
X
টাঙ্গাইলের সখীপুরে ড্রাগন চাষের সাথে সম্পৃক্ত হচ্ছেন তরুণ কৃষি উদ্যোক্তারাও। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বাগানে চাষকৃত ড্রাগন ফল সখীপুর বাজার সহ বিভিন্ন এলাকায় পাইকারি ও খুচরা দরে বিক্রিও হচ্ছে। এতে করে মানুষের পুষ্টির অভাব পূরণ হচ্ছে। মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও অভাবনীয় তারুণ্যের দীপ্তময় প্রতিভার সাথে সৃজনশীল মেধা পরিশ্রমকে কাজে লাগিয়ে জীবনের প্রতিটি অধ্যায় কে আলোকিত করা সম্ভব।
সম্প্রতি সরেজমিনে লক্ষ্য করা যায় উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে পেশাগত কৃষকদের পাশাপাশি তরুণ কৃষি উদ্যোক্তারাও ড্রাগন ফল চাষ এর সাথে সংযুক্ত হচ্ছেন। এক সময় ড্রাগন ফল আমাদের কাছে অপরিচিত থাকলেও বর্তমানে গ্রামে-গঞ্জের সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের কাছেই ড্রাগন ফল খুবই পরিচিত একটা নাম।
লাল টকটকে সুমিষ্ট দানাযুক্ত ফলটি সুপারফুড হিসেবেও মানুষের কাছে খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে। তাছাড়া ড্রাগন ফল বাংলাদেশে লাভজনক ফল হিসেবে কৃষকদের কাছে বেশ সমাদৃত। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় পাঁচ হেক্টর জমিতে ড্রাগন ফল চাষীরা ড্রাগন ফল চাষ করছে।
ড্রাগন ফলের জন্মভূমি সেন্ট্রাল আমেরিকা। ড্রাগন ফল এশিয়াত মহাদেশে প্রথম চাষাবাদ হয় মালয়েশিয়ায়। বিদেশি এই ফলটি অত্যন্ত গুণাগুণযুক্ত। তাছাড়া মানব দেহের স্বাস্থ্য উপকারিতার জন্যও অপরসীম । ড্রাগন ফলে থাকা ভিটামিন সি আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ও ত্বক ভালো রাখতে সহায়তা করে। আর এটি কোষ্ঠকাঠিন্য ও রক্তশূন্যতা দূর করতেও অনেক কার্যকরী। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, ড্রাগন ফলে প্রচুর পরিমাণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে যার ফলে মানব দেহের হৃদরোগ, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস এবং আর্থ্রাইটিসের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করতে এই সচেষ্ট ভূমিকা পালন করে। ড্রাগন ফলে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার থাকে যা দেহের হজমে শক্তি বৃদ্ধিকরণে ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়াও ড্রাগন ফলের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে প্রিবায়োটিক থাকার কারণে এটি অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্যকে উন্নত করতে পারে। আর নিয়মিত প্রিবায়োটিক গ্রহণ করলে সেটি আপনার পচনতন্ত্র ভালো রাখতে এবং ডায়রিয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি কমতে পারে।
ড্রাগন ফলের মধ্যে থাকা ভিটামিন সি ও ক্যারোটিনয়েডগুলো দেহের ইমিউনিটি সিস্টেমকে বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং শ্বেত রক্তকণিকাগুলোকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করে সংক্রমণ প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে।
মানব দেহের আয়রনের মাত্রা বৃদ্ধি করণে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে ড্রাগন ফল।আয়রন দেহের পুরো শরীরজুড়ে অক্সিজেন পরিবহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ড্রাগন ফলে ম্যাগনেসিয়াম রয়েছে যা দেহের গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশ নেয়। ম্যাগনেসিয়াম খাদ্যকে ভেঙে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে, পেশি সংকোচন বৃদ্ধিকরণে, হাড়ের সুদৃঢ় গঠনে এবং ডিএনএ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পড়াশোনার পাশাপাশি জীবনকে পুলকিত করার লক্ষ্যে নিরলস পরিশ্রমের সাথে দিন কাটাচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের মেধাবী ছাত্র টাঙ্গাইল সখীপুরের মাহফুজ তালুকদার। মেধাবী এই তরুণ উদ্যোক্তার গ্রামের বাড়ি সখীপুর উপজেলার কালিয়া ইউনিয়নের জামালহাটকুড়া গ্রামে। অল্প পুঁজি দিয়ে শুরু করেছেন ড্রাগন ফলের চাষ। তবুও এরই মধ্য দিয়ে তিনি তার জীবনের স্বপ্ন সফলতা গুলোর বীজ বপন করছেন।
মেধাবী এই তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা মাহফুজ তালুকদার বলেন, করোনার সময় গ্রামের বাড়ি এসে বসে বসে দিন কাটাচ্ছিলাম। পরে একা একাই ভাবতে লাগলাম এভাবে দিন পার করলে চলবে না,কিছু একটা করতে হবে। তার পর কৃষি নিয়ে কিছু করা যায় কিনা সেই চিন্তা চেতনা থেকেই ড্রাগন চাষ সম্পর্কে বিভিন্ন মাধ্যমে অবগত হলাম। গ্রামে আমাদের নিজস্ব ১২ শতাংশ জমিতে ৩২০ টি ড্রাগনের চারা রোপন করার মাধ্যমে ড্রাগন চাষ শুরু করেছি। ১২ মাস বয়সি ড্রাগন বাগানে এখন পর্যাপ্ত পরিমাণ ফলন হয়েছে। নিজেদের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাজারে পাইকারী বিক্রিও করতে পারি। রসায়নের বিভাগের ছাত্র হিসেবে রসায়নের সাথে সম্পর্ক যেমন ভালো তেমনি কৃষির সাথে সম্পর্ক আমার আত্নার। আমার পিতাও কৃষি কাজের সাথে সম্পৃক্ত। আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা একটা এগ্রো ফার্ম করব। যেখানে সব কিছু থাকবে এবং মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। আমি চাই যেকোনো উপয়ায়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে।কৃষি অন্যতম একটা সম্ভাবনা, যার মাধ্যমে অর্থনীতিতে অবদান রাখা যাবে। বাংলাদেশ মূলত কৃষি নির্ভর দেশ। এখন কৃষির সাথে পোশাক,ঔষধ, মাছ,মানব সম্পদ এবং প্রযুক্তি নির্ভর দেশ হয়ে উঠেছে। এখনো বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় একটা অংশ কৃষি থেকে আসে, তাই আমাদের কৃষিকে ভুলে গেলে চলবে না। আমাদের মতো তরুণ প্রজন্ম যদি পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষিতে আসে তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ হবে পাশাপাশি তরুণ কৃষি উদ্যোক্তারাও অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছলতা অর্জন করবে।
দারিয়াপুর ইউনিয়ন এর ছোট মৌসা গ্রামের বংশীচালা এলাকার ড্রাগন চাষী মোঃ সোহেল রানা বলেন, আমি দীর্ঘদিন প্রবাসে ছিলাম। এখন দেশে আশার পর নিজের ১০০ শতাংশ জমিতে দুই হাজার ড্রাগন ফলের চারা রোপন করেছি। এ পর্যন্ত বাগানের খরচ বাবদ দশ লক্ষ্য টাকা খরচ হয়েছে। এই বছর আশাকরি ফল বিক্রি করলে খরচের চালান সহ লাভবান হবো। বাজারে ২৫০ টাকা দরে পাইকারী ড্রাগন ফল বিক্রি করি। গত দুই বছরে প্রায় আড়াই লক্ষ্য টাকার মতো ড্রাগন ফল বিক্রি করেছি। পাশাপাশি মাল্টা, বরই, কলা ও পেপে বাগান করেছি। এ বছর প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকার মতো পেঁপে বিক্রি করেছি। আমি কৃষির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছি। প্রবাসে থেকে আসার পর কৃষি কাজ করে অবসর সময়গুলো কৃষি কাজে পার করছি।
দাড়িয়াপুর ইউনিয়নের বংকী গ্রামের ড্রাগন ফল চাষী সাইদুল ইসলাম স্বপন মিয়া বলেন, লেখাপড়ার পাশাপাশি আমি ২০১৫ সাল থেকে কৃষির সাথে সম্পৃক্ত আছি। সম্প্রতি দাড়িয়াপুরের দেওবাড়ী নেদারচালায় এলাকায় প্রায় সাড়ে ৪ একর জমি বর্গা নিয়ে প্রায় পনের হাজার ড্রাগন ফল গাছের চারা রোপন করেছি। পাশাপাশি এলাকার বিভিন্ন জায়গায় আমার সবরি কলা, চিনি চম্পা কলা ও সাগর কলার বাগান রয়েছে। প্রায় চল্লিশ হাজারের মতো কলা গাছও রয়েছে কলা বাগানে। আমি কৃষির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে স্বাবলম্বী হয়েছি। আগামী দিনগুলোতে আমি কৃষি কাজের সাথেই সম্পৃক্ত থাকতে চাই। ড্রাগন বাগান যে বিনিয়োগ করেছি আশা করি বাগান থেকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারবো।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নিয়ন্তা বর্মন বলেন, ড্রাগন অত্যন্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ একটি ফল। সখীপুর উপজেলার মাটি প্রকৃতি ড্রাগন ফল চাষের উপযোগী হওয়ায় অন্যান্য ফল বাগানের পাশাপাশি কৃষকরা উচ্চ মূল্যের ফসল হিসেবে ড্রাগন চাষ করছে। উপজেলার প্রায় পাঁচ হেক্টর জমিতে ড্রাগন ফলের চাষ করছে ড্রাগন ফল চাষীরা। এতে করে কৃষকরা যেমন অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছলতা অর্জন করছে তেমনি আমাদের দেহের (মানব শরীরের) পুষ্টির অভাবও পূরণ হচ্ছে।
-বাবু/শোভা