
X
সংগৃহীত ছবি
ঢাকাই চলচ্চিত্রের এক সময়ের তুমুল জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা পারভীন সুলতানা দিতি। নন্দিত এ অভিনেত্রীর আজ জন্মদিন। ১৯৬৫ সালের ৩১ মার্চ নারায়ণগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। শৈশবে গায়িকা হওয়ার ইচ্ছা ছিল তার। দিতি খুব ছোটবেলা থেকেই গানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
ছোটেবলাতেই তিনি শিশু একাডেমি আয়োজিত প্রতিযোগিতায় জাতীয়ভাবে পুরস্কৃত হন। যে কারণে নায়িকা হওয়ারও অনেক আগে গায়িকা হওয়ারই ইচ্ছে ছিল তার। বিটিভিতে এক দিন গান গাওয়ার পর চোখে পড়ল আল মনসুরের। তিনি দিতিকে খুঁজে বের করে মানস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিপরীতে ‘লাইলী মজনু’ নাটকে কাস্ট করেন। প্রচারের পর দর্শকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে এটি।
এরপর ১৯৮৪ সালে নতুন মুখের সন্ধানে কার্যক্রমের মাধ্যমে দিতি চলচ্চিত্রে নিজেকে পুরোপুরি জড়িয়ে নেন। প্রথম সিনেমা ছিল প্রয়াত পরিচালক উদয়ন চৌধুরী পরিচালিত ‘ডাক দিয়ে যাই’। এতে তার নায়ক ছিলেন আফজাল হোসেন। কিন্তু সিনেমাটির আশি শতাংশ কাজ হলেও শেষ পর্যন্ত এটি আর মুক্তি পায়নি। দিতি অভিনীত মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম সিনেমা ছিল প্রয়াত পরিচালক আজমল হুদা মিঠু পরিচালিত ‘আমিই ওস্তাদ’। প্রয়াত পরিচালক সুভাষ দত্ত পরচালিত ‘স্বামী-স্ত্রী’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য দিতি প্রথমবারের মতো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এছাড়াও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংগঠন কর্তৃক নানা পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন, পেয়েছেন সম্মাননা।
বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে রোমান্টিক সিনেমায় দিতির ভুবনভোলানো হাসি দর্শকরা এখনো ভোলেননি। ইলিয়াস কাঞ্চন, সোহেল চৌধুরীর সঙ্গে অনেকগুলো রোমান্টিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি। টেলিভিশন থেকে সিনেমায় যাওয়া আফজাল হোসেনের সঙ্গেও। তিনি অভিনয় করেছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অভিনেতা প্রসেনজিতের সঙ্গে।
তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে- স্বামী-স্ত্রী, ভাই বন্ধু, হীরামতি, দুই জীবন,উসিলা, সহধর্মিনী, স্বর্গ-নরক, পর্বত, অমর সঙ্গী, নিয়তীর খেলা, বীর বিক্রম, সুদ আসল, সাজানো বাগান, বীরঙ্গনা সখিনা, আপন ঘর, সৎমানুষ, লেডি ইন্সপেক্টর, খুনের বদলা, জ্বলন্ত বারুদ, আজকের হাঙ্গামা, স্ত্রীর পাওনা, শ্বশুর বাড়ি, চাকর, সুখের ঘরে দুখের আগুন, স্বার্থপর, আত্মবিশ্বাস, স্বাধীন, তিন টেক্কা, বেপরোয়া, লক্ষ্মীর সংসার, ভয়ংকর সাতদিন, হিংসার আগুন, পাপী শত্রু, আজকের সন্ত্রাসী, দূর্জয়, স্নেহের প্রতিদান, শেষ উপহার, রচরম আঘাত, রিক্সাওয়ালা, মুন্না মাস্তান, অপরাধী, কালিয়া, মহান বন্ধু, গ্যাং লিডার, আমার দেশ আমার প্রেম, নারী আন্দোলন, মাটির দূর্গ, অচেনা মানুষ, অতিক্রম, দোষী, হাতিয়ার, মানুষ, মুক্তি চাই, আসামী গ্রেফতার, ভাই, আম্মা, বাদশা ভাই, দিলরুবা, বাহরাম বাদশা, সতীনের সংসার, লুটতরাজ, রূপনগরের রাজকন্যা, অচল পয়সা, বাঁচার লড়াই, আজকের সন্ত্রাসী, মেয়ের অধিকার, পলাতক আসামী, হারামখোর, শেষ প্রতিক্ষা, রাজা বাবু, পদ্মা আমার জীবন, চিরদিনের সাথী, লেডি কমান্ডো, বিদ্রোহী আসামী, বদলা নেব, অবলম্বন, নয়া তুফান, মহাযুদ্ধ, মাস্তান রাজা, রাজা গুন্ডা, হত্যা, বেঈমানী, আত্ম প্রকাশ, অপরাজিত নায়ক, ভাই কেন আসামী, অকৃতজ্ঞ, চক্রান্তের শিকার, প্রিয় শত্রু, দুই পৃথিবী, কঠিন প্রতিশোধ, মেঘের কোলে রোদ, দয়া মায়া, আপন ঘর, অংক, ক্ষমা নেই, হুমকি, বেনাম বাদশা, হৃদয় ভাঙা ঢেউ, ধূমকেতু, জিজ্ঞাসা, শাস্তির বদলে শাস্তি, মান মর্যাদা, পরমা সুন্দরী, কাল সকালে, বিন্দুর ছেলে, চার সতীনের ঘর, নয় নম্বর বিপদ সংকেত, আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসা, মেঘের কোলে রোদ, প্রিয়তমেষু, মাটির ঠিকানা, হৃদয় ভাঙ্গা ঢেউ, দ্যা স্পীড, তবুও ভালোবাসি, পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী, কঠিন প্রতিশোধ, জোনাকির আলো, মুক্তি, অন্তরঙ্গ, দুই পৃথিবী, রাজাবাবু, আইসক্রিম, সুইটহার্ট, মধূমকেতু, যে গল্পে ভালবাসা নেই, মাটির ঠিকানা ইত্যাদি ।
টিভি নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি কিছু নাটক পরিচালনাও করেছিলেন দিতি। এ ছাড়া টিভি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছেন। গান গাইতেন তিনি । অনুপমের ব্যানারে দিতির গানের প্রথম একক অ্যালবাম ‘তোমার ও চোখে’ বাজারে আসে। এরপর মাঝে দু-একটি চলচ্চিত্রে প্লে-ব্যাক করলেও আর কোনো অ্যালবাম করা হয়ে ওঠেনি। তারপর ২০১১ সালে লেজার ভিশনের ব্যানারে বাজারে আসে দিতির দ্বিতীয় একক অ্যালবাম ‘ফিরে যেন আসি’। এই অ্যালবামটিও বেশ সফলতা পায়। দিতি মডেলিংও করেছেন। বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী দিতি মডেলিংয়েও ছিলেন বেশ জনপ্রিয় ।
২০১৬ সালের ২০ মার্চ ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান এই অভিনেত্রী। সদা হাস্যোজ্জ্বল এ নায়িকার অসময়ে চলে যাওয়াটা কেউই স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেননি।
ব্যক্তিজীবনে চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরীকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন দিতি। ১৯৮৬ সালে শুরু করা সংসার স্থায়ী হয়নি। সোহেল-দিতির দাম্পত্য জীবন ছিল সংকটময়। যার প্রভাব পড়ে দিতির ক্যারিয়ারে। ১৯৯৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর বনানীর ট্রাম্পস ক্লাবে সোহেল চৌধুরী খুন হন। সোহেল চৌধুরীর মৃত্যুর পর ২০০১ সালে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনকে বিয়ে করে সংসার শুরু করেন দিতি। খুব অল্প সময়ে এই বিয়ে ভেঙে যায়। দিতি-সোহেল দম্পতির দুই সন্তান, মেয়ে লামিয়া চৌধুরী ও ছেলে দীপ্ত চৌধুরী।