রাষ্ট্রীয় কাজের কথা বলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেন কুবির প্রো-ভিসি

কুবি প্রতিনিধি

সারাবাংলা

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির সপ্তাহের বুধবার এলেই রাষ্ট্রীয় কাজের কথা বলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে

2022-10-28T22:53:10+00:00
2022-10-28T22:53:10+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
রাষ্ট্রীয় কাজের কথা বলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেন কুবির প্রো-ভিসি
কুবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২২, ১০:৫৩ পিএম   (ভিজিট : ২১৯)
X


কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির সপ্তাহের বুধবার এলেই রাষ্ট্রীয় কাজের কথা বলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৌখিক ছুটি নেন। দুপুরের পর কুবির গাড়িতে চড়ে চলে যান ঢাকায়। সেই ছুটি অব্যাহত থাকে পরের দিন বৃহস্পতিবার পর্যন্ত। কিন্তু, রাষ্ট্রীয় কাজের কথা বললেও  এই সময়ে ঢাকা গিয়ে আদতে তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিয়ে থাকেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

চলতি বছরের ১৭ মে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির নতুন কাউন্সিলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি মো. হুমায়ুন কবির। এরপর থেকে একই প্রক্রিয়ায়, তিনি প্রতি সপ্তাহের বুধবার দুপুরের পর উপাচার্যের কাছে এশিয়াটিক সোসাইটির কাজের কথা বলে বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকেন না। কুবির গাড়ি নিয়ে ঢাকায় যান।

এ সময় তিনি ঢাকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে হিস্ট্রি এন্ড ফিলোসোফি বিভাগে খণ্ডকালীন ক্লাস নিয়ে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যার সত্যতা পাওয়া গেছে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে ও ক্লাস রুটিনে। তিনি  নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে উল্লিখিত বিভাগে ইসলামিক হিস্ট্রি (এইচআইএস-১০৩ ও ২০৩ ) কোর্সের ক্লাস নিয়ে থাকেন। রুটিন অনুযায়ী তিনি বৃহস্পতিবার ও শনিবার এইচআইএস -১০৩ কোর্সের ক্লাস ৮ টা থেকে ৯:৩০ পর্যন্ত নিয়ে থাকেন এবং এইচআইএস-২০৩ কোর্সের ক্লাস ৯:৪০ থেকে ১১:১০ পর্যন্ত ক্লাস নিয়ে থাকেন।

এশিয়াটিক সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান এ ব্যাপারে বলেন, “মিটিংয়ে কোন নির্দিষ্ট তারিখ নেই। অফিস পাঁচদিন খোলা থাকে।  যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হয়তো নিজের সুবিধা মতো এই বার ঠিক করে নিয়েছেন।”

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক তথ্যমতে, গত বৃহস্পতিবার (১৩ অক্টোবর) গুচ্ছ পদ্ধতির ভর্তি পরীক্ষার কেন্দ্রীয় কমিটির সভা, ২০ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) একটি আপগ্রেডেশন বোর্ডে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন না অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির। সর্বশেষ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই হলে অবস্থান করা ছাত্রলীগ কর্মীদের মারামারির ঘটনায় ডাকা জরুরি সভায়ও তিনি উপস্থিত ছিলেন না।  এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এফ এম আবদুল মঈন তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার দিকটা দেখতে বললেও তাকে কখনো একাডেমিক ভবনগুলোতে বা কোনো বিভাগে খোঁজখবর নিতে দেখা যায়নি।

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের অনলাইন ডে। সকল ক্লাস ও কার্যক্রম অনলাইনে হওয়ার কথা। আমি যা করি রাষ্ট্রীয় কাজই করি।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধ্যাপক পদমর্যাদার এক শিক্ষক বলেন, “বিভিন্ন কাজের অজুহাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ঢাকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেন। উপ-উপাচার্যের এমন ক্লাস নেয়ার নজির আর কোথাও শুনিনি। এভাবে ঘুরে ঘুরে বাইরে ক্লাস নিতে থাকলে তার উপর দেয়া দায়িত্ব তিনি কীভাবে পালন করবেন সেটা নিয়েই প্রশ্ন উঠে।”

খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, প্রতি সপ্তাহের বুধবার লাঞ্চের পর থেকে পরের সপ্তাহের রবিবার ক্যাম্পাসে ফেরত আসা পর্যন্ত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য পদ বরাবর বরাদ্দকৃত গাড়িটি তার সাথেই ঢাকায় অবস্থান করে। এ সময় এ গাড়িটি তিনি ব্যক্তিগত কাজেও ব্যবহার করেন। এ সত্যতা মিলেছে তার বিগত চার মাসে গাড়িতে ব্যবহৃত গ্যাস বা তেল ব্যবহারের পরিমাণের হিসাবে।

