রাণীনগরে সার নিয়ে নৈরাজ্য, মিলছে না সরকারি দামে

নওগাঁ (রাণীনগর) প্রতিনিধি

সারাবাংলা

সরকার কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমাতে ভর্তুকি দিয়ে সার সরবরাহ করছে। তারপরও নওগাঁর রাণীনগরে সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার পাওয়া

2026-08-14T15:44:13+00:00
2026-08-14T15:44:13+00:00
শুক্রবার ১৪ আগস্ট ২০২৬ ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার ১৪ আগস্ট ২০২৬
   
রাণীনগরে সার নিয়ে নৈরাজ্য, মিলছে না সরকারি দামে
নওগাঁ (রাণীনগর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ৩:৪৪ পিএম   (ভিজিট : ০)
ছবি : প্রতিনিধি
X

ছবি : প্রতিনিধি

সরকার কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমাতে ভর্তুকি দিয়ে সার সরবরাহ করছে। তারপরও  নওগাঁর রাণীনগরে সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে কৃষকদের জন্য ভর্তুকি দেওয়া সার।

উপজেলায় বরাদ্দ থাকার পরও বাজারে অতিরিক্ত বস্তা প্রতি ৩৫০ থেকে সাড়ে ৪০০টাকা পর্যন্ত বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে কৃষকদের। যার কারণে দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় চলতি আমন মৌসুমে চাষাবাদ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। 

কৃষকদের অভিযোগ, সার উত্তোলন থেকে বাজারজাত ব্যবস্থায় কৃষি বিভাগের যথাযথ নজরদারি না থাকায় একটি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে দাম উঠানামা করছে। ডিলারের দোকানে সার থাকলেও সরকারি নির্ধারিত মূল্যে কৃষক সার পাচ্ছে না। কৃষক মনে করছেন, কৃত্রিম সংকট এবং মূল্যবৃদ্ধির পেছনে যথাযথ মনিটরিংয়ের অভাবই বড় কারণ। 

এদিকে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হলেও তা স্থায়ীভাবে বন্ধ হচ্ছে না। উল্টো জরিমানা করার চব্বিশ ঘন্টা পার না হতেই বেশি দামে বিক্রি করছেন। 

অপরদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন সারের সংকট নেই। আর ডিলার বলছেন বাহির থেকে সার কেনার কারণে একটু বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। অন্যদিকে খেসারত দিতে হচ্ছে কৃষকদের। 

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি আমন মৌসুমে রাণীনগর উপজেলায় ১৯ হাজার ৭০ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।  আর জমিতে চাষাবাদ ও চারা রোপনের শুরুতেই প্রয়োজনীয় সারের ঊর্ধমুখী বাজার নিয়ে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির পাবার আশঙ্খায় বোরো চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলার সম্ভবনা রয়েছে। 

জানা যায়, রাণীনগর উপজেলায় বিসিআইসির ১১জন এবং বিএডিসির ১৯জন ডিলার রয়েছেন। এবং চলতি আগস্ট মাসের জন্য বিএডিসির মাধ্যমে উপজেলায় প্রায় ৬০০মেট্রিক টন সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এমনকি বিসিআইসির ১১জন ডিলার বিশেষ বরাদ্দও পেয়েছে। তারপরও সারের দাম বেশি কেন?

গত বুধবার (১২আগষ্ট) উপজেলার আবাদপুকুর বাজারের মুন্না ট্রেডার্স থেকে সার কেনার পর এক কৃষক বলেন, সার কিনা লিচি ৫বস্তা, মেমো করে দিচে ৫হাজার ৭৫০ট্যাকার। আর ট্যাকা লিলো ৬হাজার ৪০০। বেশি নিলে হামি এখন কি করমু। অভিযান করার পরও তিনি বেশি দাম নিলো। 

অতিরিক্ত টাকা দিয়ে সার কেনার পর এভাবেই ক্ষোভ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কৃষক।

তার মতো ক্ষোভ ও অভিমান নিয়ে উপজেলার করজগ্রাম এলাকার ওয়ারিসুল ইসলাম নামের এক কৃষক বলেন, সারের এগুলো দরের জন্য আমি আবার এক বিঘার বেশি জমি চাষ করিনা। শুধু খাওয়ার জন্য এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করি। কারো বাড়িত ধান চাইতে যামুনা, যাবার মতো অভ্যেস আমার নেই, তাই এক বিঘাত কোনো মতে জীবন বাঁচাচ্ছি। 

শুধু কৃষক ওয়ারিসুল ইসলাম নয়, তাদের মতো করজগ্রাম এলাকার শহিদুল ইসলাম, আব্দুর রহিমসহ উপস্থিত আরও কয়েক কৃষক বলেন, আমরা খেটেখুটে আবাদ করে চালগুলো পাঠাচ্ছি, আপনারা খাচ্ছেন। আমাদের কোনো নাম নেই। কৃষকের কথা কেউ তুলে ধরেনা। গতবার বিঘাপ্রতি ৪হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। জানিনা এবার কি হবে? প্রশ্ন ও ক্ষোভের সহিত বললেন তারা। 

তাদের অভিযোগ টিএসপি ১৬৮০টাকা, ঝুরা পটাশ ১১২০টাকা এবং ডিএপি ১৪০০থেকে ১৫০০টাকা। এছাড়া খুচরা কিনলে আরও বেশি। টিএসপি এক ধারার দাম ১৪০টাকা। তাতে এক বস্তার দাম হয় ১৮০০টাকা। খাঁনপুকুর বাজারের সবুজ, হেলাল ও সামসুর মল্লিকে দোকান থেকে আমরা সার কিনে থাকি।। 

খাঁনপুকুর বাজারের মেসার্স সোনার বাংলা ট্রেডার্সের স্বত্ত্বাধিকারী সবুজ হোসেন বলেন, চায়না ডিএপি কিনতে হয় ১৪৪০টাকায়, আর দেশী ডিএপি ১৩৮০টাকা। এছাড়া পটাশ ১১৩০, রাশিয়ার ঝুরা পটাশ ৯৬০টাকায় কিনতে হয়। ইউরিয়া কিনতে হয় ১৩৫০ থেকে ১৩৬০টাকায়। এবং তিউনেশিয়ার টিএসপি ১৯০০ ও মরক্কোর টিএসপি ১৭২০টাকায় কিনতে হয়। আবাদপুকুর বাজারের ফটিক ও মান্নান এবং রাতোয়ালের রাকিব ও রাণীনগরের রেজাউলের কাছ থেকে এসব কিনে থাকি। তিনি বলেন, আমি একজন সাব ডিলার। তেমন লাভ না হলেও কীটনাশক বিক্রি করার জন্য এসব সার রাখতে হয় দোকানে। এছাড়া যাদের কোনো বিক্রির লাইসেন্স নেই তারা আরও বেশি দামে সার বিক্রি করছে।

কীটনাশক বিক্রি করতে হয়, তাই কৃষকের জন্য এসব সার রাখতে হয় বলে একইভাবে জানালেন আবাদপুকুর বগারবাড়ি এলাকার এক সাব ডিলার। তিনিও বলেন, আবাদুপুকুর থেকে বস্তা প্রতি গাড়ি ভাড়া পড়ে ২০টাকা। ১০টাকা লাভে বিক্রি করে দিই। অনেক সময় কেনা দামে বিক্রি করতে হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কাশিমপুর ইউনিয়নের এক খুচরা সার ব্যবসায়ী জানালেন, ডিলারদের কাছ থেকে আমাদের ১২৫০ থেকে ১৩০০ টাকায় দেশী ডিএপি কিনতে হচ্ছে। আর চায়না ডিএপি ১৪০০ থেকে সাড়ে ১৪৫০টাকা। পটাশ কিনতে হচ্ছে ১১০০টাকায়, টিএসপি ১৬০০টাকায় এবং ইউরিয়া সার কিনতে হচ্ছে ১৩৫০টাকায়। 

একই ইউনিয়নের এক সাব ডিলার বলেন, আমার জানামতে সরকারি ১০৫০টাকা দামে বিক্রি করার পরও ডিলারদের ১০০টাকা লাভ থাকার কথা। তারপরও তারাই বেশি দামে সার বিক্রি করছে। আমাদের বেশি দামে কিনতে বাধ্য হতে হচ্ছে।  

জানতে চাইলে সারের সংকট নাই বলে জানান আবাদপুকুর বাজারের ফটিক ট্রেডার্সের স্বত্ত্বাধিকারী শহিদুল ইসলাম ফটিক। বেশি দামে বিক্রির কারণ জানতে চাইলে তিনি মুঠোফোনে বলেন, বাহির থেকে সার কেনার কারণে একটু বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। ডিএপি ও টিএসপি সারের দামই বেশি। ডিএপি ১৪০০টাকায় বিক্রি করছি। তবে অন্য সারের দাম কম। বরং সরকারি রেটের চেয়ে ১০টাকা কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

জানতে চাইলে রাণীনগর উপজেলা বিএডিসি সার ডিলার সভাপতি রেজাউল ইসলাম বলেন, বেশি দামে সার বিক্রির সুযোগ নেই। আমি সবাইকে সরকারি মূল্যে বিক্রি করতে বলেছি। যদি কোনো সার ডিলার বেশি দামে বিক্রির কথা বলে থাকে, তাহলে সে মিথ্যে কথা বলেছে। আর আমি বেশি দামে কোনো সার বিক্রি করছি না। এছাড়া উপজেলা প্রশাসন কেন অভিযান দিচ্ছে সেটা আমার জানা নেই।

জানতে চাইলে রাণীনগর উপজেলা বিসিআইসি সার ডিলারের সভাপতি আব্দুস ছাত্তার শাহ্ কোনো মন্তব্য করতে চান না। তিনি সরাসরি দেখা করে কথা বলতে চান। 

জানতে চাইলে উপজেলা বিএনপি যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক নয়ন খান লুলু বলেন, বিএনপি সরকার কৃষি ও কৃষক বান্ধব সরকার। কৃষক যাতে নায্য মূল্যে সার পায়। আর যদি এর কোনো বাত্যয় ঘটে, তাহলে তার কোনো ছাড় নেই। 

জানতে চাইলে রাণীনগর উপজেলা অতিরিক্ত কৃষি অফিসার জাহিদ কামাল বলেন, উপজেলায় সারের কোনো সংকট নেই। কেউ বেশি দামে সার বিক্রি করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে একাধিক ব্যবসায়ীর জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে।

আর বারবার জানার জন্য ফোন দিলেও ফোন রিসিভ করেননি উপজেলা কৃষি অফিসার মোস্তাকিমা খাতুন।

জানতে চাইলে নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ মনজুর রহমান বলেন, রাণীনগরে সারের কোনো ক্রাইসিস নেই। ওখানে সার ব্যবহার করার লোকই নেই। আমাদের যথেষ্ট পরিমাণ বরাদ্দ দেওয়া আছে, কোনো অসুবিধা নেই। সরাসরি বিসিআইসি ও বিএডিসি ডিলারের কাছ থেকে মেমো নিয়ে সার কেনার পরামর্শ দিলেন। আর কোনো ডিলার দাম বেশি নিলে আমাদের কাছে অভিযোগ দিতে বলেন, তারপর দেখেন আমরা কি করি। আর দাম বেশি নেওয়ার কথা জানালে তিনি বলেন, কৃষকদের সচেতন হতে হবে। বেশি দাম নিলে আমাদের জানাতে হবে।

উল্লেখ্য, ইউরিয়া সারের সরকারি মূল্য ১৩৫০টাকা, টি এস পি ১৩৫০, ডি এ পি ১০৫০ এবং এম ও পি সারের মূল্য ১০০০টাকা।





Loading...
Loading...


সারাবাংলা এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy