যশোরে চলছে খেজুরের রস আহরণের প্রস্তুতি

শহিদ জয়, যশোর

সারাবাংলা

শীতের আমেজের সাথে সাথে শুরু হয়েছে খেজুর গুড়ের রাজধানী খ্যাত যশোরে রস আহরণের প্রস্তুতি। ইতোমধ্যেই খেজুর গাছ কাটা

2024-10-30T20:17:43+00:00
2024-10-30T20:17:43+00:00
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬ ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬
   
যশোরে চলছে খেজুরের রস আহরণের প্রস্তুতি
শহিদ জয়, যশোর
প্রকাশ: বুধবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৪, ৮:১৭ পিএম   (ভিজিট : ২০৫)
X

শীতের আমেজের সাথে সাথে শুরু হয়েছে খেজুর গুড়ের রাজধানী খ্যাত যশোরে রস আহরণের প্রস্তুতি। ইতোমধ্যেই খেজুর গাছ কাটা শুরু করেছেন গাছিরা। 

বিভিন্ন অঞ্চলে এখন গাছিরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন খেজুরের রস আহরণের পূর্ব প্রস্তুতিতে। প্রকৃতির পালাবদলে এখন প্রভাতে শিশির ভেজা ঘাস আর সামান্য কুয়াশার আবরণ জানান দিচ্ছে শীত এসেছে।

কথায় আছে “যশোরের যশ খেজুরের রস” তাই শীতের মৌসুম শুরু হতে না হতেই গাছ থেকে রস আহরণের পূর্ব প্রস্তুতি শুরু হয়েছে যশোর অঞ্চল ঘুরে দেখা যায়। গাছিরা খেজুর গাছ প্রস্তুত করতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। রস সংগ্রহের পূর্ব প্রস্তুতি হিসাবে খেজুর গাছের আগায় তোলা দেওয়ার কাজ চলছে। ধারালো দা (গাছি দা) দিয়ে খেজুর গাছের মাথার সোনালি অংশ বের করা হয়। যাকে যশোরের ভাষায় বলে, গাছ তোলা হয়।

৮ থেকে ১৪ দিন পর নোলন স্থাপনের মাধ্যমে শুরু হবে সুস্বাদু খেজুর রস আহরণের মূল কাজ। তার কিছুদিন পরই গাছে লাগানো হবে মাটির পাতিল। সংগ্রহ করা হবে মিষ্টি স্বাদের খেজুরের রস। তা দিয়ে তৈরি হবে লোভনীয় গুড় ও পাটালি। 

যশোর জেলার বিভিন্ন উপজেলাসহ আশপাশের অঞ্চলগুলোর বেশির ভাগ গ্রামে এখনও চোখে পড়ে খেজুর গাছের বিশাল সমারোহ। জমির আইলে ও পতিত জায়গায় অসংখ্য খেজুর গাছ লাগিয়েছেন এলাকার কৃষকরা। বিশেষ করে সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা মেলে এ দৃশ্য। এছাড়াও  বাঘারপাড়া, অভয়নগর, মণিরামপুর, কেশবপুর, ঝিকরগাছা, চৌগাছা, শার্শা, বেনাপোলসহ বিভিন্ন এলাকার গ্রামজুড়ে রয়েছে বিপুলসংখ্যক খেজুর গাছ। 

অল্পকদিনের মধ্যে চির সবুজের বুকচিরা অপরুপ সৌন্দর্যে সকলের মন মাতিয়ে তুলবে মিষ্টি খেজুর রস ও গুড়ের ঘ্রাণ। কাক ডাকা ভোরে থেকে চলবে রস সংগ্রহ। সন্ধ্যায় চলবে গাছ পরিচর্যার কাজ। চলতি মৌসুমে কিছুটা আগেই যশোরের বিভিন্ন উপজেলার প্রান্তিক গাছিরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ জনপদের গ্রামে গ্রামে সকালের শিশিরের সাথে অনুভূত হচ্ছে মৃদু শীত।

আর মাত্র কয়েক দিন পর রস সংগ্রহ করে রস থেকে গুড় ও পাটালি তৈরি শুরু হবে। চলবে প্রায় ফাল্গুন মাস পর্যন্ত। খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের প্রস্তুতি উপজলার প্রতিটি গ্রামে চোখে পড়ছে। খেজুর রস ও গুড়ের জন্য চৌগছার সুনাম রয়েছে দেশজুড়ে। সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম বাংলার প্রাচীনতম ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ ও গাছি। একদশক আগেও বিভিন্ন এলাকার অধিকাংশ পতিত জমিতে, ক্ষেতের আইলে, ঝোপ-ঝাড়ের পাশে ও রাস্তার দুই ধার দিয়ে ছিল অসংখ্য খেজুর গাছ।

