গর্ভবতী নিপা ও মেয়ে জোতি হত্যার প্রধান আসামি গ্রেফতার

মামুন মোল্লা, সাভার (ঢাকা)

সারাবাংলা

মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুরের চাঞ্চল্যকর গর্ভবতী নিপা ও তার ৩ বছরের মেয়ে জোতি’কে শ্বাসরোধ করে হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী

2022-08-05T15:05:55+00:00
2022-08-05T15:05:55+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
গর্ভবতী নিপা ও মেয়ে জোতি হত্যার প্রধান আসামি গ্রেফতার
মামুন মোল্লা, সাভার (ঢাকা)
প্রকাশ: শুক্রবার, ৫ আগস্ট, ২০২২, ৩:০৫ পিএম   (ভিজিট : ৩০২)
X

মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুরের চাঞ্চল্যকর গর্ভবতী নিপা ও তার ৩ বছরের মেয়ে জোতি’কে শ্বাসরোধ করে হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী জাকির হোসেন'কে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-৪।

র‌্যাব-৪ জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার (৪ অগাস্ট ২০২২) রাতে  ঢাকা জেলার সাভার থানাধীন শাহিবাগ এলাকায় অভিযান চালিয়ে মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুরের চাঞ্চল্যকর গর্ভবতী নিপা আক্তার (২২) ও তার ৩ বছরের মেয়ে জোতিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা মামলার মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী জাকির হোসেনকে (৪৭) গ্রেফতার করা হয়। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী জাকির হোসেন দীর্ঘ ১২ বছর ধরে পলাতক ছিলেন।

র‌্যাব আরো জানায়, গ্রেফতারকৃত আসামীকে জিজ্ঞাসাবাদ ও ঘটনার বিবরণে জানা যায় যে, গত ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারি মাস নাগাদ গ্রেফতারকৃত আসামী জাকির হোসেন মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর থানার জিয়নপুরের একই গ্রামের জনৈক মোঃ আবু হানিফ এর মেয়ে ভিকটিম নিপা আক্তারের সাথে পারিবারিকভাবে বিবাহ হয়। বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে বেশকিছু নগদ অর্থ, গহণা এবং আসবাবপত্র বরপক্ষকে প্রদান করা হয়। তদুপরি বিয়ের পর হতে উগ্র এবং বদমেজাজী আসামী জাকির হোসেন ভিকটিমকে আরো যৌতুকের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতে থাকে।

ইতোমধ্যে জাকির ও নিপা দম্পতির ঘরে জোতি (০৩) নামে ০১ টি কন্যা সন্তান জম্মগ্রহণ করে। একপর্যায়ে জাকিরের পূনরায় গর্ভবতী স্ত্রী নিপা আক্তার জানতে পারে যে, জাকির এর বড় ভাই মোঃ জাহাঙ্গীর এর স্ত্রী তাহমিনার সাথে জাকির হোসেন এর পরকিয়া প্রেমের সর্ম্পক গড়ে উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে দাম্পত্য কলহ আরো বেড়ে যায়। গত ২৫-০২-২০০৫ তারিখ রাতে জাকিরের ভাই জাহাঙ্গীর বাড়িতে না থাকার সুযোগে আসামী জাকির হোসেন তার ভাবী তাহমিনার ঘরে প্রবেশ করে। জাকিরের স্ত্রী নিপা আক্তার জাকির ও তাহমিনাকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলে এবং তার স্বামীকে জানায় বিষয়টি তার ভাসুর জাহাঙ্গীর’কে বলে দিবে।

সেই কারণে এই বিষয় নিয়ে আসামী জাকির ও তার স্ত্রী ভিকটিম নিপা আক্তারের মধ্যে পুনরায় মনোমালিন্য এবং তুমুল ঝগড়া-বিবাদের সৃষ্টি হওয়ায় জাকির ভিকটিমকে তালাক দিবে মর্মে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে। তখন ভিকটিম নিপা আক্তার ০৫-০৬ মাসের অন্তঃসত্তা ছিলো। ভিকটিম নিপা আক্তার জাকির ও তাহমিনার পরকীয়া প্রেমের এই ঘটনা আসামী জাকিরের বড় ভাই জাহাঙ্গীরকে বলার পর আসামি জাকির, তার ভাই জাহাঙ্গীর, ভাবী তাহমিনা এবং শশুর-শাশুরীসহ প্রায় পরিবারের সকলেই বিষয়টি বিশ্বাস না করে ক্ষিপ্ত হয়ে ভিকটিম নিপা আক্তারকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে।

