
X
ইংরেজি নতুন বছর বরণের প্রস্তুতিতে যখন ব্যস্ত বন্দরনগরী চট্টগ্রামের একাংশ, ঠিক সেই সময় গভীর রাতে মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। শীতার্ত অসহায় মানুষের মাঝে কম্বল বিতরণের উদ্দেশ্যে ডিসি হিলের সরকারি বাসভবন থেকে বের হয়ে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সরাসরি উপস্থিত থেকে তিনি শীতবস্ত্র বিতরণ করেন।
এ সময় নগরীর ষোলশহর রেলওয়ে স্টেশনে শীতের কনকনে রাতে কাঁপতে থাকা দুই পথশিশু ঝুমুর ও শাহীনকে দেখে থমকে দাঁড়ান জেলা প্রশাসক। একজন আদর্শ পিতার মতো দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন তাদের সঙ্গে এবং নিজ হাতে তাদের গায়ে কম্বল জড়িয়ে দেন। শিশু দুটির কাছে রাতে কী খেয়েছে জানতে চাইলে তারা জানায়, টাকার অভাবে সেদিন কিছুই খেতে পারেনি। বিষয়টি শুনে জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিকভাবে তাদের রাতের খাবারের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।
শুধু পথশিশুই নয়, নগরীর মহসীন কলেজ এলাকায় ফুটপাতে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত শারীরিক প্রতিবন্ধী আব্দুল মজিদ ও তার সাত বছর বয়সী কন্যা ইয়াসমিনের দিকেও নজর দেন জেলা প্রশাসক। কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে আসা এই বাবা-মেয়ের আশ্রয় বলতে ছিল ফুটপাতে পাতা একটি পুরোনো কম্বল। ইয়াসমিনের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে জেলা প্রশাসক তাদের বিস্তারিত তথ্য নোট করেন এবং স্থায়ী পুনর্বাসনের লক্ষ্যে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে অনুরোধ জানান।
পরদিন বৃহস্পতিবার টেলিফোনে কথা হলে আব্দুল মজিদ জানান, শারীরিক প্রতিবন্ধিতার কারণে তিনি স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারেন না। মহসীন কলেজের সামনে বসে ভিক্ষা করে যে অর্থ পান, তা দিয়েই মেয়েকে নিয়ে দিনযাপন করেন। প্রতিদিন ৫০ টাকায় আলুভর্তা, ডাল ও ভাত কিনে খেতে হয়। মেয়ের মাছ বা মাংস খাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও তা সব সময় পূরণ করা সম্ভব হয় না।
দীর্ঘদিন ধরে রাস্তায় জীবনযাপন করা এই বাবা-মেয়ের ভবিষ্যৎ পুনর্বাসনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছেন জেলা প্রশাসক। তিনি আব্দুল মজিদকে নিজের ফোন নম্বর দিয়ে আগামী বুধবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আসতে বলেন।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, আমার নিজেরও একটি মেয়ে আছে। শীতার্ত ইয়াসমিনকে দেখে আমার নিজের সন্তানের নিষ্পাপ মুখটি চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। শুধু জেলা প্রশাসক হিসেবে নয়, একজন পিতা হিসেবেও মনে হয়েছে এই শিশুটির জন্য কিছু করা উচিত।
পথশিশু ঝুমুর ও শাহীন সারারাত না খেয়ে থাকার বিষয়টি তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপনে শহরের অনেক মানুষ লাখ লাখ টাকা খরচ করবেন, অথচ এই শহরেই কিছু শিশু একবেলা খাবার পায় না—এটা একজন মানুষ হিসেবে আমাকে কষ্ট দেয়।
শীতের এই দুঃসময়ে মানবিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মোট ৬০০টি কম্বল বিতরণ করেন। এরমধ্যে রয়েছে দামপাড়া গরীবউল্লাহ মাজার এলাকা, ষোলশহর রেলস্টেশন, মুরাদপুর, চকবাজার ও চেরাগী পাহাড় মোড়, লালদিঘী এলাকা এবং জেল রোডের আমানত শাহ মাজার এলাকা।
জেলা প্রশাসক বলেন, সমাজের সবচেয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো জেলা প্রশাসনের নৈতিক দায়িত্ব। এই ধরনের মানবিক কার্যক্রম নিয়মিতভাবে অব্যাহত থাকবে।