
X
সংগৃহীত ছবি
মাতৃভাষায় কথা বলার জন্য বুকের তাজা রক্ত রাজপথে ঝরিয়ে দেওয়ার ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। একমাত্র বাঙালিরাই এই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা হোক- এই দাবি আদায়ে রাজপথে জীবন দিয়েছিলেন রফিক, শফিক, জব্বার, সালাম, বরকতসহ নাম না জানা অনেকে। ভাষা আন্দোলন থেকেই বীজ বোনো হয়েছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের।
দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের গল্প নিয়ে অসংখ্য সিনেমা নির্মিত হয়েছে। সেগুলো দেখে নতুন প্রজন্ম জানতে পারছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে। এটি খুবই আশার কথা। কিন্তু যেই আন্দোলন থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বীজ বোনা হয়েছিল, সেই ভাষা আন্দোলন বা ২১ ফেব্রুয়ারির প্রেক্ষাপট নিয়ে তুলনামূলকভাবে খুব কম চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। বাংলা চলচ্চিত্রে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন উঠে এসেছে বটে, তবে তা হাতেগোনা কয়েকটিতে সীমাবদ্ধ। বিস্তৃত পরিসরে এই গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসনির্ভর বিষয়টি এখনও বড় পর্দায় যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ফুটে উঠেছে যে সব চলচ্চিত্রে-
জীবন থেকে নেয়া : নির্মাতা জহির রায়হান ১৯৭০ সালে নির্মাণ করেছিলেন চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’। যেখানে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের ড্রাকুলা চরিত্রসহ ইতিহাসের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। জহির রায়হান এই চলচ্চিত্রে ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’কে নিয়ে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর লেখা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি’ গানটি ব্যবহার করেছিলেন। শুটিংয়ের সময় ‘পাকিস্তানি শাসকের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক চলচ্চিত্র’ নির্মাণের অভিযোগে জহির রায়হানকে ক্যান্টনমেন্টে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, কিন্তু পরে উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী। চলচ্চিত্রটিতে অভিনয় করেছেন রাজ্জাক, সুচন্দা, রোজী সামাদ, খান আতাউর রহমান, রওশন জামিল, আনোয়ার হোসেন প্রমুখ।
কলমীলতা : ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের রক্তবীজ, এ বিষয়টি নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে শহীদুল হক খান পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘কলমীলতা’য়। ১৯৮১ সালে এটি মুক্তি পায়। এতে পারিবারিক গল্পের আবহে নির্মাতা একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত টেনে নিয়েছেন গল্প। চলচ্চিত্রটি উৎসর্গ করা হয়েছে দেশের মাটি ও মানুষের জন্য, যারা শহীদ হয়েছেন তাদের স্মৃতির উদ্দেশে। এতে অভিনয় করেছেন কবরী, বুলবুল আহমেদ, সুচরিতা, ইলিয়াস কাঞ্চন, গোলাম মুস্তাফা, রোজী সামাদ, রওশন জামিল, টেলি সামাদ প্রমুখ।
বাঙলা : ২০০৬ সালে নির্মাতা শহীদুল ইসলাম খোকন নির্মাণ করেন ‘বাঙলা’। এটি নির্মাণ করা হয় আহমদ ছফার ‘ওঙ্কার’ উপন্যাসকে অবলম্বন করে। চলচ্চিত্রে নির্মাতা বাকপ্রতিবন্ধী নারী চরিত্র শাবনূরের কণ্ঠে উচ্চারণ করান ‘বাংলা’ শব্দটি। আর এই শব্দটি উচ্চারণের প্রেরণাও শাবনূর খুঁজে পান বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়া একটি মিছিলের স্লোগান থেকে। সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন শাবনূর, হুমায়ুন ফরীদি, মাহফুজ আহমেদ প্রমুখ।
ফাগুন হাওয়ায় : ২০১৯ সালে পরিচালক তৌকীর আহমেদ নির্মাণ করেন ‘ফাগুন হাওয়ায়’ চলচ্চিত্রটি। এর নামকরণে ফুটে উঠেছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন চলাকালে বাংলা মাস ফাল্গুনের নামটি। আর চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছে টিটো রহমানের বাংলা ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে লেখা ‘বউ কথা কও’ গল্প অবলম্বনে। ইতিহাসনির্ভর এ চলচ্চিত্রে মফস্বল শহরে ৫২’র ভাষা আন্দোলনকে চিত্রায়িত করা হয়েছে। এতে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন নুসরাত ইমরোজ তিশা ও সিয়াম আহমেদ। অন্যান্য ভূমিকায় রয়েছেন ফজলুর রহমান বাবু, আবুল হায়াত ও রওনক হাসানের মতো অভিনয়শিল্পীরা।
কেন ভাষা আন্দোলন নিয়ে সিনেমা হয় না : সিনেমাসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ভাষা আন্দোলনের মতো ঐতিহাসিক ঘটনা যথাযথভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে হলে গবেষণা, সময় ও বিশাল বাজেট দরকার। শুধু আবেগ দিয়ে এ ধরনের ছবি তৈরি সম্ভব নয়। এ ছাড়া ঐতিহাসিক গল্প নিয়ে নির্মাণের ক্ষেত্রে নিখুঁত বাস্তবতা তুলে ধরতে প্রচুর গবেষণা প্রয়োজন হয়, যা অনেক নির্মাতা করতে চান না। সরকার প্রতি বছর সিনেমার জন্য অনুদান দেয়। সে বাজেট থেকে ভাষা আন্দোলন নিয়ে সিনেমা নির্মাণে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
সময় এসেছে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো সংরক্ষণের জন্য বড় পরিসরে কাজ করার। একুশের চেতনা শুধু প্রামাণ্যচিত্র নয়, পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমার মাধ্যমে বড়পর্দায় তুলে ধরা দরকার, যাতে নতুন প্রজন্ম এর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারে। ভাষা আন্দোলনের গল্প শুধুই ইতিহাস নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের কথা। তাই এ চেতনা বড়পর্দায় নতুন করে প্রাণ দেওয়া এখন সময়ের দাবি!