
X
রাজনগরের ভিজিডি চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ
মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়ন পরিষদে ভিজিডি (VGD) কর্মসূচির চাল বিতরণকে কেন্দ্র করে অনিয়মের গুরুতর অভিযোগে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ওজনে কম চাল দেওয়া, সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে নগদ অর্থ সংগ্রহ করে তা দীর্ঘদিন ব্যাংকে জমা না দেওয়া এবং সরকারি নির্দেশনা লঙ্ঘনের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
গত ২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ভিজিডির চাল ও নগদ অর্থ বিতরণে অনিয়মের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে বিষয়টি সামনে আসে। এর পরপরই ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে ১৭৩ জন সুবিধাভোগীর তালিকা অনুযায়ী প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার ৭০০ টাকা টেংরা বাজার শাখা রূপালী ব্যাংকে জমা দেয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে এ অর্থ ব্যাংকে জমা না হওয়ায় সুবিধাভোগীরা তাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত ছিলেন।
টেংরা বাজার শাখা রূপালী ব্যাংকের ম্যানেজার রাহাত চৌধুরী জানান, সম্প্রতি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ১৭৩ জনের তালিকা ও প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার ৭০০ টাকা জমা দেওয়া হয়েছে। এর আগে পাঁচ-ছয় মাস আগে একবার টাকা জমা দেওয়া হলেও এরপর আর কোনো ভিজিডি সংক্রান্ত অর্থ বা তালিকা ব্যাংকে পাঠানো হয়নি।
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা বলেন,সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সুবিধাভোগীদের নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে ২২০ টাকা জমা দিয়ে রিসিট প্রদর্শনের পরই চাল দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। এর কোনো ব্যতিক্রমের সুযোগ নেই। প্রাপ্ত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
টেংরা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান রাম দুলালী মুনিয়া বলেন, গত সাত মাস ধরে পরিষদ থেকে ভিজিডির চাল বিতরণ করা হচ্ছে। এ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একজন ব্যক্তিকে টাকা সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সুবিধাভোগীরা ২২০ টাকা প্রদান করে তালিকায় স্বাক্ষর দিয়ে ৩০ কেজি চাল গ্রহণ করছেন।
তিনি দাবি করেন, শুরুতে অনেক সুবিধাভোগীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট না থাকায় চার থেকে পাঁচ মাস আগে সংগৃহীত অর্থ পরিষদের কাছেই রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৭৭ জনের অ্যাকাউন্টে পর্যায়ক্রমে টাকা পাঠানো হয়েছে।
তবে চেয়ারম্যান আরও জানান, ইউনিয়নের এক গ্রাম পুলিশ উদ্যোক্তার কাছ থেকে প্রায় ৭৫ হাজার টাকা গ্রহণ করেন, যা দ্রুত ফেরত আনার জন্য তাকে চাপ দেওয়া হচ্ছে।
সুবিধাভোগীরা বলছেন,তাদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ নেওয়া হলেও ব্যাংকে জমা দেওয়ার বিষয়ে কিছুই জানানো হয়নি।
পূর্ব ইলাশপুর গ্রামের রোকসানা বেগম বলেন,আমরা আগে জানতাম না যে টাকা ব্যাংকে জমা দিতে হয়। নয় মাসেও জানি না আমাদের টাকা কোথায় আছে, আর চালও অনেক সময় কম দেওয়া হয়েছে।
একই গ্রামের রুনা বেগম বলেন, অনিয়ম প্রকাশ হওয়ার পর আমাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আগে কখনো এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি অজয় পাল প্রথমে অভিযোগ অস্বীকার করলেও পরে স্বীকার করেন, তিনি কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করেছেন। তার ভাষায়, আমি নিজে কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি, যা বলা হয়েছে তাই করেছি।
এ ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে অসহায় সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে সংগৃহীত প্রায় ৭৫ হাজার টাকা কীভাবে একজন গ্রাম পুলিশের সদস্যের হাতে গেল? যে অর্থ সরাসরি ব্যাংকে জমা হওয়ার কথা,সেটি কেন ব্যক্তির কাছে রাখা হলো এবং কোন প্রক্রিয়ায় তা হস্তান্তর করা হয়েছিল তা এখনো অস্পষ্ট।
দীর্ঘদিন পর সেই টাকা ফেরত আনার জন্য চেয়ারম্যানের চাপ প্রয়োগ নতুন করে সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। এতে একাধিক ব্যক্তির সম্পৃক্ততা আছে কি না,তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন,পুরো প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক তদারকির ঘাটতি স্পষ্ট।
এ বিষয়ে রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপুল সিকদার বলেন, এই অনিয়মের ঘটনায় দ্রুত একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির প্রতিবেদনে যারা দোষী সাব্যস্ত হবেন, তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ধরনের ঘটনায় কোনো ছাড় নেই, কারণ এর সঙ্গে জড়িত রয়েছেন হতদরিদ্র মানুষ।
তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখানো হবে না এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মিজানুর রহমানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।