ছবি: প্রতিনিধি
টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার ধলাপাড়া ইউনিয়নের আশারিয়া চালা ডা. শওকত আলী ভূঁইয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর হাতে মারধরের শিকার হয়েছেন নাজমুন নাহার (৩০) নামে এক নারী শিক্ষক। নবম শ্রেণির ওই ছাত্রের নাম মেহেদী হাসান। পরে সালিশ বৈঠকে ক্ষমা চেয়ে ঘটনাটি আড়াল করার চেষ্টা করেন এলাকার মাতব্বররা বলে অভিযোগ উঠেছে। সোমবার ঘটনাটি ঘটে ঘাটাইল উপজেলার ডা. শওকত আলী ভূঁইয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে। এ ঘটনায় বুধবার যে সালিশ বৈঠক হয়, সেই বিচারে সন্তুষ্ট নন ভুক্তভোগী শিক্ষক ও এলাকাবাসী। ন্যায়বিচার না পাওয়ায় বিদ্যালয়ে আর ফিরবেন না বলেও জানান ওই শিক্ষক।
শিক্ষিকা নাজমুন নাহার জানান, তিনি শেরপুর জেলার নকলা উপজেলার বাসিন্দা। এনটিআরসিএর মাধ্যমে ইংরেজি বিষয়ে নিয়োগ পেয়ে প্রায় ছয় মাস আগে উপজেলার ডা. শওকত আলী ভূঁইয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। গত সোমবার দুপুরে শ্রেণিকক্ষে নবম শ্রেণির ছাত্র মেহেদী হাসানের সঙ্গে কোনো একটি বিষয় নিয়ে তার কথাকাটাকাটি হয়। নাজমুন নাহার জানান, একপর্যায়ে তিনি মেহেদীকে একটি থাপ্পড় দেন। এরপর মেহেদী ক্ষিপ্ত হয়ে শিক্ষিকা নাজমুন নাহারকে কয়েকটি থাপ্পড় ও ঘুষি মারে। এ ঘটনার সময় শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি তিনজন শিক্ষকও উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত শিক্ষক আনিছুর রহমান বলেন, “ঘটনার সাক্ষী আমি। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর ওই ছাত্রকে আমি শাসন করেছি।”
এদিকে ঘটনাটি জানাজানি হলে অভিযুক্ত ছাত্র এবং তার বাবা, ওই বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী (দপ্তরি) সবুর মিয়ার বিচার দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, মেহেদীর বাবা বিদ্যালয়ের দপ্তরি হওয়ায় তার প্রভাবে এর আগেও নানা অপকর্মের জন্ম দিয়েছে মেহেদী। স্থানীয়রা আরও জানান, কিছুদিন আগে মেহেদী বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের বিরক্ত করত। এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বিচার করতে গেলে মেহেদীর দপ্তরি বাবা উল্টো প্রধান শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে ওই শিক্ষককে শাসান।
এদিকে নারী শিক্ষককে মারধরের ঘটনার দুই দিন পর বুধবার সকাল ১১টার দিকে স্থানীয় ও উপজেলা শিক্ষক সমিতির নেতাদের সমন্বয়ে একটি সালিশ বৈঠকের আয়োজন করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সালিশে সিদ্ধান্ত হয়, অভিযুক্ত ছাত্রকে বিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হবে। তার বাবা সবুর মিয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধান শিক্ষক ও বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ। ভুক্তভোগী শিক্ষিকার পা ধরে ক্ষমা চাইবে অভিযুক্ত ছাত্র। সালিশ বৈঠকের রায় ঘোষণার পর বিচারে সন্তুষ্ট না হয়ে স্থানীয়রা বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা জুতা নিয়ে মাতব্বরদের সামনে চলে যায়। বর্তমানে এলাকায় চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যেকোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
সামাজিকভাবে যে বিচার করা হয়েছে, তা নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষক খালিদ হাসান খোকন লিখেছেন, “শিক্ষকরা যেন আমাদের সমাজের সবচেয়ে অসহায় জীব! শিক্ষককে অনায়াসে মারধর করা যায়, গালিগালাজ করা যায়, হেনস্তা করা যায়। নতুন যারা শিক্ষকতায় আসবেন, তারা দয়া করে এসব মেনে নেওয়ার মানসিকতা নিয়েই আসবেন।” কলেজ শিক্ষক বাহাদুর কবির তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন, “শিক্ষিকা কতটুকু ন্যায়বিচার পেলেন? এই বিচারের মাধ্যমে শিক্ষকের মর্যাদা কখনোই কি পুনরুদ্ধার হওয়া সম্ভব?”
ভুক্তভোগী শিক্ষক নাজমুন নাহার বলেন, “ওই ঘটনার পর আমি একপর্যায়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম। যে বিচার করা হয়েছে, সেখানে সুষ্ঠু বিচার আমি পাইনি। আমারও আত্মসম্মান আছে। এত কিছুর পর সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি আর চাকরি করব না। ওই বিদ্যালয়ে আর যাব না। আমি আমার নিজ জেলা শেরপুরে চলে যাব।” তিনি আরও বলেন, ঘটনার পর তার দুই সহকর্মী পারভীন আক্তার ও রোকেয়া আক্তার বাসায় গিয়ে অভিযুক্ত ছাত্রের পক্ষ নিয়ে তাকে হুমকি দিয়েছেন এবং বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন।
নাজমুন নাহার আরও বলেন, “যেখানে শিক্ষকরা শিক্ষককে এবং ছাত্ররা শিক্ষককে সম্মান দিতে জানে না, সেই বিদ্যালয়ে আর ফিরে যাব না। এই পেশায় আর ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে না। সরকার যদি নিজ জেলায় আমাকে বদলির ব্যবস্থা করে, তবে বিষয়টি ভেবে দেখব।”
শিক্ষক রোকেয়া আক্তার বলেন, “ঘটনার সময় আমি উপস্থিত ছিলাম। এ ঘটনা দেখে আমি খুবই মর্মাহত। তবে বিষয়টি মীমাংসা হয়ে গেছে, এ নিয়ে আমি আর কথা বলতে চাই না।” তবে তার এবং অপর শিক্ষক পারভীন আক্তারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
মেহেদীর বাবা ও বিদ্যালয়ের দপ্তরি সবুর মিয়ার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি কথা বলতে রাজি হননি।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোশারফ হোসেন বলেন, “ঘটনাটি অবশ্যই অনাকাঙ্ক্ষিত। বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি এবং মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে বিষয়টি অবগত করেছি। স্থানীয়ভাবে বসে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে। সালিশ বৈঠকে সবুর মিয়ার বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তবে বৈঠকে যে বিচার করা হয়েছে, তাতে তিনি সন্তুষ্ট বলে জানান।
সালিশ বৈঠকের প্রধান ছিলেন ধলাপাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান এজাহারুল ইসলাম মিঠু ভূঁইয়া। তিনি স্বীকার করেন, স্থানীয়রা এ বিচারে সন্তুষ্ট নন। তিনি বলেন, “সামাজিকভাবে এর চেয়ে বেশি কিছু করার ক্ষমতা আমাদের নেই। ভুক্তভোগী ওই শিক্ষিকাও এ বিচারে সন্তুষ্ট নন।”
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “ঘটনার তিন দিন পর হলেও আমি বিষয়টি জানতে পেরেছি। বুধবার বিকেলে বিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়েছিলাম।”
ডা. শওকত আলী ভূঁইয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে নিয়মিত কোনো পরিচালনা কমিটি নেই। সভাপতির দায়িত্বে আছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান। তিনি বলেন, “ঘটনার বিষয়ে বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক বা প্রধান শিক্ষক আমাকে অবগত করেননি। তবে লোকমুখে বিষয়টি শুনেছি।”