
X
ছবি : প্রতিনিধি
দারিদ্রতা, প্রতিদিনের অভাব-অনটন কোনো কিছুই দমাতে পারেনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সদর উপজেলার মজলিশপুর ইউপির বুধল গ্রামের অদম্য সাইবা আক্তার মিলিকে। জীবনের সব প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে মেধার বিকাশ ছড়িয়ে সদ্য প্রকাশিত ২০২৭ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছে সে।
তার এই অভূতপূর্ব সাফল্যে এখন আনন্দিত শিক্ষক, পরিবার ও গ্রামবাসী। সাইবা আক্তার মিলি সদর উপজেলার বাকাইল হাই স্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। সাইবা আক্তার মিলি জেলার সদর উপজেলার মজলিসপুর ইউপির বাকাইল গ্রামের আবুশ কাশেমের মেয়ে।
মিলিরা তিন বোন। বড় বোন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি মহিলা কলেজে অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী, ছোট বোন সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী। মা গৃহীনি। সাইবা আক্তার মিলির এই অসাধারণ সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে এক কঠিন জীবন সংগ্রামের গল্প।
মিলির পিতা আবুশ কাশেম মানসিক প্রতিবন্ধি। মারও পায়ে সমস্যা। মেয়ের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে এগিয়ে আসেন মা ও মামা। মা সংসারের কাজের পাশাপাশি হাঁস-মুরগি লালন-পালন শুরু করেন তিনি। সেই হাঁস-মুরগি বিক্রির জমানো সামান্য টাকায় চলে সংসার। মিলির পড়াশোনার খরচ চালাতে মামা প্রায় সময় সাহায্য সহযোগিতা করেন।
সাইবা আক্তার মিলি বলেন, যতটুকু পড়তাম বুঝে পড়তাম। সেই পড়ে থেকে নোট করতাম। মুখস্ত করে পড়তাম না, যা পড়তাম বুঝে পড়তাম। দৈনিক ৪/৫ ঘন্টা পড়তাম। বেশি সময় গাধার মত না পড়ে বুঝে অল্প সময় পড়লেই হয়। রেদোয়ান মেথডে অনলাইনে ক্লাস দেখে পড়তাম।
তিনি জানান, রানা স্যার আমার পড়ার ব্যাপারে অনেক সাহায্য করেছে। স্যারের কাছে সাধারণ গণিত, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়স ও উচ্চতর গণিত প্রাইভেট পড়তাম। স্যার আমার কাছ থেকে কখনো টাকা নিত না। বড় বোন পড়ার জন্য শাসন করতো। বাবা ও মা পড়তে উৎসাহ দিত।
তিনি আরো বলেন, আমার বাবা এক সময় প্রচুর কবিতা লিখত। সারারাত জেগে কবিতা লিখতো এবং দিনে মোবাইল দেখত। অষ্টম শ্রেণীতে আমি একবার পরীক্ষায় খারাপ করায় বাবা তখন খুব কান্না করেছিল। এটা আমার মনে দাগ কাটে।
তিনি আরো জানান, সকল বিষয়ে ৮০ উপরে নম্বর পেয়েছি। সাধারণ গণিতে ৭৬ পেয়েছি। সাধারণ গণিতে এত কম কিভাবে পেয়েছি তা বোধগম্য হচ্ছো না। এটার জন্য আমি বোর্ডে চ্যালেঞ্জ করব। আমি আশা করি সাধারণ গণিতেও আমি ৯০ এর উপর নম্বর পাব।
তিনি আরো জানান, নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি দুইটা প্রাইভেট পড়াইতাম। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এখনো তেমন নাই, তবে স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পড়ালেখার স্বপ্ন রয়েছে। বাংলাদেশের পড়ার সিম্টম ভালো লাগে না। তাই বিদেশ যেতে চাই। ইউটিউবে অন্যান্য দেশের কৃষ্টি কালচার বেশি দেখি।
মিলির মা রীনা বেগস জানান, তার স্বামী আগে কসমেটিকের ব্যবসা করতো। ব্যবসার পাশাপাশি কবিতা লেখালিখি করতো। ৫ বছর আগে সে মানসিক ভাবে অসুস্হ হয়ে পড়ে। তখন থেকে সে আর কোন কাজ করতে পারে না। তিন মেয়ে ও স্বামী নিয়ে সেই সংসার চালাচ্ছে। তার পায়েও সমস্যা। অনেক কষ্ট করে সংসার চলাতে হয়। সংসার চালাতে হাঁস-মুরগি লালন-পালন শুরু করি।
তিনি আরো বলেন, সংসার চালাতে কষ্ট হলেও তিন মেয়ের পড়ালেখা বন্ধ করিনি। আমার মেয়ে সকলের দোয়া ও তার চেষ্টায় এই ফলাফল করেছে। মেয়ের পছন্দ মত কলেজেই ভর্তি করাব। মেয়ের পড়ার খরচ আমার ছোট ভাইয়েরা সব সময় সাহায্য করে।
তিনি আরো জানান, মিলির পড়া-লেখার ব্যাপারে তার বড় মেয়ে তাকে খুব শাসন করতো। পড়ার জন্য খুব বকাঝকা করত।
বাকাইল হাই স্কুলেরর শিক্ষক পংকজ চৌধুরী বলেন, অদম্য ইচ্ছা ও শক্তির কাছে হার মেনেছে দারিদ্রতা। মিলি আমাদের স্কুলের গর্ব। ওর ফলাফলে আমরা খুব খুশি। ও যতটুকু পড়তো মন দিয়ে পড়তো। পড়াতে কখনো ফাঁকি দিত না। মিলি খুব শান্ত স্বভাবের একটা মেয়ে।