
X
অভিনেত্রী ঝর্ণা বসাক শবনম
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গত জানুয়ারিতে ২০২৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিলো তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। তবে ঘোষিত তালিকায় আজীবন সম্মাননা ও সেরা চিত্রনাট্যসহ কয়েকটি বিভাগে বিচারকদের সুপারিশ প্রতিফলিত হয়নি- এমন অভিযোগ ওঠার পরই উদ্যোগ নেওয়া হয় পুনর্বিবেচনার। অবশেষে মঙ্গলবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের সংশোধনী তালিকা প্রকাশ করে মন্ত্রণালয়।
সংশোধিত প্রজ্ঞাপনে আজীবন সম্মাননা বিভাগে পরিবর্তন আনা হয়েছে। জানুয়ারির প্রজ্ঞাপনে আজীবন সম্মাননার জন্য চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ এবং চিত্রগ্রাহক ও পরিচালক আবদুল লতিফ বাচ্চুর নাম ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের নীতিমালায় আজীবন সম্মাননার জন্য জীবিত ব্যক্তিদের বিবেচনার কথা উল্লেখ থাকায় তাদের নাম নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। নতুন প্রজ্ঞাপনেও তাদের নাম রয়েছে। তবে নতুন প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, চলচ্চিত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তারেক মাসুদ ও আবদুল লতিফ বাচ্চুকে মরণোত্তর পুরস্কার দেওয়া হবে।
তাদের সঙ্গে নতুন করে আজীবন সম্মাননা পাচ্ছেন অভিনেত্রী ঝর্ণা বসাক শবনম এবং চলচ্চিত্র সম্পাদক ফজলে হক।
এ ছাড়া পরিবর্তন এসেছে চিত্রনাট্য বিভাগে। প্রথম প্রজ্ঞাপনে ‘রক্তজবা’ সিনেমার জন্য নিয়ামুল মুক্তাকে সেরা চিত্রনাট্যকার ঘোষণা করা হয়েছিল। পরে মুক্তা জানান, তিনি সিনেমাটি পরিচালনা করলেও চিত্রনাট্য রচনা করেননি। পর্যালোচনা শেষে সংশোধিত প্রজ্ঞাপনে এই বিভাগে তাসনীমুল হাসানের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। বাকি সব বিভাগ রয়েছে আগের মতোই। সেরা সিনেমার পুরস্কার জিতেছে ‘সাঁতাও’। একই সিনেমার জন্য সেরা পরিচালক হয়েছেন খন্দকার সুমন।
‘সুড়ঙ্গ’ সিনেমার জন্য সেরা অভিনেতা নির্বাচিত হয়েছেন আফরান নিশো। সাঁতাও সিনেমার জন্য সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পাচ্ছেন আইনুন নাহার পুতুল। ‘অ্যাডভেঞ্চার অব সুন্দরবন’ সিনেমার জন্য খল চরিত্রে সেরা হয়েছেন আশীষ খন্দকার। শিশুতোষ সিনেমা ‘আম কাঁঠালের ছুটি’র দুই অভিনেতা মো. লিয়ন ও আরিফ হাসান জিতেছে সেরা শিশুশিল্পীর পুরস্কার। আর সুড়ঙ্গ সিনেমার জন্য কৌতুক অভিনেতা হিসেবে পুরস্কার পাচ্ছেন শহীদুজ্জামান সেলিম। সেরা পার্শ্ব অভিনেতা হয়েছেন মনির আহাম্মেদ শাকিল (সুড়ঙ্গ), সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী নাজিয়া হক অর্ষা (ওরা সাত জন), সেরা সংগীত পরিচালক ইমন চৌধুরী, সেরা গায়ক বালাম, গায়িকা অবন্তী দেব সিথি, গীতিকার সোমেস্বর অলি, সুরকার প্রিন্স মাহমুদ। মোট ২৮টি বিভাগে ৩২ জনকে দেওয়া হচ্ছে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।
শবনম বাংলা চলচ্চিত্রের অনন্য অধ্যায় : শবনম বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রের সোনালী যুগের নায়িকা হিসেবে সমানভাবে পরিচিত এক অভিনয়শিল্পী। ষাট ও সত্তরের দশকে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের সিনেমায় অন্যতম জনপ্রিয় মুখ হয়ে ওঠেন। রোমান্টিক ও সামাজিক ধারার চলচ্চিত্রে তার অভিনয় দর্শকের হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলে। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি অসংখ্য সফল চলচ্চিত্রে কাজ করে নিজস্ব অভিনয়ভঙ্গি ও পর্দা-উপস্থিতির মাধ্যমে আলাদা অবস্থান তৈরি করেন।
