
X
সংগৃহীত ছবি
সিনেমার পর্দায় রোমাঞ্চের নানা রূপ আমরা দেখি। তবে প্রকৃতির রুদ্ররূপের চেয়ে বড় রোমাঞ্চ বোধহয় আর কিছুই হতে পারে না। মেঘের গর্জন, অবিরাম বর্ষণ, কিংবা সাগরের দানবীয় ঢেউয়ের সামনে মানুষের টিকে থাকার লড়াই বরাবরই সেলুলয়েডে দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। দেশি-বিদেশি এমন আটটি ঝড়-বৃষ্টি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের পটভূমিতে নির্মিত সিনেমা নিয়ে আজকের প্রতিবেদন।
সীমানা পেরিয়ে : ১৯৭০ সালে বাংলাদেশে ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ১৯৭৭ সালে মুক্তি পায় পরিচালক আলমগীর কবিরের সিনেমা ‘সীমানা পেরিয়ে’। বুলবুল আহমেদ ও জয়শ্রী কবিরের অনবদ্য অভিনয়ে ইতিহাস হয়ে আছে এই সিনেমাটি। সিনেমায় দেখা যায় ভয়াবহ ঝড়ের কবলে পড়ে একটি জাহাজ, ঝড় থেমে যাওয়ার পর সেই জাহাজের দুই যাত্রী, এক তরুণ ও এক তরুণী ভাসতে ভাসতে একটি অজানা দ্বীপে এসে পৌঁছায়। একসময় তারা বুঝতে পারে এই দ্বীপে তারা দুজন ছাড়া আর কোন মানুষের বসবাস নেই। তারপর শুরু হয় দুজনের বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
সারেং বৌ : শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সারের কালজয়ী উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৭৮ সালে নির্মিত হয় চলচ্চিত্র ‘সারেং বৌ। যেই সিনেমায় উঠে আসে জলোচ্ছ্বাসে বিপর্যস্ত উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের কষ্টের এক ব্যতিক্রমী গল্প। সিনেমায় দেখা যায় হঠাৎ একদিন তীব্র বাতাসে, উপকূলীয় অঞ্চলের সব মানুষ ধরেই নিল-এ যেন জলোচ্ছ্বাসের পূর্বাভাস। শুরু হলো উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম। জলোচ্ছ্বাসের পর সবকিছু যেন থমথমে, চারিদিকে শুধু লাশ আর লাশ। মানুষ, পশুপাখি কেউই রক্ষা পায়নি ঝড়ের কবল থেকে। বেঁচে থাকা কদম পানি পানি করে কাতরাচ্ছে। খাওয়ার মতো একফোটা পানি কোথাও নেই। তারপর আসে ‘সারেং বৌ’ ছবির সেই কালজয়ী দৃশ্য। চরে মিঠাপানি না পেয়ে নিজের স্তনদুগ্ধ দিয়ে স্বামী সারেং কদমের প্রাণ বাঁচায় স্ত্রী।
দুখাই : প্রাকৃতিক দুর্যোগের আরেক সিনেমা পরিচালক মোরশেদুল ইসলামের ‘দুখাই’। ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের আঘাতে দুখাই তার পরিবারের সবাইকে হারিয়ে ফেলে। কিন্তু এরপরও তার জীবন থেমে থাকে না। সে আবারও নতুন জীবন শুরু করে। একটি ফুটফুটে মেয়ের জন্ম হয়। দুখাই তার মেয়ের নাম রাখে সুখাই। দুখাই যেমন আজীবন দুঃখ পেয়ে গেছে, সুখাই যেন আজীবন সুখ পায়, এইটুকুই চাওয়া তার। কিন্তু দুখাইয়ের দুঃখগাঁথা যেন শেষ হয় না। আবারও ঝড় এসে সবকিছু লন্ডভন্ড করে দেয়, কেড়ে নেয় তার সুখাইকে। মূলত এই সিনেমায় পরিচালক মোরশেদুল ইসলাম তুলে ধরছেন জীবনের সংগ্রাম কখনো শেষ হবার নয়।
এই সিনেমাটি ১৯৯৭ সালে মুক্তি পায়। ১৯৭০ সালের ১২ই নভেম্বর শতাব্দির প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বাংলাদশের উপকূলীয় এলাকায় দশ লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারায়। এই মর্মান্তিক কাহিনী নিয়ে মোরশেদুল ইসলাম নির্মাণ করেন চলচ্চিত্রটি। এতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন-সংগ্রাম দেখানো হয়েছে। অভিনয় করেছেন রাইসুল ইসলাম আসাদ, রোকেয়া প্রাচী প্রমুখ।
কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া : চলচ্চিত্রের গল্পটা দেশের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলের। নির্মাতা মুহাম্মদ কাইয়ুমের ভাষায়, এ হলো ‘ভাটির দেশে মাটির গল্প’। তবে একটু গভীরে ভাবলে দেখা যাবে, সারা দেশের কৃষকের চিরন্তন সংগ্রামই যেন এখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। সিনেমার মূল পুরুষ চরিত্র সুলতানের উত্তর থেকে দক্ষিণে যাত্রার মধ্য দিয়ে মূলত এই গভীর জীবনবোধই আমাদের সামনে উঠে আসে।