পরে পরিবারের সদস্যসহ আত্বীয়-স্বজন এবং বন্ধু বান্ধবের উস্কানিতে আসামী জাকির স্ত্রী নিপা আক্তারের প্রতি আরো উগ্র এবং প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে পড়ে এবং গোপনে ভিকটিম নিপা আক্তার’কে হত্যার পরিকল্পনা করে।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৫ দিবাগত রাতে আসামী জাকির পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ঘুমন্ত অবস্থায় ভিকটিম নিপা আক্তার’কে গলায় গামছা দিয়ে হত্যা করে এসময় ভিকটিম নিপা আক্তার মৃত্যু যন্ত্রনায় হাত-পা আছড়া আছড়ি করার সময় তাদের মেয়ে জোতি (০৩)’ জেগে কান্না-কাটি করতে থাকে। তখন ঘটনার সাক্ষী না রাখতে নরঘাতক পাষান্ড বাবা একই প্রক্রিয়ায় ০৩ বছরের শিশু কন্যা জোতি’কে হত্যা করে ঘরে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৫ তারিখে থানা পুলিশ কর্তৃক ভিকটিম নিপা আক্তার এবং তার কন্যা জোতির মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে প্রেরণ করে।

একই দিনে উক্ত চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক ঘটনায় ভিকটিমের বাবা মোঃ আবু হানিফ বাদী হয়ে দৌলতপুর থানায় আসামী জাকির হোসেনসহ তার বাবা-নইম উদ্দিন শেখ, মা-মালেকা বানু এবং ভাবি-তাহমিনাসহ সর্বমোট ০৪ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন যার মামলা নং-০৪(০২)২০০৫, তারিখঃ ২৭/০২/২০০৫, ধারা-৩০২/৩৪ (দঃ বিঃ)।

দৌলতপুর থানা পুলিশ মামলার এজাহারনামীয় প্রধান আসামি জাকির হোসেন, বাবা- নইম উদ্দিন শেখ, মা- মালেকা বানু ও ভাবি- তাহমিনাকে গ্রেফতার করে বিজ্ঞ আদালতে প্রেরণ করে কিন্তু এজাহারনামীয় আসামী নইম উদ্দিন শেখ, মালেকা বানু, তাহমিনা আসামীগণ ০১ মাস কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পায়। এজাহারনামীয় ০১ নং আসামী জাকির হোসেন ০৫ বছর কারাভোগ করে ২০১০ সালে জামিনে মুক্তি পেয়ে আত্মগোপনে চলে যায়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলার তদন্তকালীন সময়ে স্বাক্ষী-প্রমানে জানতে পারে এই হত্যাকান্ডে এজাহারনামীয় আসামীদের বাইরেও বেশ কয়েকজন জড়িত আছে। বিশদ তদন্তকালে আসামী জাকিরের বিচারিক স্বীকারোক্তি অনুযায়ী হত্যাকান্ডের সময় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকায় তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রধান আসামী জাকির হোসেন, তার বাবা নইম উদ্দিন শেখ, মা মালেকা বানু এবং ভাবি তাহমিনা সহ জাকিরের বড় ভাই জাহাঙ্গীর হোসেন (৩২), জাকিরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আমিনুল (১৮), জাহাঙ্গীরের শ্যালক স্বপন (২২) ও হাসান (১৮) এবং জাকিরের চাচাতো ভাই পারভেজ @রানা @মিলন (১৫) সহ সর্বমোট ০৯ জনের বিরুদ্ধে বিজ্ঞ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

পরবর্তীতে চার্জশিটের ভিত্তিতে বিজ্ঞ আদালত মামলার বিচারকার্য পরিচালনা করেন এবং পর্যাপ্ত স্বাক্ষ্য প্রমাণ ও উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে ভিকটিম অন্তঃসত্তা নিপা আক্তার ও তার মেয়ে জোতি হত্যাকান্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার অপরাধে ১২/০৯/২০২১ তারিখে মানিকগঞ্জ জেলার বিজ্ঞ জেলা ও দায়রা জজ উৎপল ভট্টাচার্য প্রধান আসামী জাকির’কে মৃত্যুদন্ড প্রদান করেন এবং অপর আসামী ভাবি-তাহমিনা, জাকিরের ভাই-জাহাঙ্গীর, জাকিরের বন্ধু-আমিনুল, জাকিরের চাচাতো ভাই পারভেজ রানা মিলন, জাহাঙ্গীরের শ্যালক স্বপন ও হাসান সহ প্রত্যেককে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত করেন। আসামী মালেকা বানু (জাকিরের মা) বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমানিত না হওয়ায় বিজ্ঞ আদালত তাকে বেকসুর খালাস প্রদান করেন।

উল্লেখ্য যে, বিচারকার্য চলাকালীন সময় আসামী নইম উদ্দিন মৃত্যুবরণ করে। ২০১০ সালে জামিন গ্রহণের পর থেকে মামলার রায়ের সময় মূল আসামী জাকির পলাতক ছিলো এবং গ্রেফতার হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত প্রায় দীর্ঘ ১২ বছর আত্মগোপনে ছিলো।

আরো জানায়, আসামী জাকির হোসেন ১৯৭৫ সালে মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর থানাধীন জিয়নপুর এলাকায় জন্মগ্রহণ করে। প্রথম স্ত্রী অন্তঃসত্তা নিপা আক্তার ও তার মেয়ে জ্যোতিকে হত্যা করায় ০৫ বছর হাজতবাস শেষে জামিন নিয়ে বের হওয়ার পর আসামী আত্মগোপনে চলে যায়। ২০১৩ সালে আসামী জাকির পুনরায় বিয়ে করে। গ্রেফতারের মুহূর্তে আসামি জাকির হোসেন তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে সাভার থানাধীন জিনজিরা এলাকায় বসবাস করে আসছিলো। বর্তমান সংসারে তার মাধুরি (০৫) ও মারিয়া (০৩) নামে দুইটি কন্যা সন্তান রয়েছে। প্রথম স্ত্রী ভিকটিম অন্তঃসত্তা নিপা আক্তার ও তার মেয়ে জ্যোতি হত্যা মামলায় জামিন নেওয়ার পর ২০১০ সাল থেকে আসামী আর কোনোদিন মানিকগঞ্জের দৌলতপুর যায়নি। তবে উক্ত হত্যার ঘটনার পর থেকে আত্মগোপন এবং গ্রেফতার এড়ানোর জন্য আসামী জাকির প্রথমে চট্টগ্রাম ও পরবর্তীতে ঢাকার আরামবাগ, ফকিরাপুল, হাজারীবাগ, খিলগাঁও ও সাভার এলাকায় বসবাস করতো।

তবে এক জায়গায় সে বেশিদিন অবস্থান করতো না। তাছাড়া পরিচয় গোপনের উদ্দেশ্যে সে প্রতিনিয়ত পেশা পরিবর্তন করতো। সে বিভিন্ন সময় গার্মেন্টস, স্পাইরাল বাইন্ডিং, ঝুট ব্যবসা এবং পরবর্তীতে ছদ্মবেশ ধারণ বিভিন্ন বাউল গানের দলের সাথে ঘুরে বেড়াতো ও বাউল গান করে জীবিকা নির্বাহ করতো এবং আসামী আইনের চোখ ফাঁকি দিতে জাকির নাম পাল্টিয়ে বাউল নাম ব্যবহার করে সাভার বসবাস করে আসছিলো।

গ্রেফতারকৃত আসামী জাকির হোসেনকে সংশ্লিষ্ট থানায় হন্তান্তর কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন র‌্যাব।

-বাবু/শোভা





Loading...
Loading...


সারাবাংলা এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy