ধ্বংসের মুখে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি!

মোঃ রজব আলী, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর)

সারাবাংলা

দেশের একমাত্র লাভজনক কয়লা খনি হিসেবে পরিচিত দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া খনি এখন বহুমুখী সংকটে পড়েছে।ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ কয়লা মজুদ, বিক্রয়মূল্যে

2026-04-04T18:18:23+00:00
2026-04-04T18:18:23+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
ধ্বংসের মুখে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি!
মোঃ রজব আলী, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর)
প্রকাশ: শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৬:১৮ পিএম   (ভিজিট : ১৮৬)
বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি
X

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি

দেশের একমাত্র লাভজনক কয়লা খনি হিসেবে পরিচিত দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া খনি এখন বহুমুখী সংকটে পড়েছে।

ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ কয়লা মজুদ, বিক্রয়মূল্যে বৈষম্য, বিপণনে সীমাবদ্ধতা ও নীতিগত অসংগতির কারণে খনিটি ধীরে ধীরে লোকসানের দিকে যাচ্ছে—এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

২০০৫ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর পর বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি ধারাবাহিকভাবে সাফল্যের সঙ্গে পরিচালিত হয়ে আসছিল। ২০১১-১২, ২০১৩-১৪ এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জাতীয় পর্যায়ে সেরা করদাতা হিসেবে স্বীকৃতিও পায় প্রতিষ্ঠানটি। এ পর্যন্ত ভ্যাট, কর, রয়্যালটি ও অন্যান্য খাতে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়েছে খনিটি। সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান যেখানে লোকসানে, সেখানে বড়পুকুরিয়া ছিল ব্যতিক্রম। তবে সাম্প্রতিক সময়ের কিছু সিদ্ধান্ত খনিটির সেই অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, খনির কোল ইয়ার্ডে বিপজ্জনকভাবে কয়লা মজুদ বেড়েছে। যেখানে ধারণক্ষমতা ২ লাখ ২০ হাজার টন, সেখানে বর্তমানে প্রায় ৬ লাখ টন কয়লা জমে আছে। স্বাভাবিক নিয়মে ৫ থেকে ৭ ফুট উচ্চতায় কয়লা সংরক্ষণ করা হলেও এখন তা প্রায় ৫০ ফুট ছাড়িয়েছে। এতে ধসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এমনকি বাউন্ডারি দেয়াল ভেঙে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।

অতিরিক্ত মজুদের কারণে কয়লার স্তূপে মাঝেমধ্যে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটছে, যা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

খনি কর্তৃপক্ষের দাবি, বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র দীর্ঘদিন আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় উৎপাদিত কয়লার বড় অংশ ব্যবহার হয়নি। বর্তমানে তিনটি ইউনিটের মধ্যে মাত্র একটি চালু রয়েছে। ফলে উৎপাদিত কয়লা ইয়ার্ডে জমে থাকছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে খনি থেকে উত্তোলিত কয়লা কেবল বিদ্যুৎ কেন্দ্রেই সরবরাহের সিদ্ধান্ত রয়েছে। দেশীয় বাজারে (ডোমেস্টিক ও শিল্পখাত) ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সেখানে বিক্রির অনুমতি নেই। এতে একদিকে দেশীয় উন্নত মানের কয়লা অবিক্রিত থাকছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে নিম্নমানের কয়লা আমদানি করা হচ্ছে। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপরও চাপ বাড়ছে।

তাঁরা বলেন কয়লা বিক্রির মূল্য নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। খনি থেকে উৎপাদন ব্যয় প্রতি টন প্রায় ১৭৬ ডলার হলেও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) তা কিনছে মাত্র ১৩৬ ডলারে। ফলে প্রতি টনে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে খনিকে। আন্তর্জাতিক বাজারে যেখানে কয়লার দাম ২০০ ডলারের বেশি, সেখানে এত কম দামে বিক্রি করাকে অযৌক্তিক বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

খনির পরিচালনা পর্ষদে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, একই পক্ষ ক্রেতা ও মূল্য নির্ধারক হওয়ায় স্বচ্ছতা ব্যাহত হচ্ছে। এক কর্মকর্তা বলেন, “ক্রেতা নিজেই যদি দাম নির্ধারণ করে, তাহলে বিক্রেতা ন্যায্য মূল্য পাবে কীভাবে?”

এ পরিস্থিতিকে পরিকল্পিত লোকসানের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন অনেকে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অচলাবস্থা আড়াল করতে খনিটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্বল করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে লোকসানের অজুহাতে খনি বন্ধ হয়ে গেলে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে জড়িত ২০ থেকে ২৫ হাজার পরিবার জীবিকা হারাতে পারে।

এ বিষয়ে বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জোবায়ের হোসেন বলেন, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র কয়লা গ্রহণ না করায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তিনি এ সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

অন্যদিকে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দুটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে। এ কারণে পুরো উৎপাদিত কয়লা গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

খনি সংশ্লিষ্ট ও স্থানীরা বলছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত কিছু পদক্ষেপ জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে—দেশীয় বাজারে আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কয়লা বিক্রির অনুমতি, পিডিবির জন্য কয়লার মূল্য পুনর্নির্ধারণ এবং পরিচালনা পর্ষদে স্বার্থসংঘাত দূর করা।

তাঁদের মতে, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। নীতিগত অসংগতি ও অব্যবস্থাপনায় এই প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব পড়বে হাজারো মানুষের জীবনযাত্রা ও জাতীয় অর্থনীতিতে।

এখন দেখার বিষয়, সংকট সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।





Loading...
Loading...


সারাবাংলা এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy