
X
চা শ্রমিকদের মুখের দৃশ্য বলে দেয় তাদের কষ্টের জীবনের কথা। তাদের দৈহিক গড়নে অপুষ্টিতার আঘাত সহজেই চোখে পড়ে। দৈনিক ১২০ টাকার মজুরিতে দৈহিক গঠনের চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে? অনেকটা সময় পেরিয়ে কেমন পরিস্থিতি হলে তারা মাত্র ৩০০ টাকার জন্য সংগ্রামে নামতে পারে। দেশের চা মোড়লরা বিত্তবৈভব এর মালিক হলেন যাদের রক্তঘামে সেই চা শ্রমিকরা কী পেলেন?
এ অবস্থায় গত ৯ আগস্ট থেকে দেশের ২৪১টি চা বাগানে এই ধর্মঘট শুরু হয়। দেড় লাখের বেশি শ্রমিক চা পাতা তোলার কাজ থেকে বিরত আছেন। গত বুধবার শ্রমিক-মালিক ও শ্রম অধিদপ্তরের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকেও সমাধান না আসায় গত বৃহস্পতিবার শ্রমিকেরা তাদের ধর্মট চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। তাদের টানা আন্দোলনে স্থবির হয়ে পড়েছে চা শিল্প। তাদের দাবি, দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা করতে হবে। আন্দোলনের কারণে ভরা মৌসুমে বেকায়দায় পড়েছেন বাগান কর্তৃপক্ষ।
জানা যায়, প্রতি দুই বছর পর পর তাদের মজুরি বাড়ানোর কথা থাকলেও ২০১৮ সালের পর আর মজুরি বাড়ানো হয়নি। মজুরির বাইরে শ্রমিকেরা সপ্তাহে তিন কেজি আটা পান, দুই টাকা কেজি দরে। এছাড়া তাদের চিকিৎসা ও আবাসন সুবিধা দেয়ার কথা। একই সঙ্গে সন্তানদের শিক্ষা সুবিধা থাকার কথা। তাহলে চা শ্রমিকদের ৩০০ টাকা মজুরি দাবি কি অযৌক্তিক?
২০২১ সালের হিসেব অনুযায়ী, দেশের চায়ের বাজার মূল্য প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা। এখান থেকে এক শতাংশ অর্থ শ্রমিকদের বেতন ভাতা বৃদ্ধির জন্য ব্যয় করা হলে চলমান এই আন্দোলনের সমস্যার সমাধান হবে জানিয়েছে এ খাতের বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের (সিলেট ভ্যালি শাখা) সভাপতি রাজু গোয়ালা বলেন, আমাদের পাশের দেশ ভারতে মজুরি কোনো জায়গায় ২৪০ রুপি আবার কোথাও ২০৩ রুপি। শ্রীলঙ্কায় ৩৫০ রুপির মতো দেয়া হয়। আমাদের দেশে এই বৈষম্য কেন?
ওই একই এলাকার কালিটি চা বাগানের শ্রমিক দয়াল আমলিক বলেন,“আমরা মাছ মাংস বছরে এক-দুইবার খেতে পারি কোনো উৎসবের সময়। আর সারা বছর ঘরের পাশে লাগানো শাক সবজি দিয়ে চালিয়ে নিই। আর সব বেলায় খেতে পাই না।”
এক পর্যায়ে তিনি বাকরুদ্ধ কন্ঠে বলেন, বিশ্বাস করুন আমরা না খেয়ে থাকি। আমাদের সন্তানদের পড়াশুনা করাতে পারি না। এনজিওর যে স্কুল এখানে আছে তাতে পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়ানো হয় না। আমাদের ঘর চালা ফুটো হয়ে পানি পড়ে। পাঁচটি টিন লাগলে দেয় একটি। আমরা মানবেতর জীবনযাপন করছি।
চা শ্রমিকদের সন্তানরা যেন চা শ্রমিক হওয়ার জন্যই বড় হয়। তাদের জীবনে আর কোনো স্বপ্ন দেখার সুযোগ নেই। যদি একজনকে পড়াশুনা করাতে হয় তাহলে অন্য সন্তানদের আর পড়ালেখা করানো যায় না। তারপরও ভাগ্যবানদের একজন শমসেরনগর চা বাগানের যুবক অঞ্জন দাস।
চা শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেণ পাল জানান, চা বাগানগুলোতে স্থায়ী শ্রমিক আছে এক লাখ। আর অস্থায়ী আছে ৫০ হাজার। তাদের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা প্রায় আট লাখ। তিনি বলেন,“আমাদের দাবি ২০টি। মূল দাবি হলো মজুরি দিনে ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করতে হবে। এটা পূরণ হলেই আমরা কাজে ফিরে যাব।
মালিক এবং শ্রম অধিদপ্তর আগামি ২৩ আগস্ট শ্রমিকদের সঙ্গে আবার বৈঠকে বসবেন। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে তাদের ধর্মঘট প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। চা সংসদের সিলেট ব্রাঞ্চের চেয়ারম্যান জি এম শিবলি বলেন, আমরা এখনো কোনো বেতন বাড়াতে রাজি হয়নি। তারা যে ৩০০ টাকা মজুরি চাইছেন সুযোগ সুবিধা মিলিয়ে তার চেয়ে বেশি দিচ্ছি। তাদের সাথে আরো আলোচনা হবে।” চা সংসদ দাবি করেছে ২০১২ সাল থেকে ১০ বছরে চায়ের নিলাম মূল্যের প্রবৃদ্ধি প্রতি বছর ০.১৬ শতাংশ হারে বাড়লেও চা-শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানো হয়েছ মোট ৯৪.২০ শতাংশ।
বাগানে নানা শ্রেণির শ্রমিক রয়েছে। কিছু শ্রমিক স্থায়ী। স্থায়ী শ্রমিকদের তিনটি ক্যাটাগরি। ‘এ’ ক্যাটাগরির শ্রমিকরাই ১২০ টাকা দৈনিক বেতন পান। `বি’ ও `সি’ ক্যাটাগরির শ্রমিকদের বেতন আরও কম। আর প্রতিটি বাগানে স্থায়ী শ্রমিকের অর্ধেক অস্থায়ী শ্রমিক থাকেন। তাদের বেতন আরও অনেক কম। তাদের জন্য নেই উৎসব ভাতা ও রেশন।
শ্রমিকদের ৪৭ দিনের মজুরির সমান বোনাস দেয়া হয়। যার টাকার পরিমাণ পাঁচ হাজার ২৪০ টাকা। এর ৬০ ভাগ দেয়া হয় দুর্গাপূজায় এবং ৪০ ভাগ দেয়া হয় ফাগুয়া উৎসবে। এ ছাড়া সপ্তাহে প্রতিটি শ্রমিককে একবার দেয়া হয় দুই টাকা কেজি দরে সাড়ে তিন কেজি আটা। নিজেদের ভবিষ্যৎ তহবিলে জন্য বেতনের সাড়ে সাত ভাগ রাখতে হয়। প্রতি মাসে ১৫ টাকা চা শ্রমিক ইউনিয়নে চাঁদা দিতে হয়।
চা শ্রমিকদের আন্দোলনের ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশি চা সংসদের সিলেট ব্রাঞ্চ চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ শিবলী বলেন, সমঝোতা চুক্তির মধ্যে কর্মবিরতি ও আন্দোলনে যাওয়া সম্পূর্ণ অনৈতিক। এরই মধ্যে শ্রমিকদের বিষয়গুলো নিয়ে ১৩টি বৈঠক হয়েছে। ফলপ্রসূ আলোচনাও হয়েছে। তাদের বোনাস বৃদ্ধি, গামছা ও টুকরি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি। বর্ধিত মজুরিরও একটি প্রস্তাবনা আমরা দিয়েছি। এই শিল্পকে তো টিকিয়ে রাখতে হবে। গত ১০ বছর ধরে চা পাতার মূল্য বাড়েনি। কিন্তু ১০ বছরে চা শ্রমিকদের বেতন কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে।
-বাবু/শোভা