
X
সংগৃহীত ছবি
ফুটবল বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চ খুব কমই আছে। বিশ্বজুড়ে বহু মানুষ একরকম মুখিয়ে থাকেন চার বছর পর পর এ আসর দেখার জন্য। ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ খ্যাত এ আয়োজনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুধু ক্রীড়া বিশ্বের নয়, বিশ্বসংস্কৃতিরও অন্যতম বড় মঞ্চ।
এখানে কোটি দর্শকের সামনে নিজেদের শিল্প-সত্তার প্রকাশ ঘটান বিশ্বখ্যাত শিল্পীরা। সেই মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে এবার ইতিহাস গড়েছেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত সংগীতশিল্পী ও ডিজে সঞ্জয় দেব। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পারফর্ম করে তিনি বিশ্বদরবারে নতুন করে আলোচনায় এনেছেন বাংলাদেশের নাম।
১৯৯১ সালে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে জন্ম সঞ্জয়ের। শৈশবের একটি বড় সময় কেটেছে চট্টগ্রামে। পরে পরিবারের সঙ্গে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। বর্তমানে থাকছেন যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে। ফলে ভিন্ন দুই সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা পেয়েছেন। সঞ্জয়ে শিল্পীজীবনে এ অভিজ্ঞতা এনে দিয়েছে এক অনন্য মাত্রা। বাংলাদেশের শিকড় এবং পাশ্চাত্যের আধুনিক সংগীতধারার মিশেলে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজস্ব সংগীতভুবন।
সঞ্জয়ের সংগীতপ্রেমের শুরু পরিবার থেকে। কৈশোরে এসে আকৃষ্ট হন ইলেকট্রনিক ড্যান্স মিউজিক বা ইডিএমের প্রতি। নিজের ঘরে বসেই শুরু করেন সুর নির্মাণ, রিমিক্স এবং নতুন ধরনের সংগীত নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। ধীরে ধীরে তার কাজ শ্রোতাদের নজর কাড়তে শুরু করে। দক্ষিণ এশীয় সুর, লোকজ সংগীতের আবহ এবং আধুনিক ইলেকট্রনিক বিটকে একসঙ্গে মিশিয়ে তিনি তৈরি করেন এক স্বতন্ত্র সংগীতধারা। এ মৌলিকতাই তাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের সঙ্গে কাজের সুযোগ পান।
সঞ্জয়ের ‘শাংগ্রি-লা’ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন মিউজিক চার্টে স্থান পেয়েছিল। ২০১৭ সালে প্রকাশ করেছিলেন একটি অ্যালবাম। আমেরিকান আইডলের শিল্পী এলিয়ট ইয়ামিন ছিলেন তার সঙ্গে। দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় ব্যান্ড গটসেভেন-এর মার্ক টুয়ানের সঙ্গে প্রকাশ করেছেন ‘ওয়ান ইন এ মিলিয়ন’। ভারতীয় শিল্পী গুরু রন্ধাভার সঙ্গেও একটি অ্যালবাম করেছেন তিনি।
পরিবর্তন ও ফিউশন সঞ্জয়ের বৈশিষ্ট্য। বিশ্বসংগীতের দ্রুত পরিবর্তনশীল ধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনি নিজেকে ক্রমাগত নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন। ইলেকট্রনিক সংগীতের পাশাপাশি পপ, বিশ্বসংগীত এবং দক্ষিণ এশীয় সুরের মেলবন্ধন তার কাজকে দিয়েছে বিশেষ পরিচিতি। অবশেষে যুক্ত হয়েছেন বিশ্বকাপ ফুটবলের অ্যালবামে।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ঘিরে প্রকাশিত অফিসিয়াল সংগীত প্রকল্পে সঞ্জয়ের অংশগ্রহণ তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় অর্জন। ‘ঝওওজ ঝওওজ’ শিরোনামের গানে তিনি আন্তর্জাতিক শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করলেন। এখানেই শেষ না। বিশ্বকাপের মঞ্চে বাংলাদেশকে উপস্থাপনও করেছেন তিনি। পোশাকের মাধ্যমে বাংলাদেশকে তুলে ধরেছেন। তার জামার স্লিভে ছিল রয়েল বেঙ্গল টাইগার, শাপলা ফুল এবং লাল সবুজে ছিল বাংলাদেশের পতাকার উপস্থাপন।
মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে দেওয়া সেই এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সানজয় বলেন, দআমি যেখান থেকে এসেছি, সেখানে সাধারণত এরকম মুহূর্ত খুব একটা পাওয়া যায় না। তাই এটি শুধু আমার নিজের জন্য কোনো মুহূর্ত নয়, এটি আসলে আমার পুরো দেশের জন্য একটি বড় মুহূর্ত। আর হ্যাঁ, আমি আমার দেশের মানুষ ও আমার বাবা-মায়ের জন্য অত্যন্ত গর্বিত।
এবং হ্যাঁ, আমার সত্যিই ভীষণ ভালো লাগছে।’ এই আনন্দের মাঝে বাংলাদেশের জন্য আরও একটি গর্বের বিষয় হলো, বিশ্ব মাতানো এই গানটির কো-প্রডিউসার এবং লিরিকেও জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নাম। সানজয়ের সাথে এই গানের সহ-প্রযোজনা এবং লিরিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বাংলাদেশের আরেক কৃতি সন্তান রাসেল আলি। আন্তর্জাতিক এই প্রজেক্টে তাদের দুজনের এই মেলবন্ধন বাংলা সংস্কৃতির বৈশ্বিক যাত্রায় এক নতুন পালক যুক্ত করল।
এবারের ফিফা ওয়ার্ল্ডকাপের অফিশিয়াল গানগুলো যখন বিশ্বজুড়ে তেমন একটা আলোড়ন তুলতে পারছিল না, ঠিক তখনই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এক মহাকাব্যিক ঝড় তোলে সানজয়-নোরার এই গানটি। রিলিজ হওয়ার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইউটিউবে ২০ মিলিয়নেরও (২ কোটি) বেশি ভিউ পার করে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় রেকর্ড গড়ে এটি। এর মাধ্যমে তারা বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় পপ কুইন শাকিরার প্রথম দিনের ভিউয়ের রেকর্ড সম্পূর্ণ ভেঙে দেন।
এবারের আসরে শাকিরার অফিশিয়াল গান ‘দাই দাই’ প্রথম ২৪ ঘণ্টায় যেখানে ৮.২ মিলিয়ন ভিউ পেয়েছিল, সেখানে সানজয়-নোরার গানটি তার দ্বিগুণেরও বেশি ভিউ পেয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে দ্রুততম সময়ে দেখা ফিফা অ্যান্থেম-এর মর্যাদা লাভ করে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, গানটির অফিশিয়াল মিউজিক ভিডিওর ভিউ ইতিমধ্যেই ইউটিউবে ৪১ মিলিয়নের ঘর ছুঁয়ে অবিরাম ছুটে চলেছে।
প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সংগীতশিল্পী ও প্রযোজক হিসেবে ফিফার অফিশিয়াল ট্র্যাকে সরাসরি নাম লেখানো এবং উদ্বোধনী মঞ্চে দাঁড়িয়ে পুরো বিশ্বকে নাচানোর এই মহাকাব্যিক রেকর্ড দক্ষিণ এশীয় সংগীতের ইতিহাসে চিরকাল একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে থাকবে।