
X
ফারহান অংকুর
জীবনের শুরুতেই বাবাকে হারিয়ে অনিশ্চয়তার অন্ধকার নেমে এসেছিল ফারহান অংকুরের জীবনে। পৃথিবীকে বুঝে ওঠার বয়স হওয়ার আগেই পিতৃহারা হয়ে সংসারের একমাত্র অবলম্বন হয়ে ওঠেন তার মা। অভাব-অনটন, অনিশ্চয়তা ও নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করার পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন তিনি।
মায়ের সেই ত্যাগ, ভালোবাসা ও নিরন্তর সংগ্রাম এবং প্রয়াত বাবার অসমাপ্ত স্বপ্নকে হৃদয়ে ধারণ করে এবার সাফল্যের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ফারহান অংকুর। সম্প্রতি প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বগুড়া জিলা স্কুলের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে সে।
অংকুরের রোল নম্বর ১৬১৩১৫। প্রকাশিত মার্কশিট অনুযায়ী, সব বিষয়ে এ প্লাস (A+) গ্রেড পেয়েছে সে। তার এই সাফল্য শুধু একটি ভালো ফলাফল নয়; বরং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে অদম্য লড়াই, মায়ের ত্যাগ এবং স্বপ্ন পূরণের এক অনুপ্রেরণাদায়ী গল্প।
তবে অংকুরের এই ফলাফল কেবল একটি ভালো পরীক্ষার ফল নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, একজন মায়ের নিরলস পরিশ্রম এবং একজন প্রয়াত বাবার অসমাপ্ত স্বপ্ন।
অংকুরের বাবা মরহুম মো. আসাদুজ্জামান ফিরোজ ছিলেন বগুড়ার পরিচিত ও সাহসী ক্রাইম রিপোর্টার। সাংবাদিকতার পেশায় তিনি ছিলেন নিষ্ঠাবান ও দায়িত্বশীল। তিনি সাংবাদিক ইউনিয়ন বগুড়া ও বগুড়া প্রেস ক্লাবের সদস্য ছিলেন। জীবনের শেষ সময়ে জাতীয় দৈনিক ‘আমার দেশ’-এর বগুড়া অফিসে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
কিন্তু অংকুর যখন খুব ছোট, তখনই জটিল রোগে আক্রান্ত হন তার বাবা। দীর্ঘদিন অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করার পর অকালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। ছোট্ট অংকুরের মাথার ওপর থেকে সরে যায় বাবার ছায়া। পরিবারে নেমে আসে অনিশ্চয়তা।
সেই কঠিন সময়ে ভেঙে পড়েননি অংকুরের মা মোছা. ফারহা বেগম তৃষ্ণা। সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয়ে শুরু করেন এক কঠিন সংগ্রাম। নিজের কষ্টকে আড়াল করে তিনি প্রাইভেট পড়ানো এবং স্থানীয় একটি কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতা করে সংসার চালিয়ে আসছেন। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও সন্তানের পড়াশোনায় যেন কোনো ঘাটতি না থাকে, সে চেষ্টা করেছেন সবসময়। মায়ের এই ত্যাগই অংকুরের কাছে ছিল সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
সাফল্যের অনুভূতি জানাতে গিয়ে ফারহান অংকুর বলে, “আমার বাবা অত্যন্ত নিষ্ঠাবান একজন গণমাধ্যম কর্মী ছিলেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল আমি বড় হয়ে সুশিক্ষিত হয়ে দেশ ও মানুষের সেবা করব। বাবা চলে যাওয়ার পর আমার মা অনেক কষ্ট করে আমাকে পড়াচ্ছেন। মায়ের এই ত্যাগের মর্যাদা দিতে আমি দিনরাত পরিশ্রম করেছি। ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা অর্জন করে দেশের মানুষের সেবা করাই আমার প্রধান লক্ষ্য।”
ছেলের সাফল্যে আনন্দের পাশাপাশি প্রয়াত স্বামীর কথা মনে করে আবেগাপ্লুত অংকুরের মা ফারহা বেগম তৃষ্ণা। তিনি বলেন, “অংকুরের বাবা মারা যাওয়ার পর ছেলেই আমার জীবনের একমাত্র আশা। অনেক কষ্ট করে তাকে পড়িয়েছি। আমি চাই, সে বড় হয়ে একজন ভালো মানুষ হোক এবং দেশের মানুষের জন্য কাজ করুক। সবাই আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন।”
অংকুরের এই সাফল্যে আনন্দিত বগুড়া জিলা স্কুলের শিক্ষক ও তার সহপাঠীরাও। শিক্ষকরা বলছেন, প্রতিকূলতার মধ্যেও অংকুর নিয়মিত পড়াশোনায় মনোযোগী ছিল। তার সাফল্য অন্য শিক্ষার্থীদের জন্যও অনুপ্রেরণার।
স্থানীয় সাংবাদিক সমাজের কাছেও অংকুরের সাফল্য বিশেষ আবেগের। কারণ তার প্রয়াত বাবা আসাদুজ্জামান ফিরোজ সাংবাদিকতা পেশায় সততা ও সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। সহকর্মীদের অনেকেই মনে করেন, বাবার রেখে যাওয়া আদর্শ ও স্বপ্নকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়েই অংকুর তার বাবার প্রতি সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা জানাতে পারবে। অংকুরের সামনে এখন নতুন পথ। এসএসসির সাফল্যকে পুঁজি করে উচ্চশিক্ষার।