
X
মহাসড়ক যেন মৃত্যুফাঁদ
সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক যেন দিন দিন আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে। প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে ছোট-বড় সড়ক দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন মানুষ। আবার অনেকে গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করে বিছানায় কাতরাচ্ছেন। বিশেষ করে সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মহাসড়কে দুর্ঘটনার সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
সর্বশেষ গত ৭ আগস্ট সকাল সাড়ে ৭টার দিকে উপজেলার কাশিকাপন এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ইউনিক পরিবহন ও বেঙ্গল পরিবহনের দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই সাতজন নিহত হন। পরে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুজনের মৃত্যু হয়। এতে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় নয়জনে। নিহতরা সবাই ইউনিক পরিবহনের যাত্রী। এ ঘটনায় দুই বাসের অন্তত ২৪ জন যাত্রী আহত হন।
নারী ও শিশুসহ নয়জন নিহত হওয়ার ঘটনায় দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। কমিটিকে দুর্ঘটনার পেছনের কারণ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
এর আগে গত ১৭ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ৬টার দিকে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ওসমানীনগর উপজেলার দয়ামীর কোনাপাড়া এলাকায় যাত্রীবাহী দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুজন নিহত হন। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হন অন্তত পাঁচজন।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ওসমানীনগরের তালেরতল এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন।
এ ছাড়া গত ৩১ মে সকালে উপজেলার তাজপুর কদমতলা এলাকায় মহাসড়কে দাঁড়িয়ে থাকা একটি যাত্রীবাহী বাসকে দ্রুতগতির একটি স্লিপার কোচ ধাক্কা দিলে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই দুজন নিহত এবং অন্তত ১৫ জন আহত হন।
সচেতন মহলের মতে, মহাসড়কে দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ বেপরোয়া গতি ও অনিয়ন্ত্রিত যান চলাচল। বিশেষ করে ভোর ও সকালের দিকে মহাসড়ক তুলনামূলক ফাঁকা থাকায় অনেক চালক অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালান। ফলে বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহনের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থার সৃষ্টি হলে দ্রুতগতির কারণে চালকের পক্ষে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ ছাড়া মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিংয়ের প্রবণতাও রয়েছে। একটি গাড়িকে পেছনে ফেলে আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় অনেক সময় চালকরা নির্ধারিত লেন অতিক্রম করে বিপরীত লেনে চলে যান। এতে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
দূরপাল্লার বাসের চালকদের ক্লান্তি ও দীর্ঘ সময় একটানা গাড়ি চালানোর বিষয়টিও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভোর বা সকালের দিকে চালকের ঘুমঘুম ভাব কিংবা মনোযোগের ঘাটতি থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ওসমানীনগর অংশে দুর্ঘটনার আরেকটি বড় কারণ হিসেবে মহাসড়ক দখল করে ব্যবসা পরিচালনা, ব্যবসার ময়লা-আবর্জনা ও নির্মাণসামগ্রী সড়কে ফেলে রাখা এবং বিভিন্ন বাজার এলাকায় অবৈধভাবে ইজিবাইক (টমটম), সিএনজি অটোরিকশাসহ অন্যান্য যানবাহনের স্ট্যান্ড গড়ে ওঠাকে দায়ী করছেন সচেতন মহল।
মহাসড়কের বিভিন্ন বাজারে অনেকটা ‘ব্যাঙের ছাতার মতো’ গড়ে উঠেছে ইজিবাইক ও অটোরিকশার স্ট্যান্ড। এসব যানবাহন যাত্রী ওঠানামার সময় মহাসড়কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকায় স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হয়। পাশাপাশি মহাসড়কের পাশে নির্মাণসামগ্রী রেখে ব্যবসা পরিচালনার কারণেও সড়ক সংকুচিত হয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝে মধ্যে হাইওয়ে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং অবৈধভাবে মহাসড়কে চলাচলকারী ইজিবাইকের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হলেও তা স্থায়ী কোনো সমাধান আনতে পারছে না। সকালে অভিযান চালানোর পর বিকেলেই আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায় দখল ও অবৈধ স্ট্যান্ড।
সচেতন মহলের দাবি, শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না; দুর্ঘটনা রোধে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা প্রশাসন, হাইওয়ে পুলিশ, থানা পুলিশ, জনপ্রতিনিধি এবং বাজার পরিচালনা কমিটিকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
তাদের মতে, মহাসড়কের অবৈধ দখল উচ্ছেদ, ইজিবাইক-অটোরিকশার অবৈধ স্ট্যান্ড অপসারণ, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত ব্যবস্থা, চালকদের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
এদিকে অটোরিকশা ও সিএনজি চালকদের একটি অংশের অভিযোগ, টোকেনের মাধ্যমে তারা নিয়মিত গাড়ি চালাতে পারেন। তবে মাস শেষে তাদের টাকা গুনতে হয়। অর্থের বিনিময়ে কিছু যানবাহনকে মহাসড়কে চলাচলের সুযোগ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে ইজিবাইক (টমটম) চালকদের ক্ষেত্রেও। চালকদের দাবি, টাকা না দিলে তাদের মামলা দেওয়া হয়। আর টাকা দিলে তারা মহাসড়কেও গাড়ি চালাতে পারেন।
স্থানীয়দের দাবি, এ ধরনের অভিযোগেরও সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। মহাসড়কে এসব যানবাহন চলাচল নিষেধ হলে তা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া উচিত। তাদের ভাষ্য, টাকা নিয়ে গাড়ি চালানোর সুযোগ দেওয়া হলে তা পুরোপুরি বেআইনি। মহাসড়কে অবৈধ যানবাহন চলাচল ও অবৈধ স্ট্যান্ড বন্ধে প্রশাসনকে কঠোর ও নিয়মিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
অভিযোগের বিষয়ে ওসমানীনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) গোলাম মোস্তফা বলেন, “যে অভিযোগ করেছে তাকে প্রমাণ করতে বলেন। আপনি যাচাই করেন, দেখেন এরকম টোকেন পুলিশ নেয় কিনা। শুধু অভিযোগ শুনলেই তো হবে না। টোকেন তো আর গোপনে নিচ্ছে না। টোকেন নিলে তো প্রকাশ্যেই নেয়। যদি পান এরকম, তাহলে আমাকে জানাবেন। তাকে শাস্তির আওতায় আনা হবে।”
তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব ও ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনমুন নাহার আশা বলেন, তদন্ত চলমান রয়েছে।