
X
নেত্রকোনায় অবৈধ কারেন্ট ও বেড় জালে সব ধরনের ছোট মাছ, পোনা, রেণু ও জলজ প্রাণী ধ্বংস হচ্ছে। তাই এই অবৈধ কারেন্ট ও বেড় জালের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে সরকার।
প্রতিদিন রাত হলেই নিষিদ্ধ এই কারেন্ট ও‘বেড় জাল’ দিয়ে নেত্রকোনার বিভিন্ন হাওরের বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয় মাছ ধরা। নৌকায় জাল নিয়ে জেলেরা মাছ ধরতে নামেন। এই জালে মাছের ডিম, রেণু পোনাসহ সব জলজ প্রাণী উঠে আসে। এতে হাওরে মাছের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে ও অনেক প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হচ্ছে। পাশাপাশি এই অবৈধ জাল ব্যবহার করায় ধ্বংস হচ্ছে শামুক, ঝিনুক, জলজ পোকাসহ সব প্রকার জলজ প্রাণী, উদ্ভিদ ও হাওরের প্রতিবেশ।
জেলা মৎস্য বিভাগ,ও জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলার সকল হাওর মিলে আয়তন হবে প্রায় ৩০ হাজার হেক্টর জমি। এই হাওর গুলো জেলার বিভিন্ন এলাকা নিয়ে বিস্তৃত। নেত্রকোনা জেলায় বেশির ভাগ হাওর পরেছে খালিয়াজুরী, মোহনগঞ্জ,মদন,বারহাট্টা, কলমাকান্দা ও পূর্বধলায়।
মিঠাপানির বৃহত্তর এই হাওর গুলো একসময় দেশীয় বিভিন্ন ধরনের মাছসহ জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদে সমৃদ্ধ ছিল। হাওর ভরাট ও অবাধে জলজ সম্পদ আহরণের কারণে হাওর গুলো আর আগের সেই সমৃদ্ধ অবস্থায় নেই। জেলার সকল হাওর এখন প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা। এদিকে এবার অকাল বন্যার ভাসান পানিতে হাওর থেকে বিলুপ্ত হওয়ার উপক্রম, এমন অনেক মাছের দেখা মিলছে। বিগত কয়েক বছরের মধ্যে এবার মাছের সহজলভ্যতার কারণে জেলেরাও খুশি।
এ পরিস্থিতিতে একসঙ্গে সহজে বেশি মাছ ধরতে গিয়ে ব্যবহার করছেন নিষিদ্ধ অবৈধ কারেন্ট ও বেড় জাল বা কোনা বেড় জাল, কারেন্ট চায়না জাল ইত্যাদি। এসব অবৈধ জাল ব্যবহারকারীরা দিনের বেলা মাছ ধরতে হাওরে নামেন না। সন্ধ্যার পর হাওরের বিভিন্ন প্রান্ত দিয়ে হাওরে মাছ ধরতে নামেন। সারা রাত মাছ ধরেন। বিশাল একেকটি বেড় জালের সঙ্গে অনেক জেলে যুক্ত থাকেন। তাঁরা হাওরের অভয়াশ্রমেও অবৈধভাবে মাছ ধরেন।
এই অবৈধ কারেন্ট, চায়না ও বেড় জালের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। এই জালে বড় মাছের পাশাপাশি মাছের ডিম, পোনা, রেণু, ছোট পোনা মাছ, শামুক, ঝিনুক, পোকাসহ সব ধরনের জলজ প্রাণী, শাপলা, শালুক, শেওলাসহ জলজ উদ্ভিদ উঠে আসে। এতে মাছের প্রজনন ও উৎপাদন দুটোই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যেসব মাছ হাওরে ফিরে আসতে দেখা যাচ্ছে, সেগুলোও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জেলার সকল হাওরে দিন দিন মাছের উৎপাদন কমছে। অন্যান্য জলজ প্রাণীও ধ্বংস হয়ে হাওরের প্রতিবেশ নষ্ট হচ্ছে।
হাওরে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে মাছ ধরা বন্ধ করার জন্য বিভিন্ন সময় পুলিশের সহযোগিতায় জেলার সকল উপজেলার স্থানীয় প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগ অভিযান পরিচালনা করে। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল ও নৌযান–সংকটের কারণে মৎস্য বিভাগের পক্ষে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয় না।
বৃহস্পতিবার (১ সেপ্টেম্বর)বারহাট্টা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো.তানভীর আহমেদ বলেন, দেশি প্রজাতির মাছসহ অভয়াশ্রম রক্ষা, বিলুপ্ত প্রজাতির মাছ পুনরায় হাওর,খাল, ও বিলে ফিরিয়ে আনতে আমরা সবসময়ই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করি, অবৈধ জাল ব্যবহার বন্ধ করা গেলে, যেসব প্রজাতির মাছ আগে পাওয়া যেত, সেগুলো আবার পাওয়া যাবে।
জেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, মৎস্য আইনে নিষিদ্ধ অবৈধ কারেন্ট, চায়না ও বেড় জাল ব্যবহারে সর্বনিম্ন এক বছর ও সর্বোচ্চ তিন বছর জেল এবং সর্বনিম্ন পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান আছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন সময় জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ ও পুলিশ যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে নৌকাসহ বেড় জাল জব্দ করে তা প্রকাশ্যে পোড়ানো হয়। প্রতিটি বেড় জালের দৈর্ঘ্য প্রায় তিন হাজার হাত। এক একটি বেড় জালের আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ১০ লাখ টাকা। এক একটি বেড় জালের জন্য ১৮-২০ জন জেলে প্রয়োজন হয়।
হাওরের মাছ রক্ষায় বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করা হয়।
মৎস্য সম্পদ রক্ষায় আর কি ভূমিকা রয়েছে বলে জানতে চাইলে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ শাহজাহান কবির বলেন, আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। বিভিন্ন সময় জেলার বিভিন্ন উপজেলায় অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। আশা করছি, এতে সবাই সতর্ক হবে। আমাদের অভিযান ও নজরদারি আরও অব্যাহত থাকবে।
এবিষয়ে জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিস বলেন, মৎস্য সম্পদ রক্ষায় আমাদের সকল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময় জেলার বিভিন্ন হাওড়ে অভিযান পরিচালনা করছে এবং আমাদের এই অভিযান মৎস্য সম্পদ রক্ষায় অব্যাহত থাকবে।
-বাবু/এ.এস