প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জুন মাসে ৪৮৭.৯১ ঘনমিটার এলপিজি গ্যাস ও ২৭ লিটার লেগেছে উপ-উপাচার্যের গাড়িতে। যার বাজার মূল্য  ৩৪,০৩৪.৭২ টাকা। এরপরের মাসে অর্থাৎ জুলাই মাসে ২৫৫.৯২ ঘনমিটার এলপিজি গ্যাস ও ২৭ লিটার অকটেন লেগেছে। যার বাজার মূল্য  ১৭,৩৭০.৮৩ টাকা। আগস্ট মাসে ৩৭৭.৬৩ ঘনমিটার এলপিজি ও ২৭ লিটার অকটেন লেগেছে। যার বাজার মূল্য ২৬,৭৪৩.১০ টাকা। সর্বশেষ সেপ্টেম্বর মাসে ২৩২.৪৪ ঘনলিটার এলপিজি গ্যাস ও ২৭ লিটার অকটেন লেগেছে। যার বাজার মূল্য ২০,৪৫২.৫৬ টাকা।

এ ব্যাপারে প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির বলেন, 'সরকারের প্রজ্ঞাপনের বাহিরে কখনো খরচ হয়েছে কি না সেটা আমার জানা নাই। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে বরাদ্দ আমার আছে গড়ে তার চেয়ে বেশী খরচ আমি করেছি তার রেকর্ড নাই।'

সর্বশেষ ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পরিবহন শাখা থেকে প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপন থেকে জানা যায়, সার্বক্ষণিক গাড়ি প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারের সিনিয়র সচিব/ সচিব এবং সচিব পদমর্যাদা সম্পন্ন কর্মকর্তাগণের জন্য সরকার কর্তৃক বরাদ্ধকৃত গাড়ির বিপরীতে জ্বালানি তেল/সিএনজি-এর প্রাপ্যতা সর্বোচ্চ ২০০ লিটার পেক্ট্রোল/অকটেন অথবা ৩৫৮ মিটার ঘনমিটার সিএনজি পুননির্ধারন করা হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং আওতাধীন দপ্তর, সংস্থা ও সব প্রতিষ্ঠান অর্থ বিভাগের চলতি বছরের ২১ জুলাইয়ের পরিপত্র অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে পেট্রোল, অয়েল ও লুব্রিকেন্ট, গ্যাস ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ ব্যয় করতে পারবে এবং ২০ শতাংশ সাশ্রয় করতে হবে বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে। সে হিসেবে তিনি প্রতি মাসেই অতিরিক্ত গ্যাস ও তেল ব্যবহার করছেন।

২০২০ সালের আগস্ট মাসে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের  তৎকালীন রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মো. আবু তাহের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত কোন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিরেকে অন্যকোন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিগতভাবে কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা বা কোন ধরনের লাভজনক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকতে পারবেন না। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিরেকে কেউ জড়িত থাকলে তা চাকুরি বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হবে।
 
এ ব্যাপারে প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির বলেন, 'আমি যা করি তা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি নিয়েই করি।'

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি কমিশনের  সদস্য দিল আফরোজ বেগম বলেন, আইনগত ভাবে নেয়ার কথা না। উনি নিতে পারেন যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো নীতিমালা থাকে সেই নীতিমালা মেনে। তবে ইউজিসি থেকে নির্দেশনা হলো  প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর ফলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যেন কোনো ক্ষতি না হয়।

জ্বালানী বিষয়ে তিনি বলেন, বেশী ব্যবহার করলে তাকে পেমেন্ট ব্যক্তিগত ভাবে দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ তখনই দিবে যখন সে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে ব্যয় করবে। তবে,  ব্যক্তিগত কাজে কখনো গাড়ি ব্যবহার করা যাবে না এটি আইনে আছে।

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এফ এম আবদুল মঈন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় পাঁচদিনই থাকে খোলা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কাজে যারা আছেন তারা তো ২৪ ঘন্টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে জড়িত থাকে। 
 আমার কাছ থেকে এমন কোন ছুটি নেননি। তবে তিনি (প্রো-ভিসি) মাঝেমাঝে বলে চলে যান। কিন্তু ছুটি নেননি। প্রশাসনের কেউ যদি কোনো কাজ করে বা কোথাও যায় তাহলে তাকে লিখিত অনুমতির দরকার হয়। কিন্তু, উনার লিখিত কোনো অনুমতি আমার কাছ থেকে নেয়নি।

উপ-উপাচার্যের ক্লাস নেয়ার ব্যাপারে কুবি উপাচার্য বলেন, ক্লাস নেয়ার ব্যাপারে, আমি অবগত না। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাহিরে মানুষ ক্লাস নিতে পারেন, যদি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি থাকে। কিন্তু আমি অবগত না। আমাকে কোনো কিছু জানানো হয়নি, লিখিত কোনো অনুমতিও নেই।

অতিরিক্ত জ্বালানি খরচের ব্যাপারে উপাচার্য আরো বলেন, জ্বালানির ব্যাপারে সরকারের একটি সীমাবদ্ধতা দেয়া আছে।সেটা আমরা চেষ্টা করছি সেভিং এ আনার জন্য। আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ যেন অপচয় না হয়। দ্বায়িত্ব পালন করার জন্য আমরা  সেটা আমরা ব্যবহার করতে পারি, ব্যক্তিগত কাজে না।  ব্যক্তিগত কাজে প্রতিষ্ঠানের গাড়ি ব্যবহার করা উচিত না।

-বাবু/এ.এস






Loading...
Loading...


সারাবাংলা এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy