প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ৪:০৪ পিএম (ভিজিট : ৫৪৫)

X
দেশব্যাপী যথাযোগ্য শ্রদ্ধা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে ১ অক্টোবর থেকে পাঁচ দিনব্যাপী শুরু হবে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। এ বছর পিরোজপুর জেলার ৫৭৮টি মণ্ডপে উদযাপিত হচ্ছে শারদীয় দুর্গাপূজা। জেলার মন্দিরগুলো সেজেছে দারুন আলোকসজ্জ্বায়। তবে বরিশাল বিভাগে সর্ববৃহত দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার কবুতরখালী গ্রামের রাজ মন্দিরে। এই পূজাকে ঘিয়ে মানুষের মধ্যে থাকে নানান কৌতুহল।
মঠবাড়িয়া উপজেলা সদর থেকে তিন কিলো মিটার দুরে কবুতরখালী গ্রামের হালদার বাড়ির রাজমন্দিরের গিয়ে দেখা গেছে, এ বাড়ির রাজমন্দিরের আশপাশ এক একর জমিজুড়ে জুড়ে পৃথক ৫৫টি মন্দিরে সর্ব মোট ২৫৫টি নানা দেবদেবির প্রতিমা নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে ষষ্ঠী পূজা দিয়ে দুর্গাপূজা শুরু হয়ে উৎসব চলবে টানা পাঁচদিন। সেই সাথে এখানে মেলার আয়োজন চলছে। প্রতিবছরের মতো দেশের দুর দুরান্ত থেকে রাজ মন্দিরের এ পূজা দর্শনে সমবেত হয় কয়েক লাখ মানুষ। প্রতি বছর মন্দিরটিতে সাড়ে ৩০০ প্রতিমায় সাজে রাজ মন্দির। তবে এবছর প্রতিমা কমিয়ে ২৫৫টি প্রতিমা নির্মাণ করা হয়েছে। অন্যদিকে থিম আইটেম বাড়ানো হয়েছে। উদ্যোক্তারা দাবি করেছেন দক্ষিণবঙ্গের মধ্যে সব থেকে বড় দুর্গাপূজা এ বছর তারাই আয়োজন করেছেন।
দুর্গাপূজার প্রতিপাদ্য করা হয়েছে “আমার জীবন-আমার অধিকার, বাল্যবিয়ে রুখব এবার”। প্রতি বছরই নারী সমাজকে প্রাধান্য দিয়ে গড়ে তোলা হয় প্রতিমাগুলো।জেলার মঠবাড়ীয়ার রাজবাড়ীর দুর্গাপূজায় প্রতীকী ‘পদ্মা সেতু’ থিম দিয়ে সাজানো হয়েছে মন্দির প্রাঙ্গণ। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর মুরালও তৈরি করা হয়েছে। সেতুটির উপরে রয়েছে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযোদ্ধা কর্নারসহ বঙ্গবন্ধু ও তার কন্যা শেখ হাসিনাকে নিয়ে নানান আয়োজন। জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার গুলিসাখালী ইউনিয়নের কবুতরখালী গ্রামের ‘রাজ মন্দিরে’ এ আয়োজন করেছেন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের (শেবাচিম) সাবেক অর্থপেডিক্স বিশেষজ্ঞ ও বর্তমান বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ডা. সুদীপ কুমার হালদার এবং শেবাচিমের গাইনি বিশেষজ্ঞ ও সার্জন ডা. স্নিগ্ধা চক্রবর্তী।
তাদের সঙ্গে আছেন একঝাঁক তরুণ-তরুণী, যারা এই আয়োজনকে সফল করতে দিনরাত পরিশ্রম করে গেছেন। সরেজমিনে দেখা যায়, মন্দিরের প্রবেশ পথে লেখা রয়েছে ‘রাজ মন্দির’। মন্দিরে প্রবেশের জন্য রয়েছে পাঁচটি গেট। এই রাজমন্দিরের বিশাল আঙিনা জুড়ে তৈরি করা হয়েছে দুর্গোৎসবের প্যান্ডেল। তাতে সারিবদ্ধভাবে নির্মাণ করা হয়েছে ২৫১টি দেব-দেবীর প্রতিমা। এর মাধ্যমে চার হাজার বছরের পুরোনো পৌরাণিক কাহিনীকে তুলে ধরা হয়েছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে সঠিক পথে অগ্রসরের তাগিদ দিতে দেশের গুণীজনদের ছবি ও বিভিন্ন উপদেশমূলক বাণী গ্রাম জুড়ে গাছের সঙ্গে টানানো হয়েছে। তাই প্রতি বছর এই উৎসবকে ঘিরে কবুতরখালীর হালদার বাড়িটি পর্যটন এলাকায় পরিণত হয়।
