
X
নাজমুল হাসান শান্ত জাতীয় দলে ব্যর্থ হয়েও বারবার সুযোগ পাওয়াতে হয়েছেন ট্রলের শিকার। গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ স্কোয়াডে ডাক পাওয়ার পরই শান্তকে নিয়ে বাড়ে সমালোচনার স্রোত। তার ব্যাটিং সামর্থ্য নিয়ে ওঠে প্রশ্ন। বিশ্বকাপে যদিও দলের হয়ে দুই ফিফটিতে তিনি করেন সর্বোচ্চ রান। তবে মন্থর খেলার ধরনে কুড়ি ওভারের চাহিদা তার ব্যাটে মিটছে কিনা, সেই সমালোচনা হতে থাকে তীব্র। অন্য সংস্করণেও শান্তর ব্যাটিং চলে আসে আতস কাঁচের নিচে। প্রতিটি ব্যর্থতার পর নানান রকম ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের শিকার হতে থাকেন এই বাঁহাতি ওপেনার। শান্তর এমন খেলার পিছনে সবচেয়ে বড় অবদানটা রেখেছেন টাইগারদের সাবেক কাপ্তান মাশরাফি মর্তুজা। সিলেটের হয়ে মাশরাফির নেতৃত্বে খেলেছিলেন শান্ত, তারপর থেকেই বদলে গেলো খেলার ধরন।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শান্তর অভিষেক। ২০১৬ সালের নিউজিল্যান্ড সফরে জাতীয় দলের প্রস্তুতিমূলক ক্যাম্পে নির্বাচকেরা নাজমুলকে বেছে নিয়েছিলেন। কেউ ঈদের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টের শুরুতে মমিনুল হকের ইনজুরির পর নাজমুলকে বাংলাদেশের টেস্ট দলে যোগ করা হয়। ক্রাইস্টচার্চে অভিষেকে তিনি ১৮ এবং ১২ রান করতে পেরেছিলেন। একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে আফগানিস্তানের বিপক্ষে হয়ে প্রথম অভিষেক ঘটে ২০১৮ সালের ২০ ডিসেম্বর। যদিও ২০১৮ এসএসসি উদীয়মান এশিয়া কাপের পর দল থেকে ছিটকে পড়েন কিন্তু পরবর্তীতে ২০১৯-২০ বাংলাদেশ ত্রিদেশীয় সিরিজে আবারো ডাক পায়। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি খেলায় প্রথম অভিষেক ঘটে ২০১৯ এর ১৮ই সেপ্টেম্বর জিম্বাবুয়ের বিপরীতে।
গত টি২০ বিশ্বকাপে বাকিদের ব্যর্থতার ভিড়ে আলো ছড়িয়েছিলেন তিনিই। ওই আসরে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ১৮০ রান করেন তিনি। টুর্নামেন্টে ৫ ম্যাচে মাঠে নেমে পান দুটি ফিফটির দেখা। কোচ খেলোয়াড় সবার মুখে একটাই কথা-শান্তর মানসিক দৃঢ়তা অনেক বেশি। তা না হলে এত ট্রল-সমালোচনায় এমন পারফরম্যান্স করা কখনোই সম্ভব না। ব্যাটে রান পেলেও শান্ত এখনো মানুষের মন যোগাতে পারেননি। তবে তার পাশে দাঁড়িয়েছেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। সিলেট স্ট্রাইকার্স অধিনায়কের মতে, শক্ত মানসিকতার শান্তর কাছ থেকে আগামীতে অনেক কিছুই পাবে দেশের ক্রিকেট।
একনজরে শান্তর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার
টেস্টে ২৩ ম্যাচে খেলেছেন ৪৪ ইনিংস রান করেছেন ১২৮৩, সর্বোচ্চ রান ১৬৩, এভারেজ ২৯.৮০, শতক হাকিয়েছেন ৪টি, অর্ধশতক ৩টি।
টি-টোয়েন্টিতে ২৫ ম্যাচে খেলেছেন ২৫ ইনিংসই রান করেছেন ৫৬৬, সর্বোচ্চ রান ৭১, এভারেজ ২৬.৯০, শতক ০ অর্ধশতক ৩টি।
ওয়ানডেতে ২৯ ম্যাচে ২৮ ইনিংস রান করেছেন ৮৩২ রান, সর্বোচ্চ রান ১১৭, শতক ২, অর্ধশতক ৪টি।
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে শান্তর মোট রান ২৬৮১।
এইতো বেশিদিন আগের কথা নয়, নাজমুল হোসেন শান্তর জাতীয় দলে থাকা নিয়েই প্রশ্ন তুলতো অনেকে। আর এখন সেই শান্তকে নিয়ে ক্রিকেটপ্রেমীরা আবেগতাড়িত হয়, প্রশংসা বৃষ্টিতে ভেজায়। সামপ্রতিক সময়ে শান্ত ব্যাট হাতে যেভাবে রান করেছেন তাতে তাকে যে কেউই প্রশংসায় ভাসাতে বাধ্য। চলমান এশিয়া কাপে আফগান স্পিনার মুজিব উর রহমানের বলে ফ্লিকে ১ রান নিলেন নাজমুল হোসেন শান্ত। এই রানেই সেঞ্চুরি পূর্ণ করলেন তিনি। খুব বেশি উল্লাস করতে দেখা গেল না তাকে, সাধারণত যেমন করতে দেখা যায়! তবে উদ্যাপনটা ছিল ইঙ্গিতপূর্ণ। নবজাতক পুত্রকে সেঞ্চুরি উৎসর্গ করলেন শান্ত। সেঞ্চুরি পূর্ণ করে হাতের ব্যাটটা এমনভাবে দোলালেন যেন বাচ্চা দোলাচ্ছেন। এশিয়া কাপ খেলতে যাওয়ার আগ মুহূর্তে পুত্র সন্তানের বাবা হয়েছেন এই বাঁহাতি ব্যাটার। বাবা হওয়ার পর টানা দুই ম্যাচে রান পেলেন তিনি। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ক্যান্ডিতে এশিয়া কাপের প্রথম ম্যাচে ৮৯ রান করেন শান্ত। আর লাহোরে ১০৫ বলে ১০৪ রানের ইনিংস খেলেন এ বাঁহাতি টপঅর্ডার ব্যাটার। ইনিংসে হাঁকান ৯টি চার ও দুটি ছক্কা।
এশিয়া কাপের ২ ম্যাচেই তার ব্যাট হেসেছে। ব্যাট হাতে শান্তর এই ফর্ম বাংলাদেশকে ভরসা দিচ্ছে। সামনেই যে বিশ্বকাপ! বেশ বড়সড় স্বপ্ন নিয়েই চলতি এশিয়া কাপে গিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে প্রথম ম্যাচে ব্যাটারদের ব্যর্থতায় মাত্র ১৬৪ রানে অলআউট হওয়া ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৫ উইকেটে হারে টাইগাররা। বাংলাদেশের করা ১৬৪ রানের মধ্যে ৮৯ রানই এসেছিল শান্তর ব্যাট থেকে। তবুও দিন শেষে তিনি পরাজিত দলে ছিলেন। কারণ বাকি ব্যাটাররা শান্তকে এতটুকু সমর্থন দিতে পারেননি। লম্বা সময় ধরেই ৩ নম্বরে ব্যাটিং করেন শান্ত। এই জায়গাতেই দারুণ সফল তিনি। তবে আফগানদের বিপক্ষে তাকে নামানো হলো ৪ নম্বরে। শঙ্কা জেগেছিল, পজিশন বদলে ফেলায় শান্তর ফর্মে প্রভাব পড়বে না তো! তাকেই তো ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করতে ৩ নম্বরে খেলানো হচ্ছে দীর্ঘদিন। তবে ৪ নম্বরে নেমে শুরু থেকেই দুর্দান্ত খেলতে থাকেন শান্ত। শুরু থেকেই তার শারীরিক ভাষা অপরপ্রান্তে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে মেহেদী হাসান মিরাজকেও।
