকে পেলাম না। জরুরি বিষয় নিয়ে কার সঙ্গে কথা বলব, সেটাও বুঝতে পারছি না।”
উপজেলা শহরের কেশবা গ্রামের বাসিন্দা সুজন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেখভালের অভাবে কার্যালয়ের চারপাশ আগাছা ও ময়লা-আবর্জনায় ভরে গেছে। দুর্গন্ধ ছড়ানোর পাশাপাশি পুরো এলাকার পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে। এত বড় সরকারি স্থাপনা এভাবে পড়ে থাকা দুঃখজনক।
কার্যালয়সংলগ্ন হোটেল ব্যবসায়ী ম্যারাডোনা বলেন, “এখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাউকে নিয়মিত দেখা যায় না। শুধু কবির নামে একজনকে মাঝে মধ্যে গেট খুলে ভেতরে ঢুকতে দেখা যায়।”
এ বিষয়ে সৈয়দপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আখিনুজ্জামান বলেন, সৈয়দপুর অফিস দায়িত্ব হস্তান্তর করায় বর্তমানে কিশোরগঞ্জ উপ-বিভাগীয় কার্যালয়ের কার্যক্রম রংপুর পাউবো অফিস থেকে পরিচালিত হচ্ছে।
রংপুর পাউবোর অধীনে কিশোরগঞ্জের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোছান্না গালিব কার্যালয়ের আবাসিক কোয়ার্টার স্থানীয়দের ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “টুকটাক যে ভাড়া আসে, তা মসজিদে দেওয়া হয়।”
তবে নিয়মিত উপ-বিভাগীয় কার্যালয়ে এসে অফিস করার বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট বক্তব্য না দিয়ে জানান, বর্তমানে কার্যালয়টি ‘ইনঅ্যাকটিভ’ হয়ে গেছে। কার্যালয়ে মোট কতজন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন জানতে চাইলে তিনি মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
অন্যদিকে কার্যালয়সংলগ্ন মসজিদের মুয়াজ্জিন ইলিয়াস আলী বলেন, আবাসিক কোয়ার্টারের ভাড়া থেকে কোনো টাকা মসজিদের ফান্ডে দেওয়া হয় না।
স্থানীয়দের দাবি, জনগুরুত্বপূর্ণ এই সরকারি কার্যালয়টি দ্রুত সচল করে নিয়মিত কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, সরকারি আবাসিক কোয়ার্টার ও স্থাপনার যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ এবং অনিয়মের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তদন্ত করা হোক।