শীত মৌসুমে রস-গুড় উৎপাদন করে প্রায় ৫ থেকে ৬ মাস স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে এ উপজেলার কয়েক শত কৃষক পরিবার। এ থেকে স্থানীয় কৃষক অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হন। পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিকভাবেও লাভবান হয়।

সরেজমিনে দেখা যায় যশোরের চৌগাছা ও বাঘারপাড়ায় খেজুর রস সংগ্রহের জন্য গাছিরা খেজুর গাছ প্রস্তুত কাজে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। এ ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে উঠান বৈঠক, গাছি সমাবেশ, খেজুরের গুড়ের মেলা ও ব্যাপকভাবে খেজুর গাছ রোপণ করা হয়েছে।

কথা হয় চৌগাছা উপজেলার পাতিবিলা ইউনিয়নের নিয়ামতপুর এলাকায় মিজানুর মিয়ার ছেলে গাছি আব্দার রহমান, মসলেম আলীর ছেলে বাবু, মৃত এরশাদ আলীর ছেলে নুর হোসেন নুরো, রমজান আলীর ছেলে নাজিম উদ্দীন ও আমজেদ হোসেনের ছেলে গাছি গেসু মিয়ার সাথে তারা জানান, আগাম খেজুরের গুড় পেতে শীত মৌসুমের শুরুতেই গাছ প্রস্তুত শুরু করেছি। এ বছর ১টি গাছ প্রস্তুত করতে মুজুরি ১শ’ ২০ টাকা। একজন দিনে ১৫/১৬টি গাছ প্রস্তুত করতে পারে।

বাঘারপাড়া গাছি আফজাল হোসেন বলেন, আমাদের কাজ খুব ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা গাছের অনেক ওপরে ওঠে ধারালো দা দিয়ে গাছ চাছি। খালি পায়ে গাছে উঠতে হয়, কখনো কখনো গাছে সাপও থাকে, তাই সতর্ক থাকতে হয় সবসময়। তবে শীত মৌসুমে রস সংগ্রহ করে আমরা বেশ ভালো আয় করতে পারি।তিনি আরো বলেন, আমরা দিনরাত খেটে গাছ থেকে রস সংগ্রহ করি। এই রস থেকে গুড় তৈরি করে বাজারে বিক্রি করি। শীত আসার আগে গাছগুলো ভালো করে প্রস্তুত করতে হয়, যাতে রস বেশি পাওয়া যায়। কষ্ট বেশি কিন্তু যখন গুড় তৈরি হয়, তখন সেই কষ্টের ফলটা দেখতে ভালো লাগে।

চৌগাছা উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের পেটভরা গ্রামের গাছি আব্দার রহমান বলেন, শীতের পুরো মৌসুমে চলে রস, গুড়, পিঠা, পুলি ও পায়েস খাওয়ার মহা উৎসব। শহরে থেকে সকলে গ্রামের বাড়ীতে আসে রস-গুড় খেতে। তবে নতুন করে কেউ আর খেজুর গাছ তোলা-কাটার কাজ করতে চাচ্ছে না। তবে খেজুর গাছ আমাদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সাহিত্য তথা জীবনধারায় মিশে আছে। এই ঐতিহ্যকে যে কোন মূল্যে আমাদের রক্ষা করতে হবে। একটি খেজুর গাছ ১৫ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত রস দেয়। এটাই তার বৈশিষ্ট্য। এছাড়া খেজুর পাতা জ্বালানি কাজেও ব্যবহার হয়ে থাকে। কিন্তু জয়বায়ু পরিবর্তন, কালের বির্বতনসহ বন বিভাগের নজরদারী না থাকায় বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।

এ ব্যাপারে চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুসাব্বির হুসাইন বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলেই খেজুর গাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে। গাছিদের খেজুর গাছ কাটার কাজটি শিল্প আর দক্ষতায় ভরা। ডাল কেটে গাছের শুভ্র বুক বের করার মধ্যে রয়েছে কৌশল, রয়েছে ধৈর্য ও অপেক্ষার পালা। এ জন্য মৌসুমে আসার সাথে সাথে দক্ষ গাছিদের কদর বাড়ে। আমরা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের গাছিদের এ পেশায় টিকে থাকার জন্য প্রশিক্ষণ, উঠান বৈঠক, সমাবেশ করেছি।

চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুস্মিতা সাহা বলেন, যশোরের যশ খেজুরের রস এ আবহমান গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যরক্ষা করতে উপজেলার বিভিন্ন সড়ক ও পতিত জমিতে খেজুর গাছের চারা রোপন করা হয়েছে। খেজুর গুড় ইতঃমধ্যে জি আই পণ্য হসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। এ পেশার সাথে জড়িত গাছিদের নিয়ে সমাবেশ করে তাদেরকে উৎসহ দেওয়া হচ্ছে। এ মৌসুমেও গুড় মেলা করা হবে।





Loading...
Loading...


সারাবাংলা এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy