‘ভোম ভোলে’ ধ্বনিতে মুখর ব্রহ্মপুত্র নদ, মহাদেবের চরণে ভক্তের জল

হোসাইন সুলভ, ময়মনসিংহ

সারাবাংলা

শ্রাবণ মাস এলেই ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় তৈরি হয় এক ভিন্ন আবহ। ভোরের আলো ফোটার আগেই শহর ও আশপাশের বিভিন্ন

2026-08-17T16:29:10+00:00
2026-08-17T16:29:10+00:00
সোমবার ১৭ আগস্ট ২০২৬ ২ ভাদ্র ১৪৩৩
সোমবার ১৭ আগস্ট ২০২৬
   
‘ভোম ভোলে’ ধ্বনিতে মুখর ব্রহ্মপুত্র নদ, মহাদেবের চরণে ভক্তের জল
হোসাইন সুলভ, ময়মনসিংহ
প্রকাশ: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:২৯ পিএম   (ভিজিট : ০)
ছবি: প্রতিনিধি
X

ছবি: প্রতিনিধি

শ্রাবণ মাস এলেই ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় তৈরি হয় এক ভিন্ন আবহ। ভোরের আলো ফোটার আগেই শহর ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে খালি পায়ে রওনা হন শিবভক্তরা। কারও কাঁধে বাঁশের কাঁওয়ার, তাতে ঝুলছে কলসি। কারও হাতে পিতল, তামা কিংবা মাটির ঘট। কারও আবার সাধারণ জারিকেন বা স্টিলের পাত্র। সবার গন্তব্য পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের বাইগন বাড়ি ঘাট।

সেখান থেকে জল সংগ্রহ করে দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে নিজ নিজ এলাকার শিবমন্দিরে গিয়ে মহাদেবের মাথায় সেই জল ঢালাই তাদের মূল উদ্দেশ্য। শ্রাবণের শেষ সোমবারকে ঘিরে প্রতিবছরই মুক্তাগাছায় এমন ধর্মীয় পদযাত্রায় অংশ নেন হাজারো মানুষ। স্থানীয়দের কাছে এ আয়োজন পরিচিত ‘ভোম ভোলে’ নামে।

মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া এ পদযাত্রা রাত পেরিয়ে ভোর এবং সকাল পর্যন্ত চলে। প্রায় ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয় অনেক ভক্তকে। কারও পায়ে জুতা নেই, কারও হাতে নেই কোনো বাহারি আয়োজন। আছে শুধু বিশ্বাস, ভক্তি আর মহাদেবের প্রতি অগাধ আস্থা।
পথ যত দীর্ঘ হয়, ততই বাড়তে থাকে ভক্তদের কণ্ঠের ধ্বনি। ‘হর হর মহাদেব’, ‘ভোম ভোলে’ ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে পথঘাট। একদল ভক্তের সঙ্গে আরেকদল যুক্ত হয়। ছোট ছোট দল একসময় পরিণত হয় দীর্ঘ এক পদযাত্রায়।

ভক্তদের কেউ বলেন, এই পথ তাদের কাছে শুধু কয়েক কিলোমিটারের রাস্তা নয়, এটি মানত ও বিশ্বাসের পথ। মহাদেবের মাথায় জল ঢালার উদ্দেশ্যে যে কষ্ট স্বীকার করতে হয়, সেটিকে তারা কষ্ট হিসেবে দেখেন না।

মুক্তাগাছার এক প্রবীণ শিবভক্ত নারায়ণ চক্রবর্তী বলেন, ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, শ্রাবণের শেষ সোমবারে আমরা দল বেঁধে নদীর ঘাটে যাই। অনেক বছর ধরে এই নিয়ম মেনে জল এনে শিবের মাথায় ঢালছি। বয়স হয়েছে, এখন হাঁটতে কষ্ট হয়। তারপরও এই দিনটির জন্য মনটা অন্যরকম হয়ে যায়। মহাদেবের নাম নিতে নিতে কখন যে পথ শেষ হয়ে যায়, বুঝতেই পারি না।

আরেক ভক্ত আকাশ বলেন, আমাদের কাছে এটা শুধু পূজা নয়, একটা বিশ্বাসের বিষয়। নদী থেকে জল নিয়ে খালি পায়ে হেঁটে শিবমন্দিরে গিয়ে জল ঢাললে মনটা শান্তি পায়। পরিবার ও নিজের মঙ্গল কামনায় প্রতিবছরই আমরা এই যাত্রায় অংশ নিই।

শ্রাবণ মানেই বৃষ্টি। কখনো মুষলধারে বৃষ্টি, কখনো কাদা-মাটিতে ভরা রাস্তা। কোথাও আবার ভাঙাচোরা পথ, কাঁকর-পাথরের খোঁচা। এসব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও অনেক ভক্ত খালি পায়েই পুরো পথ অতিক্রম করেন।
কেউ কেউ যাওয়ার সময় অটোরিকশা, ভ্যান কিংবা অন্য যানবাহনে করে বাইগন বাড়ি ঘাটে পৌঁছান। তবে নদী থেকে জল সংগ্রহের পর শুরু হয় তাদের আসল পদযাত্রা। জলভর্তি পাত্র কাঁধে নিয়ে খালি পায়ে ফিরে আসেন নিজ নিজ মন্দিরের উদ্দেশ্যে।

অনেকের কাঁধে থাকে কাঁওয়ার। বাঁশের দুই প্রান্তে দড়ি দিয়ে ঝোলানো থাকে দুটি কলসি বা পাত্র। হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে দুলতে থাকে সেই কাঁওয়ার। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি, কাঁধের চাপ কিংবা পায়ের ব্যথা কিছুই যেন তাদের ভক্তিকে থামাতে পারে না।

এক তরুণ ভক্ত রাকেশ বলেন, প্রথমবার যখন এসেছিলাম, মনে হয়েছিল এত দূর কীভাবে হাঁটব। কিন্তু সবার সঙ্গে ‘ভোম ভোলে’ বলতে বলতে হাঁটলে ক্লান্তি অনেকটাই কমে যায়। এটা আমাদের কাছে আনন্দেরও একটি বিষয়। বন্ধু, বড় ভাই, পরিবারের সদস্য সবাই মিলে আসি।

এই পদযাত্রায় শুধু তরুণদেরই দেখা যায় না। নারী, প্রবীণ এমনকি শিশুরাও অংশ নেয়। অনেক পরিবার একসঙ্গে নদীর ঘাটে যায়। কেউ কেউ পরিবারের ছোট সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে এই ধর্মীয় রীতিতে অংশ নেন।

বয়স্কদের কেউ পুরো পথ হাঁটতে না পারলেও সামর্থ্য অনুযায়ী অংশ নেন। অনেকে যানবাহনে করে নদীর ঘাটে গিয়ে জল সংগ্রহ করেন এবং এরপর যতটা সম্ভব পায়ে হেঁটে মন্দিরে ফেরেন।

স্থানীয় এক নারী ভক্ত পূজা সাহা বলেন, ছোটবেলায় মা-বাবার সঙ্গে এই যাত্রায় আসতাম। এখন নিজের সন্তানকে নিয়ে আসি। আমাদের বিশ্বাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে এই আয়োজন মিশে আছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমরা এটা দেখে আসছি।

জল বহনের পাত্র নিয়েও ভক্তদের মধ্যে রয়েছে বৈচিত্র্য। কারও কাঁওয়ারে বাঁধা মাটির কলসি, কারও হাতে তামার ঘট। কেউ পিতলের পাত্র ব্যবহার করেন। আবার অনেকের হাতে থাকে সাধারণ প্লাস্টিকের জারিকেন কিংবা স্টিলের পাত্র।

তবে পাত্রের চাকচিক্য নিয়ে কারও মধ্যে কোনো প্রতিযোগিতা নেই। ভক্তদের কাছে মূল বিষয় হলো নদী থেকে জল সংগ্রহ করে তা শিবলিঙ্গে অর্পণ করা।

ভক্তদের বিশ্বাস, মহাদেব ‘আশুতোষ’, অর্থাৎ সামান্য ভক্তিতেই যিনি সন্তুষ্ট হন। তাই দামি পাত্র বা বড় আয়োজনের চেয়ে আন্তরিকতাকেই বেশি গুরুত্ব দেন তারা।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাইগন বাড়ি ঘাটেও জমতে থাকে ভক্তদের ভিড়। কেউ নদীতে নেমে জল সংগ্রহ করছেন, কেউ পাত্র ধুয়ে প্রস্তুত করছেন। আবার কেউ দলবেঁধে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিচ্ছেন।

জল সংগ্রহের পর অনেকেই সেখানে শিবের নাম জপ করেন। এরপর শুরু হয় ফেরার প্রস্তুতি। ভোরের দিকে নদীর ঘাট থেকে যখন অসংখ্য ভক্ত একসঙ্গে ফিরতে শুরু করেন, তখন পুরো পথ যেন পরিণত হয় দীর্ঘ এক ধর্মীয় শোভাযাত্রায়।