আফগান পেসার ফজল হক ফারুকি গত কয়েক ম্যাচে বাংলাদেশি ব্যাটারদের জন্য ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিলেন। তাকে গতকাল শান্ত শুধু দুর্দান্তভাবে সামলাননি, রীতিমতো অসহায় করে তুলেছিলেন। ফিফটিও স্পর্শ করেন এই পেসারকে ছক্কা হাঁকিয়েই। লেগ সাইডের বাইরে করা ডেলিভারিকে স্কয়ার লেগের উপর দিয়ে মাঠের বাইরে পাঠান শান্ত। ৫৭ বলে ফিফটি স্পর্শ করা শান্ত সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন ১০১ বলে। রশিদ খানকে ৪২তম ওভারে দুটি চার মেরে কাজটা এগিয়েই রেখেছিলেন শান্ত। ওই ওভারেই ৯৯ রানে পৌঁছে যাওয়া শান্ত পরের ওভারে মুজিবের বলে সিঙ্গেল নিয়ে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে এটি তার দ্বিতীয় সেঞ্চুরি।
শান্তকে লম্বা রেসের ঘোড়া মনে করছেন মাশরাফি। শান্ত এখন যেমন ট্রল সহ্য করে যাচ্ছেন, এমন অবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে লিটন কুমার দাসকেও। বারবার দলে সুযোগ পেয়েও পারফরম্যান্স না করায় ভক্ত-সমর্থকদের ঠাট্টা সহ্য করতে হয়েছে তাকে। শান্তকে নিয়ে বলতে গিয়ে তাই মাশরাফির কথায় উঠে এসেছে লিটনের প্রসঙ্গও। মাশরাফি বলেন, 'শান্তর ক্ষেত্রেও কিন্তু একই জিনিস (লিটনের মতো ট্রল) হয়েছে। আপনি বিশ্বকাপে দেখেন, শান্ত কিন্তু আমাদের সবার বিপক্ষে গিয়ে প্রায় দুইশ রান করে এসেছে। পরে আবার স্ট্রাগল করেছে, এখন আবার রান করছে। শান্তকে কিছুটা এর ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে। আমি সবসময় বিশ্বাস করি যে বেসিক খেলোয়াড় উঠে আসা এই টুর্নামেন্ট থেকেই হয়।'
শান্তকে লম্বা রেসের ঘোড়া মনে করে মাশরাফি বলেন, 'মানসিকভাবে শক্তিশালী থাকা গুরুত্বপূর্ণ। যেটা শান্তর ক্ষেত্রে আমি দেখেছি। লিটনের মতো বাইরের জিনিসগুলো এত কানে নেয় না। এজন্য আমার বিশ্বাস হয়, এই ছেলেটা লম্বা রেসের ঘোড়া। এটা আমার কাছে মনে হয় সবকিছুতে আল্লাহর রহমত প্রয়োজন হয়। কারণ আমি বিশ্বাস করি এই ছেলেটা বাংলাদেশকে অনেক কিছু দিতে পারবে।'
গতকাল বাংলাদেশের ইনিংস শেষে নাজমুল নিজেই তা নিশ্চিত করলেন, ‘এই সেঞ্চুরিটা আমার ছেলেকে উৎসর্গ করছি।’ এশিয়া কাপ খেলতে যাওয়ার আগে গত ২৫ আগস্ট পুত্রসন্তানের বাবা হন নাজমুল। সেদিনটা আবার নাজমুলের জন্মদিনও। নাজমুল তাঁর ১০৪ রানের ইনিংসটি খেলেছেন ১০৫ বলে, ৯টি চার ও ২টি ছক্কা ছিল তাতে। উদ্বোধনে নামা মেহেদী হাসান মিরাজের সঙ্গে ১৯৮ রানের জুটি গড়েন। মিরাজও তাঁর ওয়ানডে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সেঞ্চুরি করেছেন। তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে ১১৯ বলে ১১২ রানের অপরাজিত ইনিংস। জোড়া সেঞ্চুরির সৌজন্যে বাংলাদেশ দল ৫ উইকেটে ৩৩৪ রান করেছে, যা এশিয়া কাপে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ। এখন শান্ততেই শান্তি বাংলার ক্রিকেট।
বাবু/জেএম