
X
শ্রীমঙ্গলে বস্তায় আদা চাষ কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় বস্তায় আদা চাষ কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। পতিত জমি, বাড়ির উঠান, আঙিনা কিংবা ছাদের মতো ছোট পরিসরের জায়গা কাজে লাগিয়ে বস্তায় আদা চাষ করে লাভবান হচ্ছেন কৃষকেরা। কৃষি বিভাগের উদ্যোগ ও পরামর্শে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে পরিবেশবান্ধব ও স্বল্প পরিসরের এ চাষপদ্ধতি।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ২৮ হাজার ৫৫০টি বস্তায় আদা চাষ হয়েছে। এসব বস্তা থেকে প্রায় ১৯ হাজার ৯৮৫ কেজি আদা উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমান বাজারদর বিবেচনায় উৎপাদিত আদার সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ২৩ লাখ ৯৮ হাজার ২০০ টাকা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আলাউদ্দিন জানান, বস্তায় আদা চাষের অন্যতম সুবিধা হলোÑএতে অল্প জায়গায় চাষ করা যায় এবং পতিত জমি ও বাড়ির অব্যবহৃত জায়গাকে উৎপাদনমুখী কাজে লাগানো সম্ভব। একই সঙ্গে জমিতে চাষের তুলনায় রোগবালাইয়ের আক্রমণ তুলনামূলক কম হওয়ায় কৃষকের ঝুঁকিও কম থাকে।
তিনি বলেন, বস্তায় আদা চাষে প্রথমে মাটি, জৈবসার ও বালি নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে বস্তা ভর্তি করা হয়। এরপর বীজ হিসেবে আদার কন্দ রোপণ করা হয়। নিয়মিত পরিচর্যা, সঠিক পানি নিষ্কাশন ও প্রয়োজনীয় সার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হলে প্রায় ৮ থেকে ৯ মাসের মধ্যে বস্তা থেকে আদা সংগ্রহ করা যায়।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, শ্রীমঙ্গলের মোহাজিরাবাদ, খলিলপুর, ডেঙ্গারবন, আশীদ্রোন, পারের টং, সিন্দুরখান, মাজদিহি ও রাধানগর এলাকায় বস্তাভিত্তিক আদা চাষ বেশি হচ্ছে। এ উদ্যোগে ইতোমধ্যে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন কৃষক অংশ নিয়েছেন। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি হেক্টরে গড়ে ৮ থেকে ৯ টন পর্যন্ত আদা উৎপাদন হতে পারে।
'ফ্লাড রিকনস্ট্রাকশান ইমার্জেন্সি এসিসটেন্ট প্রজেক্টের ( ফ্রিপ) আওতায় চলতি মৌসুমে শ্রীমঙ্গলে বস্তায় আদা চাষের জন্য ৩০টি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে। এসব প্রদর্শনী প্লটে কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে বস্তা, রাসায়নিক সার, জৈবসার, মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ও বীজ বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়েছে।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুকুর রহমান বলেন, বস্তায় আদা চাষ শুধু গ্রামাঞ্চলের কৃষকদের জন্য নয়, শহরাঞ্চলের মানুষের জন্যও সম্ভাবনাময়। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, উঠান কিংবা অন্য কোনো অব্যবহৃত জায়গায় অল্প পরিসরে এ চাষ করা সম্ভব। এতে পরিবারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাড়তি আয়ও করা যেতে পারে।
তিনি জানান, এবার শ্রীমঙ্গলে ২৮ হাজার ৫৫০ বস্তায় আদা চাষ হয়েছে। প্রতি বস্তায় গড়ে প্রায় ৭৫০ গ্রাম আদা উৎপাদন হলে মোট উৎপাদন দাঁড়াবে প্রায় ১৯ হাজার ৯৮৫ কেজি। এসব আদার সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ২৩ লাখ ৯৮ হাজার ২০০ টাকা।
বাংলাদেশে মসলা জাতীয় ফসলের মধ্যে আদার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। রান্নার অপরিহার্য উপকরণ হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি আদার বিভিন্ন ঔষধি গুণও রয়েছে। দেশের চাহিদার তুলনায় স্থানীয় উৎপাদন কম হওয়ায় প্রতিবছর ভারত, চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আদা আমদানি করতে হয়। এতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়।
কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, দেশে প্রতিবছর প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ মেট্রিক টন আদার চাহিদা রয়েছে। এ চাহিদা পূরণে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন ও আধুনিক চাষপদ্ধতি সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, বস্তায় আদা চাষ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে পারলে পতিত ও অনাবাদি জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে কৃষকের বাড়তি আয় সৃষ্টি, স্থানীয় বাজারে আদার সরবরাহ বৃদ্ধি এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রেও এ পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আলাউদ্দিন বলেন, “আমরা কৃষকদের পতিত জমি ও ছোট জায়গা কাজে লাগাতে উৎসাহিত করছি। বস্তায় আদা চাষে কৃষক যেমন লাভবান হবেন, তেমনি জাতীয় অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। শ্রীমঙ্গলে বস্তায় আদা চাষ ইতোমধ্যে একটি সম্ভাবনাময় মডেল হিসেবে গড়ে উঠছে। কৃষি বিভাগের পরিকল্পিত উদ্যোগ, কৃষকদের পরিশ্রম ও সরকারি সহায়তা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে এ পদ্ধতি দেশের অন্যান্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়বে বলে আমরা আশা করছি।”
শ্রীমঙ্গলে বস্তায় আদা চাষের এ উদ্যোগ একদিকে যেমন সীমিত জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করছে, অন্যদিকে কৃষকদের জন্য সৃষ্টি করছে বাড়তি আয়ের সুযোগ। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে এই চাষপদ্ধতি ভবিষ্যতে দেশের আদা উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।