
X
জয়িতা পলি। নামের মধ্যেই যেন সংগ্রামের পদচিহ্ন। অসাধ্যকে সাধন করে তৃতীয় লিঙ্গের জয়িতা পলি এখন সফল মডেল উদ্যোক্তা। ২০১৪ সালে রাজশাহী মহানগরীর মোল্লাপাড়ায় নিজ বাড়িতে মাত্র ৮ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে গড়ে তুলেন ‘ডিএ ফ্যাশন হাউজ’। তার এই পথ চলা অনেকটা কণ্টাকীর্ণ হলেও তার অদম্য ইচ্ছা, আগ্রহ ও পরিশ্রমই তাকে সফলতার স্বর্ণশিখরে পৌঁছে দিয়েছে। প্রতি মাসে পলির আয় এখন লক্ষাধিক টাকা। মাত্র ২৫ জন নিয়ে তার এই ফ্যাশন হাউজের যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে চারশতেরও অধিক তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী ও প্রান্তিক নারীরা কাজ করছেন। যারা তৈরি করেন বিভিন্ন ধরনের হাতের তৈরি শাড়ি, থ্রি-পিস, বেড সিট ও কুশন কভার। তার ফ্যাশন হাউজ থেকে তৈরিকৃত এসব পণ্য দেশের বিভিন্নস্থানে বিক্রি হয়। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও গেছে তার পণ্য।
মানুষের অসহযোগিতামূলক আচরণ কিংবা রক্ষণশীল নীতির কারণে পলিকে বারবার হোঁচট খেতে হয়েছে। কিন্তু সব সময় ইতিবাচক ছিলেন। সততা আর পরিশ্রমই তার নিজের পায়ের নিচের মাটি শক্ত করে। এখন তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী ও নারীদের অনুপ্রেরণার এক অনন্য নাম পলি। নিজের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৭ সালে পেয়েছেন ‘জয়িতা’ পুরস্কার। তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করায় ২০২১ সালে অর্জন করেন ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড’। রয়েছে আরও অনেক অর্জন।
দ্রুত বর্ধনশীল ব্যবসা আর সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ নিয়ে এখন দারুণ ব্যস্ত পলি। রাজশাহীতে এইডস প্রতিরোধ কর্মসূচি নিয়ে কাজ করেন। ‘দিনের আলো হিজড়া সংঘ’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর জীবন মানোন্নয়ন ও স্বাবলম্বী করে তুলতে বিভিন্ন কাজ করছেন। স্থানীয় নারী ও তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর সদস্যদের অ্যাপ্লিকস ও বুটিকসের ওপর প্রশিক্ষণ দেন। তার মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছেন অনেকেই। সামজিক ও পারিবারিকভাবে নিগৃহীত বহু নারী তার হাত ধরেই পেয়েছেন বেঁচে থাকার নতুন স্বপ্ন।
সফল উদ্যোক্তা হওয়ার গল্পে পলি জানান, নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ২০১২ সালে এইচএসসি পাস করেন তিনি। ২০১৫ সালে তার পাশে দাঁড়ায় ‘বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’। সংস্থাটি তাকে প্রশিক্ষণ আর আর্থিক সহায়তা দেয় যা তাকে নতুন জীবনের সন্ধান দেয়। প্রশিক্ষণ শেষে ৮ হাজার টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন পলি। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে পলির কাজের দক্ষতা ও পরিসর। এভাবেই সফলতার দিকে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছেন তিনি।
কীভাবে তিনি এ কাজে অনুপ্রাণিত হলেন? এমন প্রশ্নের জবাবে পলি খাতুন বলেন, 'শুরুতে লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে অনেক সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়েছে আমাকে। এখনও করছি। ছোটবেলা থেকেই আমার ড্রয়িংয়ের শখ। স্কুলে ড্রয়িংয়ে খুব ভালো ছিলাম। কিন্তু ড্রয়িংয়ের ওপর উচ্চতর পাঠ নেওয়া সম্ভব হয়নি। আঁকাআঁকির জন্য কাগজের পরিবর্তে বেছে নিয়েছি থ্রি-পিস কাপড় ও শাড়ি। 'বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির' প্রশিক্ষণের কাজের দক্ষতা ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনা লাভ করি। ধীরে ধীরে ব্যবসার পরিসর বাড়তে থাকে। ফ্যাশন হাউজের থ্রি-পিস ও শাড়ি আমি নিজেই ডিজাইন করি। সেই ডিজাইনের ওপর অ্যাপ্লিকস ও বুটিকসের কাজও করি। এখন অবশ্য ব্যবসা বড় হয়ে যাওয়ায় বুটিকসের কাজ কমিয়ে দিয়েছি।'
তিনি আরও বলেন, 'নিজের লৈঙ্গিক পরিচয়ের কারণে ব্যবসায় অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে জানিয়ে পলি বলেন, আমি অনেক হিজড়া জনগোষ্ঠীর মানুষকে সম্মানজন কাজের ব্যবস্থা করেছি। তারপরও লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে অনেক সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়েছে আমাকে। এখনও করছি। যেমন শুধু তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর একজন হওয়ার কারণে আমাকে ব্যাংক লোন দেওয়া হয়নি। আর তাই এখন আর ব্যাংকে যায় না। এগিয়ে যাচ্ছি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী।'
পলি নিজেকে নারীই মনে করেন। তাই এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তিনি বলেন, বুটিকসের কাজের মধ্যে নারীত্বের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আমার অধীনে এখন চারশো'র বেশি নারী স্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক কাজ করেন। চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের সব সামগ্রী সরবরাহ করি। তারা নিজের বাড়িতে কাজ করেন।
পলির কাজের স্বীকৃতির জন্য রাজশাহী জেলা প্রশাসন তাকে ২০১৭ সালে শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত করে। এছাড়া এসএমই আঞ্চলিক পণ্য মেলা (২০২০) এ দ্বিতীয় নারী উদ্যোক্তার পুরস্কার পান তিনি। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন তাকে ২০২০ সালের করোনাকালীন 'মানবিক যোদ্ধা' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করায় ২০২১ সালে অর্জন করেন ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড’।
নারী ও তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর সদস্যদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে গর্ববোধ করছেন উল্লেখ করে পলি বলেন, অসংখ্য নারী ও তৃতীয় লিঙ্গের সদস্যদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। তাদের একটা আয়ের ব্যবস্থা করে দিতে পেরেছি এবং এই টাকা নিয়ে তারা নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে পারছেন। এটা আমার কাছে অনেক সুখের ও আনন্দের।