
X
মহাস্থানের কটকটি
বাংলার প্রাচীন ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায়গুলোর অন্যতম কেন্দ্র মহাস্থানগড়। একসময় যা ছিল প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধনের রাজধানী, আজ সেই স্থানই পরিচিত আরেকটি কারণে ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন “কটকটি”। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে তৈরি হয়ে আসা এই মচমচে, শুকনো মিষ্টি এখন শুধু একটি খাবার নয়; এটি বগুড়ার সংস্কৃতি, মানুষের আবেগ, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং সম্ভাবনাময় রপ্তানি শিল্পের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
কটকটির ইতিহাস অনেকটাই লোককথা নির্ভর। স্থানীয়দের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে, প্রায় দেড়শ বছর আগে বগুড়ার গোকুল ইউনিয়নের কয়েকজন উদ্যোগী ব্যক্তি জয়নাল আলী মণ্ডল, ভোলা মণ্ডল ও গেদা মণ্ডল প্রথম এই খাবার তৈরি শুরু করেন। সে সময় কটকটি ছিল অনেক শক্ত। খাওয়ার সময় দাঁতে “কটকট” শব্দ হতো, আর সেই শব্দ থেকেই এর নাম হয়ে যায় “কটকটি”। ধীরে ধীরে এটি গ্রামের মেলা, বিয়ে কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং পরে মহাস্থানগড়কে ঘিরে গড়ে ওঠে এর বৃহৎ বাজার।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কটকটির প্রস্তুত প্রণালীতে এসেছে পরিবর্তন। গমের আটার বদলে এখন ব্যবহার হচ্ছে চালের গুঁড়া, সঙ্গে ঘি, ডালডা, সয়াবিন তেল ও বিভিন্ন সুগন্ধি মসলা। তৈরির প্রক্রিয়াটিও এখন কিছুটা আধুনিক হলেও মূল কৌশল একই রয়ে গেছে। প্রথমে চালের গুঁড়া বা আটা, তেল ও মসলা মিশিয়ে খামির তৈরি করা হয়। এরপর সেই খামির ছোট ছোট বর্গাকারে কেটে গরম তেলে ভাজা হয়। ভাজার পর সেগুলো ডুবানো হয় আখ বা খেজুর গুড়ের ঘন সিরায়। ঠান্ডা হলে তৈরি হয় মুচমুচে, সুস্বাদু কটকটি। কারিগরদের মতে, এই পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ভাজার সময় নিয়ন্ত্রণ ও সিরার সঠিক ঘনত্ব, যা নির্ধারণ করে কটকটির স্বাদ।
বর্তমানে কটকটির বাজারদর মানভেদে ভিন্ন। ভালো মানের ঘি-ভাজা কটকটি প্রতি কেজি ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। ডালডা-ভাজা কটকটির দাম ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, আর সাধারণ চালের গুঁড়ার কটকটি বিক্রি হয় ১৫০ থেকে ২০০ টাকায়। এই দামের ভিন্নতা কাঁচামাল ও স্বাদের পার্থক্যের কারণে হলেও সব ধরনের কটকটিরই বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
এই চাহিদাকে কেন্দ্র করে মহাস্থানগড়ে গড়ে উঠেছে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। প্রতিদিন গড়ে ১৫০ থেকে ২০০ মণ কটকটি বিক্রি হয়, যা কেজিতে প্রায় ৬ থেকে ৮ হাজার। গড় মূল্য প্রতি কেজি ২৫০ টাকা ধরে হিসাব করলে প্রতিদিন প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার লেনদেন হচ্ছে। সেই হিসাবে বছরে এই শিল্প থেকে প্রায় ৫৫ থেকে ৭০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বিশেষ দিনগুলোতে এই লেনদেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বৈশাখের শেষ বৃহস্পতিবারে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী মেলায় একদিনেই ১০০০ থেকে ২০০০ মণ কটকটি বিক্রি হয়, যা টাকার অঙ্কে এক কোটি ছাড়িয়ে যায়।
মহাস্থানের কটকটি শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর প্রজন্মভিত্তিক উত্তরাধিকার। এখানকার অনেক পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। নাছির মন্ডল, যিনি মহাস্থানগড়ের অন্যতম বড় কটকটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী, জানান, “আমাদের পরিবার পাঁচ প্রজন্ম ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে আছে। আমার দাদারা হাটে হাটে ঘুরে কটকটি বিক্রি করতেন। এখন আমরা প্রতিদিন কয়েক মণ উৎপাদন করি। শুক্রবারে বিক্রি দ্বিগুণ হয়ে যায়, আর বৈশাখের মেলায় পুরো এলাকা মিলিয়ে হাজার মণের মতো কটকটি বিক্রি হয়। এখন বিদেশ থেকেও অর্ডার আসে, এটা আমাদের জন্য গর্বের।”