এ বিষয়ে ডা. সুদীপ হালদার ও স্নিগ্ধা চক্রবত্রী জানান, বাগেরহাট জেলার। মোড়লগঞ্জের পূজা দেখেই নিজ বাড়িতে দুর্গাপূজা করার উৎসাহ পান তারা। এর পর ২০১৬ সালে ৪০ প্রতিমা নিয়ে শুরু করেন পূজা। ‘সাতক্ষীরার মৃৎশিল্পীর হাত দিয়েই ৪০ প্রতিমা নিয়ে পূজা শুরু। পরে ৩৩৩টি প্রতিমা পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছে। তবে এ বছর দেশের প্রেক্ষাপট ভালো না থাকায় প্রতিমার সংখ্যা কমিয়েছি। লক্ষ-লক্ষ মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয় এই উৎসব অঙ্গন। যার হিসাব রাখা বড় কঠিন। দুর্গাপূজাকে সব ধর্মের মিলনক্ষেত্র এবং সমাজের ইতিবাচক বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করছি। সেভাবেই মন্দির প্রাঙ্গন সাজানো হয়েছে। এবছর ২৫১টি প্রতিমা এবং ৪০টি মন্দির এখানে নির্মাণ করা হয়েছে। এই আয়োজন উপভোগ করতে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সবাইকে আমন্ত্রণ জানান ডা. দম্পত্তি। চিকিৎসক স্নিগ্ধা চক্রবর্তী জানান, প্রতীমার কারিগররা তাদের হাতের নিপুণ ছোঁয়া আর রং-তুলির আঁচড়ে অপরূপ সাজে সাজিয়েছেন প্রতিমাগুলো। খুলনা চারুকলা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃৎশিল্পে প্রশিক্ষণ পাওয়া সাতক্ষীরা জেলার প্রতিমা নির্মাণ শিল্পী শংকর মণ্ডলের হাতে সমস্ত প্রতিমা নির্মাণ করা হয়েছে।
প্রতিমা নির্মাণ শিল্পী শংকর মণ্ডল বলেন, ‘চার-পাঁচ মাসের প্ররিশ্রম শেষে প্রতিমা নির্মাণ কাজ শেষ করেছি। এত বড় আয়োজন আমার জানা মতে বাংলাদেশে আর কোথাও হচ্ছে না। বড় একটি আয়োজনের সঙ্গে থাকতে পারার আনন্দ বলে বোঝানো সম্ভব নয়।’ হালদার বাড়ির দুর্গাপূজা উদযাপনের প্রধান আয়োজক অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শ্রী শৈলেশ্বর হালদার বলেন, বর্তমানে এ অঞ্চলে বৃহৎ দুর্গা মণ্ডপে রূপ নিয়েছে। এলাকার লোক এভাবে ধর্মীয় সংস্কৃতি উপভোগ করার সুযোগ কম পান। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে নারী-পুরুষসহ সকল মানুষ এখানে পূজা উপভোগ করতে সমবেত হবেন।
মঠবাড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূরুল ইসলাম বাদল বলেন, ‘মন্দিরে সার্বিক নিরাপত্তা প্রদানের জন্য নির্ধারিত টহল পুলিশ, আনসার ও স্বেচ্ছাসেবকসহ অনান্য বিভাগের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে। ইতোমধ্যে মন্দিরে সিসি ক্যামেরা স্থাপনসহ পুলিশ পাহারা দেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান বলেন, জেলার সকল পুজা মন্দিরে শান্তিপূর্ণভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবে চেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব উদযাপনের জন্য জেলা প্রশাসন সব ধরনের সহযোগিতা করছে। পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ সাইদুর রহমান বলেন, দুর্গাপূজা উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপনের জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমন্বিতভাবে দায়িত্বপালন করছে।
বাবু/জাহিদ