
X
আলুর দরপতন
নওগাঁ জেলায় আলুর বাজারে ব্যাপক ধস নেমেছে। মাঠ থেকে পাইকারি বাজার। সব জায়গাতেই দাম তলানিতে। গত বছর সরকার আলুর কেজিপ্রতি মূল্য ২২ টাকা নির্ধারণ করলেও তাতেও উৎপাদন খরচ ওঠেনি কৃষকদের।
আর চলতি মৌসুমে পরিস্থিতি আরও শোচনীয় আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫ থেকে ৭ টাকায়, যা উৎপাদন খরচের চেয়েও কম। যদিও ভোক্তা পর্যায়ে দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল, কৃষক পর্যায়ে মিলছে না ন্যায্য মূল্য।
কৃষকদের দাবি, এ বছর প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে ১২ থেকে ১৫ টাকা। বীজ, সার, সেচ ও কীটনাশকের দাম বৃদ্ধির কারণে খরচ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। কিন্তু বাজারে উৎপাদিত আলুর দাম মিলছে মাত্র ৫ থেকে ৭ টাকা। ফলে উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, আলু তোলা শ্রমিকের মজুরিও জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবহন ব্যয় ও হিমাগারের দ্বিগুণ ভাড়া, যা আলু সংরক্ষণ নিয়ে কৃষকদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে নওগাঁ জেলায় ২১ হাজার ৯৭০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৩৩০ টন। গত মৌসুমে ২৫ হাজার ৯৪০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করে উৎপাদন হয়েছিল ৫ লাখ ১৪ হাজার ৩৬০ টন। সে হিসেবে এ বছর ৩ হাজার ৯৭০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ কমেছে।
সদর উপজেলার বক্তারপুর এলাকার কৃষক লুৎফর রহমান বাংলাদেশ বুলেটিনকে জানান, গত মৌসুমেও আলু চাষ করে লোকসানের মুখে পড়েছিলেন। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় ঋণ ও ধার করে এবার দুই বিঘা জমিতে আলু চাষ করেন। কিন্তু বর্তমান বাজারদরে উৎপাদন খরচ তোলাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
বদলগাছী উপজেলার বালুভরা এলাকার কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, প্রতি বিঘায় আলু চাষে খরচ হয়েছে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। বর্তমানে পাইকারি বাজারে জাতভেদে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৫ থেকে ৭ টাকায়। অথচ আলু তোলার কাজে একজন শ্রমিককে দিতে হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। এক বিঘা জমিতে আলু তুলতে প্রয়োজন হয় ৮ থেকে ১০ জন শ্রমিক। এর সঙ্গে রয়েছে পরিবহন ব্যয়। এমন দামে আলু বিক্রি করে শ্রমিক ও পরিবহন খরচও উঠছে না।
কৃষক নাসির উদ্দিন জানান, পাঁচ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন তিনি। প্রতি কেজি উৎপাদন খরচ হয়েছে ১২ থেকে ১৫ টাকা। অথচ বাজারে নতুন আলু বিক্রি হচ্ছে ৫ থেকে ৭ টাকায়। হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, আলু চাষ করে মনে হচ্ছে বড় ভুল করেছি।
মান্দা উপজেলার মৈনম এলাকার কৃষক ইদ্রিস উদ্দিন বলেন, ১২ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন তিনি। আলু তোলার পর দাম না থাকায় বিক্রি ও সংরক্ষণ—দুই দিকেই সংকট তৈরি হয়েছে। হিমাগারের ভাড়া দ্বিগুণ হওয়ায় আলু সংরক্ষণ নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা।
রানীনগর উপজেলার মিরাট এলাকার কৃষক বাচ্চু মন্ডল জানান, তিন বিঘা জমিতে আলু আবাদ করেছেন তিনি। বাজারদর কম থাকায় খরচ ওঠার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তিনি বলেন, ২০-২২ বছর ধরে আলু চাষ করছি। এবছরের মতো এত কম দামে কখনো আলু বিক্রি করিনি। আগামী মৌসুমে অন্য ফসল আবাদ করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হুমায়রা মণ্ডল বাংলাদেশ বুলেটিনকে বলেন, গত মৌসুমে লোকসানের পর কৃষকদের কম জমিতে আলু চাষের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তারপরও অনেক কৃষক আলু আবাদ করেছেন। চলতি মৌসুমে উৎপাদন ভালো হওয়া এবং বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় দাম কমেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।