বিশ্বজুড়ে চলমান অতি উষ্ণায়ন আর অতিবৃষ্টির এই সংকটের সময়ে প্রান্তিক কিছু মানুষের প্রধান শত্রু হয়ে দাঁড়ায় প্রাকৃতিক দূর্যোগ। সেই দুর্যোগ এবং তার মোকাবিলাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে এই অনন্য চলচ্চিত্রের কাহিনী।
সাঁতাও : ২০২৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন খন্দকার সুমন। পরিচালনার পাশাপাশি এর গল্প, চিত্রনাট্য ও সংলাপও লিখেছেন তিনি নিজেই। ‘সাঁতাও’ মূলত একটি ঐতিহ্যবাহী রংপুরী শব্দ। দেশের উত্তরাঞ্চলে একটানা সাতদিন ধরে লাগাতার বৃষ্টি হওয়ার বিশেষ সময়টাকে বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। সাঁতাওয়ের সেই দিনগুলো কৃষিনির্ভর সমাজে কেমন প্রভাব ফেলে, কৃষকদের সংগ্রামী জীবন এবং প্রান্তিক পটভূমি থেকে উঠে আসা নারীদের সর্বজনীন লড়াইয়ের গল্প ঘিরেই এটি নির্মিত হয়েছে। সম্পূর্ণ গণঅর্থায়নে নির্মিত এই ছবির পুরো গল্পটি আবর্তিত হয়েছে রংপুর অঞ্চলকে ঘিরে।
কেদারনাথ : ২০১৩ সালে ভারতের উত্তরাখণ্ডের কেদারনাথ মন্দিরের উপত্যকায় ঘটে যাওয়া বাস্তব এক ট্র্যাজেডির পটভূমিতে নির্মিত বলিউডের এই চলচ্চিত্র। ছবির মূল চরিত্র মনসুর খান পেশায় একজন স্থানীয় মুসলিম পোর্টার বা মালবাহক। অন্যদিকে মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের ছোট মেয়ে মন্দাকিনী ওরফে মুকু একজন হিন্দু তরুণী। ধর্মের দেয়াল ও পারিবারিক অমত পেরিয়ে মনসুর ও মুকুর মধ্যে এক গভীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মুকুর বিয়ে ঠিক হওয়া এবং মনসুরের ওপর হামলার ঘটনার মধ্যেই হঠাৎ শুরু হয় ভয়াবহ অতিবর্ষণ আর হড়পা বান। চোখের পলকে ভেসে যায় পুরো উপত্যকা। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাঝেই মনসুর নিজের জীবনের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে মুকু ও অন্যদের বাঁচিয়ে নেয়। তাদের সেই আত্মত্যাগের প্রেম ও দুর্যোগের করুণ দৃশ্য দর্শকদের স্তব্ধ করে দেয়।
২০১৮ : ভারতের কেরালা রাজ্যে ঘটে যাওয়া ২০১৮ সালের ভয়াবহ বন্যার বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে মালায়ালাম ভাষার এই ব্লকবাস্টার চলচ্চিত্রটি। গল্পে দেখা যায়, সেনা কর্মকর্তা আনুপ, চালক সেতুপাথি, টিভি রিপোর্টার নূরা এবং স্থানীয় মৎস্যজীবী মাথচানের পরিবারসহ বিভিন্ন চরিত্রের সাধারণ মানুষের জীবন কীভাবে আকস্মিক বন্যায় ওলটপালট হয়ে যায়। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই যখন এক চরম মানবিক সংকটে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষই একে অপরের দেবদূত হয়ে দাঁড়ায়। অন্তঃসত্ত্বা নারীকে উদ্ধার থেকে শুরু করে অন্ধ দোকানদারকে বাঁচানোর মতো বীরত্বপূর্ণ সব উদ্ধারকাজ করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারায় আনুপ। কেরালাবাসীর ঘুরে দাঁড়ানোর এই গল্পটি এক অভূতপূর্ব রোমাঞ্চের জন্ম দেয়।
দ্য পারফেক্ট স্টর্ম : বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত হলিউডের এই সিনেমাটি দর্শকদের প্রকৃতির এক ভয়ংকর ও নিষ্ঠুর রূপের মুখোমুখি দাঁড় করায়। ‘আন্দ্রে গেইল’ নামের একটি বাণিজ্যিক মাছ ধরার নৌকা আটলান্টিক মহাসাগরে যায়। তবে ফেরার পথে তারা মুখোমুখি হয় ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সামুদ্রিক ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের। ছবিটির শেষ অর্ধেকের পুরোটা জুড়েই রয়েছে সাগরের বিশাল আকৃতির ঢেউ, অবিরাম বৃষ্টি আর তীব্র বাতাসের তাণ্ডব। প্রকৃতির রুদ্ররূপের বিরুদ্ধে মানুষের টিকে থাকার এক চরম ও বাস্তবসম্মত লড়াই এখানে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা দর্শককে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রোমাঞ্চিত করে রাখে।