
X
ময়মনসিংহ শহর থেকে ২৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ত্রিশাল উপজেলার রামপুর ইউনিয়নে বিশাল চেচুয়া বিল যা বর্তমানে শাপলা বিল নামেই পরিচিত। প্রায় ৫০ একরের এই চেচুয়া বিলের লাল শাপলার সৌন্দর্য্য উপভোগের জন্য প্রতিদিন ভিড় করছে দর্শনার্থীরা। এতে নৌকায় দর্শনার্থী ঘুরিয়ে আয়-রোজগার করছে স্থানীয়রা ।
ত্রিশালের এ শাপলার বিল প্রকৃতির অপরূপ রূপে সেজেছে। বিলের চারদিকে সবুজ আর মাঝখানে এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত লাল শাপলায় ঘেরা। এ যেন জাতীয় পতাকার প্রাকৃতিক রুপ। বিলের মাঝে লাল গালিচায় উপভোগ্য এক মনমুগ্ধকর পরিবেশ।
শাপলা বিলকে ঘিরে দর্শনার্থীদের ঘুরার জন্য ১৩টি নৌকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন স্থানীয়রা। আবার বিলের মধ্যে বিশ্রামের জন্য বানিয়েছেন ঘর। ঘুরে দেখার জন্য রয়েছে নৌকা। তবে কিছুদিন ধরে এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। জানা গেছে, এই বিলকে ঘিরে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেছে স্থানীয়রা। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নৌকায় একজনের ২০ মিনিট ঘুরার জন্য গোনতে হচ্ছে ৫০ টাকা। আবার নৌকা এক ঘন্টার জন্য ৪ জন ভাড়া করলে জোরপূর্বক ভাবে হাতিয়ে নিচ্ছে ৪০০ শত টাকা। এ বিলের মাঝেখানে বিশ্রামের জন্য একটি ঘর বানানো হয়েছে। ঘরের সামনে একটি ব্যানার টাঙানো রয়েছে। ব্যানারে স্পষ্টভাবে লেখা আছে কত মিনিট থেকে কত মিনিট থাকলে কত টাকা দিতে হবে। সেখানে প্রবেশ করলে ৫/১০ মিনিটেই হাতিয়ে নিচ্ছে ২০ টাকা। সচেতন মহল মনে করেন,তাহলে এখানে প্রশ্ন থেকে গেল যে সেখানে অসামাজিক কার্যকলাপ হয় কী না?
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে দর্শনার্থী ফয়সাল, আব্দুল্লাহ, আসিফ জনপ্রিয় স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন ত্রিশাল হেল্পলাইনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রিয়াদ জানান, আমাদের ত্রিশালে শাপলা ফুলের সৌন্দর্যের জন্য আরেক নাম চেচুয়া বিল। বর্তমানে বিভিন্ন জেলা, উপজেলা থেকে টুরিস্ট গ্রুপ হয়ে এই সৌন্দর্য দেখতে আসছে এই চেচুয়া বিলে। তবে কিছু অসাধু নৌকাওলা বা মাঝি তারা মিলে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেছে। এবং এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তারা বিভিন্নভাবে পর্যটকদের কাছ থেকে ২০ মিনিট নৌকা দিয়ে বিলের মাঝখানে নিয়ে যাবে আবার নিয়ে আসবে ভাড়া ৫০ টাকা করে জোরপূর্বক হাতিয়ে নিচ্ছে ।
২০১৮ সালে চেচুয়া বিল নিয়ে সারাদেশে গুজব ছড়িয়ে পরে। বিলের পানি ও মাটিতে সর্ব রোগের ঔষধ হিসেবে চারদিকে ছড়িয়ে পরলে এ বিল পরিচিত হয় গুজবের বিল নামে। সর্ব রোগের ওষুধ জেনে হাজারও লোকের ভীর জমেছিল যে বিলে সে বিলেই দেখা মিলে রক্তিম লাল শাপলা। এ বিলে লাল, সাদা, হলুদ, বেগুনী রংয়ের লাখো শাপলা দেখতে সূর্য উদয় থেকে শুরু করে সুর্যাস্ত পর্যন্ত মানুষের ঢল নামে। চেচুয়া বিল এখন লাল শাপলার বিল। বিলকে ঘিরে ভ্রমণ পিপাশুদের আনাগোনা,আনন্দ-উল্লাস ও মানুষের ঢলের জন্য অঘোষিত পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। এ বিলের শাপলা ফুল সহজে উপভোগ করার জন্য স্থানীয়রা হরেক রকম সৌন্দর্যে নৌকা তৈরী করেছেন। যে কেউ আসলে একবার হলেও বিলের শাপলা অবলোকন করতে মন নাড়া দিবেই।
সাধারন মানুষ থেকে শুরু করে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারী আনন্দ মোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ শাপলা বিলের সুন্দর্য দেখতে ভিড় জমান। সাথে ভাসমান কচু ফুলের সাদা আভা সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুন। ময়মনসিংহ শহর থেকে ঘুড়তে আসা কুয়াশা-মৌ দম্পত্তি জানান, আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও অনেকের কাছে শুনে শাপলার সুন্দর্য দেখতে আসছি। নৌকা দিয়ে পুরো বিলটা ঘুরে দেখে অনেক আনন্দ লাগছে। বাচ্চারাও বায়না ধরেছিল এখানে এসে কাছ থেকে শাপলার সুন্দর্য উপভোগ করতে পেরেছি। এ এলাকাটিকে পর্যটন এলাকা হিসাবে ঘোষনা করা যেতে পারে। সারাদেশের মানুষ এ বিলকে চিনেছে একটি অলৌকিক ঘটনার গুজবকে কেন্দ্র করে। একদিন রাত পেরিয়ে সকাল হতেই কিছু লোক দেখতে পায় সেখানে থাকা জমাট বাধা কচু হঠাৎ সরে গিয়ে অনেকটা জায়গা ফাঁকা হয়েছে। এটাকে অলৌকিক ভেবে কয়েকজন এখানে গোসল করে ও এর পানি খেয়ে রোগ থেকে মুক্ত হয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশের হাজার হাজার মানুষ এই কাঁদা মাখা পথ পেরিয়ে কাঁদা মাখা পানিতে গোসল, গড়াগড়ি ও কাদাযুক্ত পানি সংগ্রহ করতে ভীর করতে থাকে।
এমন গুজবও ছড়ানো হয়েছিল বিলের পানিতে এক ডুবেই সেরে যাবে যেকোনো রোগ। এখানকার মাটি ও পানি নাকি সর্বরোগের ওষুধ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো গুজবে হাজারো মানুষের তথাকথিত তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছিল এ চেচুয়া বিল। ঐসময় উপজেলা প্রশাসন, কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয়ে চেচুয়া বিলের পানি, মাটি, কচুরিপানা ব্যবহার না করার জন্য প্রথমে মাইকে আহ্বান জানান। বিলটিতে যেন সারা বছর শাপলা ফুল থাকে তার সৌন্দর্য রক্ষায় বিলে ফুল তুলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এতে সারা বছর মানুষ শাপলা সুন্দর্য উপভোগ করতে পারবে। পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে স্থান করে নিবে। দর্শনার্থীদের নিয়মানুবর্তিতায় হয়ত এভাবেই প্রতি বছর বিলটি হয়ে উঠবে একটি সৌন্দর্যপূর্ণ স্থান হিসেবে, যা ত্রিশাল উপজেলার নতুন দর্শনীয় স্থানের সূচনা করবে। ফুলের বাহারি সুন্দর্য় দেখতে হলে ছুটে আসুন ত্রিশালে।
বাবু/জাহিদ