
X
সংগৃহীত ছবি
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর অনেক শিল্পীর মাঝে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। অনেকে এখনো আত্মগোপনে রয়েছেন। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করার কারণে এমন পরিবেশ-পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মত সংশ্লিষ্টদের। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জয়ী অভিনেত্রী ববিতা মনে করেন, শিল্পীদের জন্য নিরপেক্ষ অবস্থানই সম্মানজনক ও দীর্ঘস্থায়ী।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ অভিনেত্রী বলেন, ‘দর্শকের ভালোবাসা একজন শিল্পীর শক্তি। দলীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে সেই সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা হারানো উচিত নয়। আমি বিশ্বাস করি, সময়ের সঙ্গে শিল্পীর মর্যাদা বাড়ে। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী। তাই শিল্পীদের জন্য নিরপেক্ষ অবস্থানই সম্মানজনক ও দীর্ঘস্থায়ী। নতুন সরকারের কাছে আমার প্রত্যাশা, শিল্পীদের রাজনৈতিক বলয়ে টেনে আনবেন না। আর শিল্পীরাও যেন ব্যক্তিগত সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা রক্ষায় রাজনীতি থেকে দূরে থাকেন।’
মফস্বল শহরে প্রেক্ষাগৃহভিত্তিক সংস্কৃতির জাগরণের প্রত্যাশা করেছেন ববিতা। নতুন সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘চলচ্চিত্রশিল্পের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হোক, এটাও প্রত্যাশা করি। অনেক জেলা আজও প্রেক্ষাগৃহশূন্য। সারা দেশে আধুনিক ও মানসম্মত সিনেমা হল নির্মাণ বা পুনরুদ্ধারে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। মফস্বল শহরগুলোতে আবারো প্রেক্ষাগৃহভিত্তিক সংস্কৃতির জাগরণ ঘটুক, এ নিয়ে সরকারের কার্যকর ভূমিকা দেখতে চাই।’
সরকারি অনুদানের চলচ্চিত্র বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার জোর দাবি ববিতার। তার ভাষায়, ‘সরকারি অনুদানের চলচ্চিত্র বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক বিবেচনা নয়, যোগ্য নির্মাতা ও গল্পকে অগ্রাধিকার দিয়ে অনুদান দেওয়া উচিত। তাহলে প্রকৃত মেধাবীরা কাজের সুযোগ পাবেন, দেশের চলচ্চিত্রশিল্প আরো সমৃদ্ধ হবে। একই সঙ্গে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারেও স্বচ্ছতা অনেক বেশি দরকার।’
খানিকটা ব্যাখ্যা করে ববিতা বলেন, ‘এ ধরনের আয়োজনে চলচ্চিত্র অঙ্গনের মানুষদের বিচার প্রতিফলিত হওয়া উচিত। বিচারকের দেওয়া নম্বর বদলে পিছিয়ে থাকা কিংবা পছন্দের কাউকে পুরস্কার দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ হোক। এতে যোগ্য ও প্রকৃত শিল্পী বঞ্চিত হয়। যোগ্য ও প্রকৃত শিল্পীকে পুরস্কার না দিলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের শিল্প-সংস্কৃতিও।’
শিল্প ও সংস্কৃতিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মর্যাদাপূর্ণ জায়গায় রাখার আহ্বান ববিতার। এ অভিনেত্রী বলেন, ‘শিল্প ও সংস্কৃতিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে এমন এক মর্যাদায় নেওয়া হোক, যেখানে শিল্পী দল-মত-ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করতে পারেন। শিল্পীর কণ্ঠস্বর যেন হয় সবার, কোনো দলের নয়; শিল্প যেন হয় ঐক্যের শক্তি, বিভেদের নয়—এই বার্তা সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যাশা করি।’
চলচ্চিত্রে আসার পেছনে ববিতার জন্য সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা তার বড় বোন সুচন্দ। কিংবদন্তি নির্মাতা জহির রায়হানের ‘সংসার’ সিনেমায় শিশুশিল্পী হিসেবে ১৯৬৮ সালে অভিষেক হয় ববিতার। এই চলচ্চিত্রে তিনি রাজ্জাক-সুচন্দার মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেন। ববিতার নাম ফরিদা আক্তার পপি থেকে ‘ববিতা’ হয় জহির রায়হানের ‘জ্বলতে সুরুজ কি নিচে’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে।
নায়িকা হিসেবে ববিতার প্রথম সিনেমা ‘শেষ পর্যন্ত’। এটি মুক্তি পায় ১৯৬৯ সালের ১৪ আগস্ট, যেদিন ববিতার মা মৃত্যুবরণ করেছিলেন। এরপর থেকে অভিনয়ে নায়িকা হিসেবে শাসন করেন ৭০ দশক। অর্জন করেন তুমুল জনপ্রিয়তা। বাণিজ্যিক সিনেমার অন্যতম সফল নায়িকা হিসেবে গণ্য করা হয় ববিতাকে। কেননা গ্রামীণ মেয়ের চরিত্রে কিংবা শহরের মডার্ণ তরুণী, সব চরিত্রেই তিনি সমান দক্ষতা দেখিয়েছেন।
জহির রায়হান পরিচালিত ‘টাকা আনা পাই’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ববিতার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরলেও তার জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র বলা হয় ‘অশনি সংকেত’কে। সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় এই সিনেমায় অভিনয় করে ববিতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দারুণ প্রশংসা অর্জন করেন।
ক্যারিয়ারে প্রায় ২৫০টির বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন ববিতা। এর মধ্যে ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’, ‘আলোর মিছিল’, ‘ডুমুরের ফুল’, ‘বসুন্ধরা’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘নয়নমনি’, ‘লাঠিয়াল’, ‘মা’, ‘কসাই’, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’, ‘দহন’, ‘দিপু নাম্বার টু’, ‘অশনি সংকেত’, ‘রামের সুমতি’, ‘নাগ-নাগিনী’, ‘প্রতিজ্ঞা’, ‘চ্যালেঞ্জ’, ‘মিস লংকা’, জীবন সংসার’, ‘লাইলি মজনু’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘পোকা মাকড়ের ঘর বসতি’ সিনেমাগুলো উল্লেখযোগ্য।
অভিনয়ের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ক্যারিয়ারে অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন ববিতা। একটানা ৩ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ছাড়াও বাংলা চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি থেকে সর্বভারতীয় শ্রেষ্ঠ নায়িকার পুরস্কার পান তিনি। এছাড়াও সরকারি ও বেসরকারি অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন ববিতা। তিনিই বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে সবচেয়ে বেশিবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনের চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিয়েছেন।