একই ধরনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন লাল মিয়া পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের একজন প্রতিনিধি। তাদের ব্যবসার ইতিহাস প্রায় দেড়শ বছরেরও বেশি পুরোনো। তিনি বলেন, “আমার দাদা এই ব্যবসা শুরু করেছিলেন, বাবা চালিয়েছেন, এখন আমরা চালাচ্ছি। আগে ছোট পরিসরে ছিল, এখন বড় দোকান হয়েছে। শীতকাল, শুক্রবার ও ধর্মীয় উৎসবে বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। আমরা চেষ্টা করি আগের স্বাদ ঠিক রাখতে, কারণ এটাই আমাদের পরিচয়।”
মহাস্থানের কটকটি শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই আনছে না, এটি স্থানীয় কর্মসংস্থানের একটি বড় ক্ষেত্র তৈরি করেছে। হাজারো নারী-পুরুষ এই শিল্পের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত। কারিগর, দোকানি, পরিবহন শ্রমিক, কাঁচামাল সরবরাহকারী সব মিলিয়ে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পখাত। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, অনেক নারী এখন কটকটি তৈরির বিভিন্ন ধাপে যুক্ত হচ্ছেন খামির তৈরি, কাটা, শুকানো এবং প্যাকেজিংয়ে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। ফলে গ্রামীণ নারীদের আর্থিক স্বাবলম্বিতা বাড়ছে এবং বেকারত্ব হ্রাস পাচ্ছে।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও কটকটির গুরুত্ব অনেক। হযরত শাহ সুলতান মাহমুদ বলখী (রহ.)-এর মাজারকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন হাজারো মানুষ মহাস্থানে আসেন। তারা জিয়ারত শেষে তবারক হিসেবে কটকটি নিয়ে যান। শুক্রবার, শবে বরাতসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় কটকটির বিক্রিও বেড়ে যায় কয়েকগুণ। সাধারণ দিনে যেখানে ১৫০–২০০ মণ বিক্রি হয়, সেখানে শুক্রবারে তা ২০০–৩০০ মণে পৌঁছে যায়। শবে বরাত বা অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবে বিক্রি ৩০০ মণের বেশি হয়। আর বৈশাখের শেষ বৃহস্পতিবারের মেলায় বিক্রি দাঁড়ায় ১০০০-২০০০ মণে।
বর্তমানে কটকটি দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিচিতি পাচ্ছে। ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত প্রবাসী বাঙালিরা এটি অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে সংগ্রহ করেন। কেউ সরাসরি মহাস্থান থেকে কিনে নিয়ে যান, আবার কেউ অর্ডারের মাধ্যমে সংগ্রহ করেন। ব্যবসায়ীদের মতে, উন্নত প্যাকেজিং, মান নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা গেলে কটকটি সহজেই একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডে পরিণত হতে পারে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। মান নিয়ন্ত্রণের অভাব, আধুনিক প্যাকেজিংয়ের ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব এখনো বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবুও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা আশাবাদী-সরকারি সহায়তা ও সঠিক পরিকল্পনা থাকলে কটকটি একদিন দেশের অন্যতম রপ্তানি পণ্য হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মহাস্থানের কটকটি শুধু একটি ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন নয়; এটি একটি ইতিহাস, একটি সংস্কৃতি, একটি অর্থনৈতিক শক্তি এবং একটি সম্ভাবনার গল্প। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকা এই শিল্প আজ বিশ্বমুখী। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে “বগুড়ার কটকটি” খুব শিগগিরই আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে-এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সবার।