ডুবো চর ও বর্জ্যে ইলিশশূন্য পায়রা, সংকটে ১৪ হাজার জেলে

আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি

সারাবাংলা

সামনেই ইলিশের ভরা মৌসুম। আষাঢ়-শ্রাবণের জোয়ারে রুপালি ইলিশে ভরে ওঠার কথা পায়রা নদী। ভরা মৌসুমেও পায়রা নদীতে কাঙ্ক্ষিত

2026-03-02T15:12:33+00:00
2026-03-02T15:12:33+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
ডুবো চর ও বর্জ্যে ইলিশশূন্য পায়রা, সংকটে ১৪ হাজার জেলে
আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬, ৩:১২ পিএম   (ভিজিট : ৬২)
সাগর মোহনায় জেলেদের নৌকা
X

সাগর মোহনায় জেলেদের নৌকা


সামনেই ইলিশের ভরা মৌসুম। আষাঢ়-শ্রাবণের জোয়ারে রুপালি ইলিশে ভরে ওঠার কথা পায়রা নদী। ভরা মৌসুমেও পায়রা নদীতে কাঙ্ক্ষিত রুপালি ইলিশের দেখা মেলে না। 

সাগর মোহনায় সৃষ্টি হওয়া ডুবো চরে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ইলিশ উল্টো পথে ফিরে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন জেলেরা। পাশাপাশি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের গরম পানি ও বর্জ্য নদীতে ফেলার কারণেও ইলিশের প্রবেশ ও প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক ড. মো. আনিছুর রহমান।
পায়রা নদীতে জেলেদের জালে ইলিশ ধরা না পড়ায় উপকূলের ১৪ হাজার ৬৮৯ জন জেলে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সাগর মোহনার ডুবো চর খনন করে পায়রা নদীতে ইলিশের প্রবেশ ও প্রজনন কার্যক্রম স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

জানা গেছে, বুড়িশ্বর বা পায়রা নদী বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বরিশাল, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৯০ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ১২০০ মিটার এবং এটি সর্পিলাকার। বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার কলসকাটি ইউনিয়নের পাণ্ডব নদী থেকে এর উৎপত্তি। পরে এ নদীর জলধারা বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। উজানের তুলনায় ভাটির দিক বেশি প্রশস্ত।
অন্যদিকে বিষখালী ও বলেশ্বর নদীও বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে। তিন নদীর মিলনস্থলকে জেলেরা ‘গাঙ্গের আইল’ নামে চেনেন। বিষখালী-বলেশ্বর মোহনায় রয়েছে লালদিয়া সমুদ্র সৈকত এবং পায়রা-বিষখালীর মোহনায় পদ্মাবাবুগঞ্জ চর। তিন নদীর মোহনায় গড়ে ওঠা এসব চর স্বাভাবিক জোয়ারের পানি প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে নদীর গভীরতা দিন দিন কমে যাচ্ছে।

পায়রা-বিষখালী মোহনায় বড়াইয়ার ডুবো চর ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ফকিরহাট থেকে আশার চর পর্যন্ত বিস্তৃত। এ চর বঙ্গোপসাগর থেকে পায়রা নদীতে জোয়ারের পানি প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করে। আশার চরের শেষ সীমানা থেকে শুরু হয়েছে নলবুনিয়ার ডুবো চর, যার বিস্তৃতি প্রায় ৭ থেকে ৮ কিলোমিটার। এটি পায়রা নদীর প্রবেশমুখে অবস্থিত।

প্রবেশমুখ অতিক্রম করে ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার ভেতরে পদ্মা ও কুমিরমারা ডুবো চর রয়েছে, যার বিস্তৃতি প্রায় ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার। ভাটার সময় এসব চরে মানুষ হাঁটাচলা করে এবং জেলেরা খুঁটি গেড়ে জাল ফেলে। জোয়ারের সময় এখানে তীব্র স্রোত ও ঢেউ সৃষ্টি হয়। ডুবো চরের কারণে সাগর থেকে জোয়ারের পানির সঙ্গে ইলিশের স্বাভাবিক প্রবেশ ব্যাহত হচ্ছে।

