একাধিক প্রজন্মের শৈশবের জাদুকর মুস্তাফা মনোয়ার

বিনোদন প্রতিবেদক

বিনোদন

সেই সাদাকালো পর্দার যুগের পারুল-বাউলদের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই? এ প্রজন্মের অনেকেই হয়তো আজও ভোলেননি তাদের কথা। নব্বই

2026-06-29T17:16:20+00:00
2026-06-29T17:16:20+00:00
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬ ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬
   
একাধিক প্রজন্মের শৈশবের জাদুকর মুস্তাফা মনোয়ার
বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশ: সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬, ৫:১৬ পিএম   (ভিজিট : ৬৪)
মুস্তাফা মনোয়ার
X

মুস্তাফা মনোয়ার

সেই সাদাকালো পর্দার যুগের পারুল-বাউলদের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই? এ প্রজন্মের অনেকেই হয়তো আজও ভোলেননি তাদের কথা। নব্বই দশকের শেষের দিকে বাংলাদেশ টেলিভিশন-বিটিভির শিশুতোষ অনুষ্ঠান ‘মনের কথা’-তে দেখা যেত তাদের মজার সব কাণ্ডকারখানা। জানেন কি, শৈশবের আনন্দ বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া এই বিশেষ আয়োজনের রূপকার কে ছিলেন? তিনি প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার।  

সোমবার সকালে এই গুণী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের প্রয়াণের খবর যখন প্রকাশ পেল, শোক নেমে এল সর্বত্র; গোটা দেশ, গোটা একটি প্রজন্ম তাকে স্মরণ করছে। কারণ, এখন যারা বড় হয়েছেন, তাদের শৈশবকে রঙিন করেছিলেন এই শিল্পী। মুস্তাফা মনোয়ার যে শুধু চিত্রশিল্পী ছিলেন তা-ই নয়, ছিলেন পাপেটশিল্পের পথিকৃৎ। আধুনিক টেলিভিশনের মাধ্যমে পাপেটশিল্পকে তুলে ধরেন, পুতুলের মুখ থেকে কথা শুনিয়ে শিশুদের মনে কৌতূহল তৈরি করে নিজের আলাদা একটি স্থান তৈরি করেছিলেন।

সেই তুমুল জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের নাম ছিল ‘মনের কথা’, যা এ প্রজন্মের অনেকেই আজও ভোলেননি। যেখানে পারুল আর বাউলের মজার মজার গল্প, আর একটু পরপর একটি গরুর ‘হাম্বা’ ডাক শিশুদের আনন্দে ভাসাত। বাউল হাতে একতারা নিয়ে গান গাইত, আর পারুল এসে গল্প জুড়ত। 

পারুল-বাউলের এই যুগলবন্দি একটি প্রজন্মকে এতটাই কাছে টেনে নিয়েছিল যে, তার প্রয়াণের খবরের পরপরই সামাজিক মাধ্যমে ‘মনের কথা’ অনুষ্ঠানের পুরোনো ভিডিওর মন্তব্যঘরে এসে এই গুণী ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করছেন নেটিজেনরা। শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করে অনেকেই তার আত্মার শান্তি কামনা করে আবেগঘন বার্তা দিচ্ছেন।

যদি একটু ইতিহাস ঘাঁটা হয়, তাহলে চলে আসে এই গুণী ব্যক্তির পাপেট শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কাহিনি। চারুকলায় পড়াশোনা করলেও মুস্তাফা মনোয়ার পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন টেলিভিশনকে। চিত্রকলা, নির্দেশনা বা শিশুদের নানা অনুষ্ঠানের বাইরে পাপেট ছিল তার আগ্রহের মূল কেন্দ্রবিন্দু। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি পাপেট নিয়ে কাজ করেছেন এবং তৈরি করেছেন অসংখ্য অনুসারী ও গুণগ্রাহী। 

কলকাতা আর্ট কলেজ থেকে পাস করার পর ঢাকা আর্ট কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে তিনি প্রথম পাপেট নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। মূলত গ্রামবাংলার পুতুলনাচ ছোটবেলাতেই তাকে আকৃষ্ট করেছিল। বাংলাদেশে পাপেট তৈরি ও কাহিনি সংবলিত পাপেট প্রদর্শনের মূল উদ্যোক্তা তিনিই।

নিজের পাপেট দল এবং বাংলাদেশের ফোক পাপেট দল ধনমিয়াকে নিয়ে তিনি মস্কো ও তাশখন্দ সফর করেছিলেন, যা সেখানে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছিল। মুস্তাফা মনোয়ার তার শিল্পকর্মে বাংলাদেশের স্বকীয় বৈশিষ্ট্যকে গেঁথে দিতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তার পাপেটের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘পারুল’ নামটি নেওয়া হয়েছিল আবহমান বাংলার ‘সাত ভাই চম্পা’ লোককথা থেকে। 

আনন্দময় শিক্ষা কর্মসূচিতে পাপেটকে প্রয়োগ করতেই তিনি এই চরিত্রটি বেছে নিয়েছিলেন।
এর আগে ১৯৬০-৬১ সালের দিকে কলিম শরাফী তার একটি ডকুমেন্টারিতে সর্বপ্রথম মুস্তাফা মনোয়ারের পাপেটকে অন্তর্ভুক্ত করেন। পরবর্তীতে টেলিভিশনে ‘আজব দেশে’ অনুষ্ঠানে তিনি ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’ চরিত্র রচনা করে পাপেট প্রদর্শনী করেন। ১৯৬৭-৬৮ সালে এসব পাপেট নাটকের মাধ্যমেই তৎকালীন রাজনৈতিক পরিবেশ এবং বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী পাকিস্তানি মনোভাবকে ব্যঙ্গ করা হতো।

অ্যানিমেশনের কাজে উৎসাহ ছিল মুস্তাফা মনোয়ারের। বাংলাদেশে পাপেট শো ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে বলা চলে তার একক অবদান! হুগলি, বাঁকুড়া, কলকাতায় পাপেট দেখে এ ব্যাপারে আগ্রহ জন্মে। তার অনবদ্য সৃষ্টি পাপেট চরিত্র ‘পারুল’। পারুলকে দেখেই ইউনিসেফের র‌্যাচেল কার্নেগি উৎসাহিত হন, তৈরি হয় ‘মীনা’ চরিত্রটি।

টেলিভিশনে করেছেন রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ ও শেক্সপিয়ারের ‘টেমিং অব দ্য শ্রু’ অবলম্বনে মুনীর চৌধুরীর অনুবাদ করা ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’-এর মতো নাটক। যুক্তরাজ্যের গ্রানাডা টিভির ‘ওয়ার্ল্ড হিস্টি অব টিভি ড্রামা’র জন্য এই নাটক দুটি মনোনীত হয়েছিল। বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘নতুন কুঁড়ি’র মতো অনুষ্ঠানেরও রূপকার তিনি।

এই গুণী শিল্পীর পারিবারিক ঐতিহ্যও ছিল বেশ সমৃদ্ধ; তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফা এবং জমিলা খাতুন দম্পতির সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। শৈশব থেকেই পারিবারিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠা মুস্তাফা মনোয়ার ঢাকা চারুকলা ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতার মাধ্যমে পেশাজীবন শুরু করলেও দেশের গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্ব দিয়েছেন। 

মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে দেশের শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনে গভীর শোক নেমে এসেছে। সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও অনুরাগীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করে তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছেন।






Loading...
Loading...


বিনোদন এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy