
X
আজ ১৮ ডিসেম্বর, আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস। দিনটি এলেই রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যানে উঠে আসে রেমিট্যান্সের অঙ্ক, বিদেশগামী শ্রমিকের সংখ্যা। কিন্তু এই সংখ্যার আড়ালে থেকে যায় লাখো মানুষের না বলা গল্প_ মা-বাবার কোল ছেড়ে যাওয়ার বেদনা, সন্তানের বেড়ে ওঠা মিস করার যন্ত্রণা আর অচেনা দেশে প্রতিদিন বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নে ঘরবাড়ি বন্ধক রেখে, সর্বস্ব বিক্রি করে পাড়ি জমান বহু মানুষ। বিমানে ওঠার মুহূর্তে চোখে জল লুকিয়ে তারা ভাবেন-এই কষ্ট হয়তো একদিন সাফল্যে রূপ নেবে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় ভেঙে দেয় সেই স্বপ্ন। প্রতিশ্রুত কাজ নেই, বেতন কম, কর্মঘণ্টা বেশি, থাকার জায়গা অমানবিক। ভাষা না জানার কারণে প্রতিবাদও করতে পারেন না অনেকেই।
দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। গ্রামের স্কুল, শহরের ভবন, উন্নয়ন প্রকল্প-সবখানেই তাদের অবদান। কিন্তু এই অর্থের পেছনে থাকে অসংখ্য না ঘুমানো রাত, না বলা কান্না। অনেক প্রবাসী মাসের পর মাস বেতন না পেয়েও অন্য কোন উপায় অবলম্বন করে দেশে টাকা পাঠাতে বাধ্য হন-কারণ দেশে অপেক্ষা করছে পরিবার।
বিদেশে অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাওয়া কঠিন। দেশে আপনজন কেউ মারা গেলেও অনেকের পক্ষে শেষবারের মতো দেখা সম্ভব হয় না। এই ত্যাগের কোনো পরিসংখ্যান নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অভিবাসন ব্যবস্থার বড় দুর্বলতা হলো যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া শ্রমিক পাঠানো। অধিকাংশ অভিবাসন প্রত্যাশী ভাষা জানেন না, শ্রম আইন বোঝেন না, চুক্তি পড়তে পারেন না। ফলে দালালের প্রতারণা আর নিয়োগকর্তার শোষণের শিকার হন সহজেই।
এখানেই রাষ্ট্রের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বিদেশে পাঠানোর আগে বাধ্যতামূলক, বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ এখন সময়ের দাবি-যেখানে থাকবে ভাষা শিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা, কর্মস্থলের নিরাপত্তা ও আইনি জ্ঞান।
অন্যদিকে, বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসীরা পাসপোর্ট, জন্ম নিবন্ধন, এনআইডি সহ অন্যান্য কাগজপত্রের জটিলতা, আইনি ও নৈতিক সহায়তা এবং বিভিন্ন সুবিধা গ্রহণে দূতাবাসের উপর নির্ভরশীল থাকেন। এই প্রেক্ষাপটে, প্রবাসীদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে দূতাবাসগুলোর ভূমিকা আরও কার্যকর হওয়া অত্যন্ত জরুরি। দূতাবাসগুলোকে শুধু কূটনৈতিক বা প্রশাসনিক কাজে সীমাবদ্ধ না রেখে, প্রবাসীদের জন্য একটি “সহযোগী কেন্দ্র” হিসেবে কাজ করতে হবে।
প্রবাস জীবনের আরেকটি অন্ধকার দিক হলো ফেরত আসা শ্রমিকদের জীবন। দীর্ঘদিন বিদেশে কাজ করে দেশে ফিরে অনেকেই বেকার হয়ে পড়েন। অর্জিত দক্ষতার স্বীকৃতি নেই, পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে কেউ হতাশায় ভোগেন, কেউ আবার ঝুঁকি নিয়ে পুনরায় বিদেশে পাড়ি জমান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশ ফেরত প্রবাসীদের জন্য নিরাপদ বাসস্থান, আলাদা কর্মসংস্থান নীতি, স্বল্প সুদে ঋণ এবং উদ্যোক্তা সহায়তা জরুরি।
আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবসে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য যথেষ্ট নয়। প্রবাসীরা করুণা চান না-তারা চান নিরাপদ কাজ, ন্যায্য মজুরি ও সম্মানজনক জীবন। যারা নিজেদের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছেন, তাদের প্রতি দায়বদ্ধতা আজ রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। রেমিট্যান্সের অঙ্ক যত বড়ই হোক, প্রবাসীদের কান্না যদি না কমে-তবে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।