কেউ কাঁধে কাঁওয়ার নিয়ে হাঁটছেন, কেউ হাতে জলভর্তি ঘট। মুখে স্লোগান, কণ্ঠে ভক্তিগীতি। কোথাও কোথাও স্থানীয় বাসিন্দারা পথচারীদের জন্য পানি, শরবত কিংবা খাবারের ব্যবস্থা করেন।

স্থানীয়দের মতে, মুক্তাগাছার ‘ভোম ভোলে’ শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়, এটি এলাকার দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ।

পদযাত্রার পথে স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ভক্তদের সহযোগিতা করেন। কেউ রাস্তা পরিষ্কার রাখেন, কেউ পানির ব্যবস্থা করেন, কেউ যানবাহন চলাচলে সহযোগিতা করেন। ফলে ধর্মীয় এই আয়োজন ঘিরে তৈরি হয় এক ধরনের সামাজিক সম্প্রীতির পরিবেশ।

স্থানীয় এক বাসিন্দা সুজন সরকার বলেন, প্রতিবছর এই সময় আমরা রাস্তায় অনেক মানুষ দেখতে পাই। তারা দূর থেকে হেঁটে আসে। আমাদের পক্ষ থেকে যতটুকু পারি পানি বা শরবত দিয়ে সহযোগিতা করি। এতে আমাদেরও ভালো লাগে।

মুক্তাগাছার বড়হিস্যা বাজার কালি শিবমন্দিরের পুরোহিত প্রদীপ চক্রবর্তী বলেন, শ্রাবণ মাস শিবভক্তদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ মাসে ভক্তরা উপবাস, পূজা, জল ও বেলপাতা অর্পণসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আচার পালন করেন। শ্রাবণের শেষ সোমবারে নদী থেকে জল এনে শিবলিঙ্গে অর্পণের যে রীতি চলে আসছে, তা ভক্তদের বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

তিনি আরও বলেন, শিবের পূজায় বাহ্যিক আড়ম্বরের চেয়ে ভক্তির গুরুত্ব বেশি। একজন মানুষ আন্তরিকভাবে ঈশ্বরকে স্মরণ করে যে জল অর্পণ করেন, ভক্তদের কাছে সেটিই সবচেয়ে বড় অর্ঘ্য।

কত বছর ধরে মুক্তাগাছায় এই ‘ভোম ভোলে’ পদযাত্রা চলে আসছে, তার সুনির্দিষ্ট লিখিত ইতিহাস অনেকের কাছেই নেই। তবে স্থানীয় প্রবীণদের কথায়, বহু বছর ধরে পরিবার ও সম্প্রদায়ের এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে এই রীতি চলে আসছে।

বাবার হাত ধরে যে শিশু একদিন এই পদযাত্রায় এসেছিল, কয়েক বছর পর তাকেই দেখা যায় নিজের সন্তানকে নিয়ে একই পথে হাঁটতে। এভাবেই ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে মিশে গেছে পারিবারিক স্মৃতি, স্থানীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধন।

মুক্তাগাছার এই পদযাত্রার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এখানেই। সময় বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে, যাতায়াতের ব্যবস্থা বদলেছে। কিন্তু বহু ভক্তের কাছে নদী থেকে জল নিয়ে খালি পায়ে মন্দিরে ফেরার সেই পুরোনো রীতি এখনো বদলায়নি।

শ্রাবণের শেষ সোমবারে তাই মুক্তাগাছার রাত শুধু রাত থাকে না। অন্ধকার ভেদ করে যখন একের পর এক দল নদীর ঘাটের দিকে এগিয়ে যায়, তখন চারপাশে শোনা যায় ‘হর হর মহাদেব’ আর ‘ভোম ভোলে’ ধ্বনি।

তারপর নদীর জল মাথায় তুলে আবার শুরু হয় ফেরার পথ। পায়ের নিচে কাদা, কোথাও কাঁকর-পাথর, শরীরে ক্লান্তি, কাঁধে ভারী কাঁওয়ার। তবু মুখে হাসি, কণ্ঠে মহাদেবের নাম।

দীর্ঘ এই পদযাত্রার শেষে যখন শিবলিঙ্গের মাথায় অর্পিত হয় ব্রহ্মপুত্রের জল আর বেলপাতা, তখন পূর্ণ হয় ভক্তদের দীর্ঘ পথচলার উদ্দেশ্য। আর এভাবেই বছরের পর বছর ধরে মুক্তাগাছার মাটিতে টিকে আছে ‘ভোম ভোলে’ নামে পরিচিত এই লোকায়ত ধর্মীয় ঐতিহ্য।





Loading...
Loading...


সারাবাংলা এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy