
X
মূল আসামি গ্রেফতার
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে গত দুই বছর ধরে নিখোঁজ ছিলেন উপজেলার জয়াগ গ্রামের মৃত আবুল কালাম আজাদের দ্বিতীয় স্ত্রী কমলা বেগম ও তার ছেলে মো. নোমান।
রোববার (২৪ মে) দুপুরে উপজেলার জয়াগ গ্রামের আবু আমিনের বাড়ির পুকুর থেকে তাদের দুইজনের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় নিহত কমলা বেগমের দুই সৎ ছেলে সাইফুল ইসলাম রাজন ওরফে রাজু, জিয়াউর রহমান সাগর এবং এক নাতি আশিকুর রহমান টিপুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এক কোটি টাকা মূল্যের সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে এই লাশ গুম করা হয়। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসায় উপজেলাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে চাঞ্চল্যকর ক্লুলেস এই মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), নোয়াখালী ইউনিট। একটি মোবাইলের সূত্র ধরে পরতে পরতে অনুসন্ধান, সন্দেহভাজনদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে অবশেষে এই হত্যা রহস্য উন্মোচিত হয়। সিআইডির বর্ণনায় লোমহর্ষক সেই ঘটনার নানা তথ্য উঠে এসেছে।
সিআইডি জানায়, ২০১২ সালের দিকে বিধবা কমলা বেগম নতুন করে সংসার জীবনে পা রাখেন। মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি বিপত্নীক আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে দ্বিতীয় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। দু’জনেরই এটি ছিল দ্বিতীয় বিয়ে। এই সংসারেই জন্ম নেয় আবুল কালাম আজাদ ও কমলা বেগমের পুত্র সন্তান মো. নোমান। অন্যদিকে আবুল কালাম আজাদের প্রথম পক্ষের সংসারে ছিল পাঁচ ছেলে, যাদের মধ্যে তিনজন এখন জীবিত। প্রথম পক্ষের সন্তান, তাদের স্ত্রী-সন্তান এবং নিজের সন্তানকে নিয়ে কমলা বেগম ধীরে ধীরে একটি বড় পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন।
প্রায় সাত-আট বছর আগে আবুল কালাম আজাদের মৃত্যু হলে কমলা বেগমের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। স্বামীর মৃত্যুর পরও কমলা বেগম তার একমাত্র ছেলে মো. নোমান এবং সৎ সন্তানদের সঙ্গে একই বাড়িতে শান্তিপূর্ণভাবেই বসবাস করছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালের ১০ মার্চ কমলা বেগমের সৎ ছেলে জিয়াউর রহমান ওরফে সাগর সোনাইমুড়ী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডিতে উল্লেখ করা হয়, ৯ মার্চ থেকে কমলা বেগম নিখোঁজ রয়েছেন এবং মোবাইল ফোনেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
এই খবর পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ছুটে আসেন কমলা বেগমের ছোট বোন রহিমা বেগম। রহিমা বেগম এসে সৎ ছেলে জিয়াউর রহমান ওরফে সাগর ও সাইফুল ইসলাম ওরফে রাজন ওরফে রাজুকে তার বোন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তারাও কমলা বেগমকে খুঁজে পাচ্ছেন না বলে জানান। তবে রহিমা বেগম তাদের কথায় পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারেননি। বোনের হঠাৎ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় কোনো স্বাভাবিকতা খুঁজে না পেয়ে রহিমা বেগম নিজেই বাদী হয়ে ১৪ মার্চ ২০২৪ তারিখে নোয়াখালীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এ একটি পিটিশন মামলা দায়ের করেন। সেখানে জিয়াউর রহমান ওরফে সাগর, সাইফুল ইসলাম ওরফে রাজন ওরফে রাজু, শ্যামলী ও কাজল নামের চারজনকে সন্দেহভাজন বিবাদী করা হয়।
আদালত প্রথমে জেলা গোয়েন্দা শাখাকে (ডিবি) অনুসন্ধানের নির্দেশ দেন। পরে আরও গভীর অনুসন্ধানের জন্য মামলাটি সিআইডি নোয়াখালীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রায় তিন মাস ধরে নানা অনুসন্ধান, তথ্য সংগ্রহ ও সন্দেহভাজনদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের পর অবশেষে ২০২৪ সালের ৪ জুন সিআইডির অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তার আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত সোনাইমুড়ী থানায় একটি নিয়মিত মামলার নির্দেশ দেন এবং তদন্তভার সিআইডিকে দেওয়া হয়।
তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে সিআইডি জানতে পারে, মৃত্যুর আগে আবুল কালাম আজাদ তার দ্বিতীয় স্ত্রী কমলা বেগম এবং তাদের একমাত্র শিশু সন্তান মো. নোমানের নামে বসতবাড়িসহ সংলগ্ন প্রায় ৩০ শতাংশ জমি লিখে দিয়েছিলেন। বর্তমান বাজারমূল্যে যার মূল্য প্রায় এক কোটি টাকা। এই সম্পত্তিকে কেন্দ্র করেই দীর্ঘদিন ধরে প্রথম সংসারের সন্তানদের সঙ্গে বিরোধ চলে আসছিল। অভিযুক্ত জিয়াউর রহমান ওরফে সাগর বিদেশ থেকে দেশে ফিরে সম্পত্তি নিজেদের নামে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য কমলা বেগমের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। এছাড়া একটি জমি বিক্রির টাকা ভাগবাটোয়ারা নিয়েও তীব্র বিরোধ সৃষ্টি হয়। তদন্তে আরও উঠে আসে, ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে অভিযুক্তরা কমলা বেগম ও তার শিশু ছেলে মো. নোমানকে মারধর করে এবং প্রাণনাশের হুমকি দেয়।
দীর্ঘ তদন্তের এক পর্যায়ে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ভিকটিম কমলা বেগমের ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করতে সক্ষম হয় সিআইডি। জিজ্ঞাসাবাদে সিআইডি জানতে পারে, মোবাইল ফোনটি ঢাকার সবুজবাগ এলাকার একটি বাসা থেকে ভাঙারি মালামালের সঙ্গে বিক্রি করা হয়েছিল। সিআইডি জানতে পারে, মামলার এজাহারভুক্ত আসামি সাইফুল ইসলাম ওরফে রাজন ওরফে রাজু একসময় ওই বাসাতেই ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করতেন।
অবশেষে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় সিআইডি নোয়াখালীর একটি দল ২০২৬ সালের ২১ মে রাতে ময়মনসিংহের কোতোয়ালী থানার ভাটিকাশর এলাকা থেকে আসামি সাইফুল ইসলাম ওরফে রাজন ওরফে রাজুকে গ্রেপ্তার করে। সাইফুল ইসলাম ওরফে রাজন ওরফে রাজুর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরদিন ২২ মে সন্ধ্যায় সোনাইমুড়ী জিরো পয়েন্ট এলাকা থেকে অপর আসামি জিয়াউর রহমান ওরফে সাগর এবং তদন্তে উঠে আসা সহযোগী অভিযুক্ত আশিকুর রহমান টিপুকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আদালতের অনুমতিতে তিন দিনের রিমান্ডে এনে তাদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা।
জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্তরা স্বীকার করে যে, সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে ঘটনার প্রায় পনেরো দিন আগেই তারা হত্যার পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আবু আমিনের বাড়ির পাশের পুকুরপাড়ে আগেই একটি গর্ত খুঁড়ে রাখা হয়।
২০২৪ সালের পহেলা মার্চ রাতে কমলা বেগম ও তার শিশু ছেলে মো. নোমানের খাবারের পানির সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেওয়া হয়। গভীর রাতে তারা অচেতন হয়ে পড়লে অভিযুক্তরা ঘরে প্রবেশ করে। এরপর গলায় গামছা পেঁচিয়ে, হাত দিয়ে গলা চেপে এবং বালিশ চাপা দিয়ে মা ও শিশুপুত্রকে হত্যা করা হয়। হত্যার পর অপরাধের কোনো চিহ্ন যাতে না থাকে, সেজন্য তারা ভিকটিমদের পরনের কাপড় খুলে ফেলে এবং পূর্বপ্রস্তুত জায়গায় লাশ দুটি পুঁতে রাখে। পরে ব্যবহৃত কাপড় আগুনে পুড়িয়ে আলামত নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়।
আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রবিবার সকালে সিআইডি জয়াগ গ্রামের আবু আমিনের বাড়ির পুকুরের পানি সেচে ভেকুর সাহায্যে মাটি খুঁড়ে ভিকটিম কমলা বেগম ও শিশু মো. নোমানের দেহাবশেষ উদ্ধার করে। এই ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত তিন অভিযুক্ত আদালতে ১৬৪ ধারায় নিজেদের দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।