এ ছাড়া ২০১৯ সালে তালতলীর জয়ালভাঙ্গা এলাকায় বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন স্থানে আইসোটেক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। ২০২২ সালে কেন্দ্রটি উৎপাদনে যায়। এরপর থেকে কেন্দ্রের গরম পানি ও বর্জ্য পায়রা নদীতে ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে পায়রা নদীতে ইলিশ প্রবেশে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে অন্যান্য নদীর তুলনায় এখানে ইলিশ কম পাওয়া যাচ্ছে।

উপকূলীয় আমতলী ও তালতলীতে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১৪ হাজার ৬৮৯ জন। এর মধ্যে আমতলীতে ৬ হাজার ৭৮৯ এবং তালতলীতে ৭ হাজার ৯০০ জন জেলে রয়েছেন। অধিকাংশই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন। সারা বছর মাছ শিকার করেই তাদের সংসার চলে। মাছ ধরা পড়লে ভালোভাবে জীবনযাপন সম্ভব হয়, আর মাছ না পেলে উনুনে হাঁড়ি ওঠে না বলে জানান জেলে ছত্তার।

গভীর সাগর, উপকূলসংলগ্ন এলাকা এবং শাখা-প্রশাখা নদীতে তিন ধরনের জেলে মাছ শিকার করেন। ইলিশের ভরা মৌসুম আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র ও আশ্বিন-এই চার মাসে জেলেরা সারা বছরের আয় নিশ্চিত করেন। কিন্তু মৌসুমের এক মাস পেরিয়ে গেলেও পায়রা নদীতে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ ধরা পড়ছে না। দু-একটি মাছ জালে উঠলেও তা দিয়ে সংসার চলে না বলে জানিয়েছেন জেলেরা।

তাদের দাবি, সাগর মোহনার ডুবো চরই ইলিশ প্রবেশের প্রধান অন্তরায়। ডুবো চরের কারণে ইলিশ উল্টো পথে ফিরে যাচ্ছে। ফলে পায়রা নদীতে ইলিশ শিকারি জেলেদের জালে মাছ উঠছে না।
২০০৭ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে তীব্র ডুবো চরের সৃষ্টি হয়। এর ফলে জোয়ারের প্রথম ভাগে পায়রা নদীতে পানি প্রবেশের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়। অথচ ওই সময়ই ইলিশ নদীতে প্রবেশের উপযুক্ত সময়। ডুবো চরে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ইলিশ সাগরে ফিরে যায়। জোয়ারের মধ্যভাগে স্রোত বাড়লেও তখন ইলিশের প্রবেশ কমে যায়।

নলবুনিয়া গ্রামের জেলে আলমগীর হাওলাদার বলেন, ডুবো চর খনন করে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ফিরিয়ে না আনলে পায়রা নদীতে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ পাওয়া যাবে না। জেলেদের রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

জেলে ছত্তার, লাল মিয়া ও জাহিদ মোল্লা বলেন, জোয়ারের প্রথম ভাগে স্রোত কম থাকায় ইলিশ প্রবেশ করতে পারে না। মধ্যভাগে স্রোত বাড়লে কিছু মাছ জালে ধরা পড়ে। তাই পায়রা নদীতে ইলিশ কম পাওয়া যায়।

বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন  বলেন, ডুবো চরের কারণে পায়রা নদীর নাব্যতা কমেছে। এতে জোয়ারের স্রোতের তীব্রতা হ্রাস পাওয়ায় ইলিশ প্রবেশে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। ডুবো চর খনন করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে পারলে ইলিশ প্রবেশ ও প্রজননে বাধা থাকবে না।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট নদী কেন্দ্র, চাঁদপুরের অবসরপ্রাপ্ত মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক ড. মো. আনিছুর রহমান বলেন, সাগর মোহনায় নাব্যতা সংকট ও ডুবো চরের কারণে ইলিশের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ইলিশ চলাচলের জন্য গভীর পানির প্রয়োজন। গভীরতা না থাকায় ইলিশ নদীতে প্রবেশ করতে পারছে না। পাশাপাশি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের গরম পানি ও বর্জ্যও এ সমস্যার জন্য দায়ী।







Loading...
Loading...


সারাবাংলা এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy