
X
মালচিং পদ্ধতিতে চাষাবাদ
পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক একটি কৃষি প্রযুক্তি হচ্ছে মালচিং পদ্ধতি। তাই অনেক কৃষক এই পদ্ধতিতে সবজি চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। দ্বিগুণ ফলন ও ভালো বাজার দরে সবজি বিক্রি করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার অনেক চাষি লাভবান হচ্ছেন।
জানা যায়, মালচিং পদ্ধতিতে প্রথমে জমিতে পরিমিত রাসায়নিক ও জৈব সার দিয়ে সারি সারি বেড তৈরি করা হয়। পরে সারিবদ্ধ বেডগুলো পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। বেডে নির্দিষ্ট দূরত্বে পলিথিন ফুটো করে বীজ বা চারা রোপণ করতে হয়। চারা রোপণের পর শুধু দেখভাল করা ছাড়া তেমন কোনো পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। মালচিং পেপার দ্বারা ঢেকে দেওয়ার কারণে ছত্রাক বা রোগ-বালাইয়ের আক্রমণ হয় না বললেই চলে। জমির পরিচর্যার জন্য তেমন শ্রমিকের প্রয়োজন হয় না।
ফলে উৎপাদন খরচ হয় খুব কম। এই পদ্ধতিতে ফলন হয় দ্বিগুণ, পরিশ্রম কম হয়। এ পদ্ধতি অনেক সহজলভ্য লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব। এদিকে মালচিং ব্যবহার করে উচ্চমূল্যে ফসল উৎপাদন প্রদর্শনী জন্য বাংলাদেশ টেকসই পুনরুদ্ধার জরুরি প্রস্তুতি এবং প্রতিক্রিয়া প্রকল্প (বি-স্ট্রং) মাধ্যমে সদর উপজেলা কৃষি অফিস কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে মালচিং পেপার দিচ্ছে।
সদর উপজেলার সুহিলপুর ইউনিয়নের মীরহাটি গ্রামের কৃষক মো. রায়হান বলেন, মালচিং পদ্ধতিতে গত ৬/৭বছর ধরে ফসল আবাদ করে আসছি। মালচিং পদ্ধতি চাষাবাদের ফলে সবজি মাটি থেকে সঠিকভাবে খাদ্য গ্রহণ করতে পারে। অতি বৃষ্টিতে সহনশীলতায় রাখা যায়। মালচিং পদ্ধতির ফলে রোগবালাইও কম হয়। এ বছর প্রায় ছয় বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করা হয়েছে। এবছর আশা করা যাচ্ছে খরচ বাদে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা ব্যবসা করা যাবে। কৃষি অফিস থেকে আমাদের খোঁজ খবর নিচ্ছে এবং প্রদর্শনীর এক বিঘা জমিতে মালচিং দিয়েছে কৃষি অফিস।
সুহিলপুর ইউনিয়নের সুহিলপুর গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, বিগত ৫ বছর ধরে মালচিং পদ্ধতিতে সবজি চাষ করছি। মালচিং পদ্ধতিতে চাষাবাদের ফলে আমাদের খরচ অনেক অংশে কমে আসছে। মালচিং পদ্ধতি চাষাবাদে মাটির আর্দ্রতা ঠিক থাকে এবং পোকামাকড় জমি নষ্ট করতে পারে না। মালচিং পদ্ধতিতে চাষাবাদের ফলে মাটিতে আগাছাও হয় না। এ বছর ২ কানি জমিতে সূর্যডিম জাতের তরমুজ আবাদ করেছেন।
তালশহর পূর্ব ইউনিয়নের মহনপুর গ্রামের কৃষক বিল্লাল মিয়া বলেন, মালচিং পদ্ধতিতে সবজি চাষ করে কম সময়ে অল্প খরচে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া যায়। এ বছর দেড়কানি জমিতে শসা আবাদ করেছেন।
সদর উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সরকার নাসির উদ্দিন বলেন, মালচিং পদ্ধতি চাষে জমির আর্দ্রতা ঠিক থাকে, আগাছা কম জন্মে, জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। মালচিং পদ্ধিতিতে চাষাবাদের সুবিধা হচ্ছে কৃষক এক বারই সার ও বীজ বপন করে ফেলে, পরবর্তীতে আর সার দিতে হয় না।
সদর উপজেলা কৃষি অফিসার শাহানা বেগম জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলায় দিন দিন উদ্যোক্তা কৃষক বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারা নিজেদের উদ্যোগে মালচিং পেপার ব্যবহার করে আসছিলেন। সদর উপজেলায় এই প্রথম বাংলাদেশ টেকসই পুনরুদ্ধার জরুরি প্রস্তুতি এবং প্রতিক্রিয়া প্রকল্প (বি-স্ট্রং) আওতায় সদর উপজেলায় ৬০ জন উদ্যোক্তা কৃষকের মধ্যে উচ্চমূল্যের ফসল চাষের জন্য মালচিং পেপার সরবরাহ করা হয়েছে। প্রত্যেক কৃষককে ৩৩ শতক জায়গার সপরিমান মালচিং পেপার দেওয়া হয়েছে। তবে আমাদের উদ্যোক্তা কৃষকরা অনেক বড় জমি লিজ নিয়ে নিজ খরচে এ মালচিং পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে থাকে। ৬০জন কৃষকের মধ্যে ২২ জন কৃষক গ্রীষ্মকালীন শসা, আটজন কৃষক অফসিজন তরমুজ, আর বাকি কৃষকেরা টমেটো চাষাবাদ করেছেন।
তিনি জানান, এই উচ্চমূল্যের ফসলে মালচিং ব্যবহারের কারণে অতিরিক্ত আগাছা, সার ও সেচের ব্যবহার কমে যায়। বি-স্ট্রং প্রকল্প থেকে সরবরাহকৃত মালচিং পেপার বায়ু ডিগ্রীডেবল। এটা তিন সিজন পরপর ব্যবহার করা যাবে। একটা সময় পর এটা মাটির সাথে মিশে যাবে। বেশিরভাগ মালচিং পেপার পরিবেশবান্ধব না। এই পেপারটা পরিবেশবান্ধব। এটি বিশ্ব ব্যাংকের একটি প্রকল্প। বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে এ প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে। এ প্রকল্পের কারণে কৃষকরা বেশ সুবিধা পাচ্ছে। এ মালচিং পেপারের জন্য কৃষকের মাঝে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। উচ্চ মূল্যের ফসল চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালীন টমেটো, শসা, এবং অফসিজন তরমুজ, মরিচ ও শসা এই ফসলগুলো ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ব্যাপক সারা লাভ করেছে। আগামীতে আগ্রহী কৃষকের সংখ্যা আরো বাড়বে। আমরা যদি এই প্রকল্পের মাধ্যমে আরো কৃষককে সাহায্য করতে পারি তাহলে বাংলাদেশ উপকৃত হবে।