তার উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে- ‘চকোরী’, ‘চাঁদ অউর চাঁদনী’, ‘দূর দেশ’, ‘দিল দিয়া দর্দ লিয়া’ এবং ‘আঞ্জুমান’। এসব চলচ্চিত্র তাকে উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্রের সোনালী যুগে ব্যাপক জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দেয়। চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের মতে, দুই ভাষার চলচ্চিত্রে তার সমান গ্রহণযোগ্যতা, শক্তিশালী পর্দা উপস্থিতি এবং দীর্ঘ কর্মজীবন তাকে আজীবন সম্মাননার জন্য স্বাভাবিকভাবেই উপযুক্ত করে তোলে।
বাংলাদেশি চলচ্চিত্র দিয়ে অভিষেক ঘটলেও স্বাধীনতা-উত্তর সময়টাতে উর্দু চলচ্চিত্রে পাকিস্তানের হয়ে তিনি অর্জন করেছিলেন আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা। শুধু তাই নয়, পাকিস্তানের সিনেমায় সম্ভাব্য সব পুরস্কার ও স্বীকৃতিও তিনি অর্জন করেছেন। তিনি পাকিস্তানের চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার ‘নিগার অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন ১২ বার, যে রেকর্ড আজও তার দখলে। তিনবার পাকিস্তানের জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। পাকিস্তানের চলচ্চিত্র শিল্পে অসামান্য অবদান রাখায় ২০১৯ সালের লাক্স স্টাইল অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে তাকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়। স্বাধীনতার পর তিনি নিয়মিত হন বাংলাদেশের সিনেমায়।
এখানেও বাজিমাত করেছেন। ১৯৬১ সালে বাংলা চলচ্চিত্র ‘হারানো দিন’র মাধ্যমে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন শবনম। ১৯৬২ সালে উর্দু চলচ্চিত্র ‘চান্দা’ ছবির মাধ্যমে তৎকালীন সমগ্র পাকিস্তানে রাতারাতি তারকাখ্যাতি পান। এ দুটি ছবিই তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) ঢাকা থেকে মুক্তি পেয়েছিল। পরবর্তী বছরে ‘তালাশ’ সমগ্র পাকিস্তানে মুক্তি পেলে ওই সময়ের সর্বাপেক্ষা ব্যবসাসফল ছবির মর্যাদা লাভ করে। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে শবনম পাকিস্তানের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিসেবে চিহ্নিত হন। পেশাজীবী মনোভাবের কারণে তিনি ১৯৬৮ সালে পাকিস্তানের করাচিতে স্থায়ীভাবে বাস করতে থাকেন।
সত্তর দশকের শুরুর দিকে শবনম ললিউডে (লাহোর) পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়িকা হিসেবে নিজের স্থান পাকাপোক্ত করেন। তিনি নায়িকা হিসেবে পাকিস্তানের চলচ্চিত্র শিল্পে ধস নামার আগে আশির দশকের শেষ পর্যন্ত প্রবল প্রতাপে একচ্ছত্র প্রাধান্য বিস্তার করেছিলেন। ইতিহাস বলে ষাট দশক থেকে আশির দশক পর্যন্ত তিন দশক ধারাবাহিক ও সফলভাবে রোমান্টিক চরিত্রে অভিনয় করে অগণিত দর্শক-শ্রোতার মন জয় করেছিলেন। এত দীর্ঘ সময় নায়িকা হয়ে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করার রেকর্ড আর কোনো অভিনেত্রীর নেই।
শবনম-ওয়াহিদ মুরাদ, শবনম-নাদিম জুটি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে পাকিস্তানে। আর ঢাকায় তিনি জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন রহমান ও নায়করাজ রাজ্জাকের বিপরীতে। শবনম ছিলেন তার সময়কার নারীদের কাছে স্টাইল আইকন। তিনি লাক্স সুন্দরী হিসেবে পাকিস্তানে লাক্সের শুভেচ্ছা দূতের দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘদিন।
শবনম ‘আয়না’ ছবিতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন এবং ছবিটি পাকিস্তানের সিনেমা হলগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চলার রেকর্ড করে। ১৯৮৮ সালে শবনম তার চরিত্র পরিবর্তন করেন এবং পুনরায় ঢাকা ও লাহোরের চলচ্চিত্রাঙ্গনে অভিনয় করতে থাকেন।
দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৯৯ সালে কাজী হায়াত-মান্না জুটির ‘আম্মাজান’ ছবি দিয়ে নতুনভাবে প্রত্যাবর্তন হয় তার। ঢাকাই সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় ও কালজয়ী সিনেমা এই ‘আম্মাজান’। কিন্তু পরবর্তীতে আর কোনো সিনেমায় দেখা যায়নি শবনমকে।