
X
ছবি: প্রতিনিধি
টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালীর অনেক জায়গা প্লাবিত হয়েছে। এ বন্যায় চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলা।
গত ৫ জুলাই রোববার থেকে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামে বিভিন্ন উপজেলায় সৃষ্ট বন্যার পানি নামতে শুরু করলেও সাড়ে ছয় লাখের বেশি মানুষ এখনো পানিবন্দি হয়ে আছে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।
এ প্রাকৃতিক দুর্যোগে চট্টগ্রাম নগর ও বিভিন্ন উপজেলায় ১১ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়।
চট্টগ্রামে বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসাইন এ পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ খারাপ’ বলে মন্তব্য করেছেন।
সাতকানিয়া উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রত্যেকটি গ্রাম ও বাঁশখালী উপজেলার ১০টির বেশি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, উপজেলার পৌরসভা সদর এবং বিভিন্ন ইউনিয়নে পানি নামছে। তবে বাজালিয়া ইউনিয়নের দিকে পানি বাড়ছে। সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে থাকায় সড়কগুলো এখনও পানির নিচে এবং বান্দরবানের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।
তিনি বলেন, বন্যা আক্রান্ত মানুষকে সহযোগিতা করতে সকাল থেকে সেনাবাহিনীর সদস্যরাও কাজ করছে।
সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স শনিবারও ছিল পানিবন্দি। এখানে পানি ডিঙিয়ে বিভিন্ন বয়সি মানুষদের জরুরি সেবা নিতে আসতে দেখা গেছে।
উপজেলার প্রায় সব ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ গ্রামগুলো বন্যায় তলিয়ে যাওয়ায় সেখানে এখনো বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি এবং সুপেয়ে পানির সংকট সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।
সাতকানিয়া উপজেলার উত্তর ও দক্ষিণ আমিলাইশ এবং নলুয়া গ্রামের বেশিরভাগ বাড়িঘর পানির নিচে। ওই এলাকায় সংলগ্ন সাঙ্গু নদীতে পানির তীব্র স্রোত এবং ডলু খালের পাড় ভেঙে তলিয়ে গেছে লোকালয়।
নলুয়া গ্রামের বাসিন্দা কামরুল ইসলাম বলেন, “আমাদের সব রাস্তা ডুবে গেছে। অল্প কিছু অংশে গাড়ি চলছে। উত্তর আমিলাইশ পুরো প্লাবিত। যাদের বাড়ি দুই তলা তাদেরও নিচতলা ডুবে গেছে। তারা দুই তলায় আশ্রয় নিয়েছে।”
উপজেলার কেওচিয়া ইউনিয়ন বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডের মানুষ পানিবন্দি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ তথ্য মতে শনিবার সাঙ্গু নদীর দোহাজারি অংশে পানি বিপদসীমার ১৯ সেন্টিমিটার এবং বান্দরবানে ১০৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
সাতকানিয়ার বাসিন্দাদের ভাষ্য, সাতকানিয়া উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি নির্ভর করে পাহাড়ে বৃষ্টির উপর ভিত্তি করে। সাঙ্গু ও ডলু নদী, হাঙ্গর খালের মাধ্যমে পাহাড়ি ঢল নেমে আসে সাতকানিয়ার দিকে। যার কারণে বান্দরবানের দিকে বৃষ্টি হলে তার প্রভাব পড়বে সাতকানিয়া অঞ্চলে।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের দুধপুকুরিয়া এলাকায় পানির স্রোতে সেতু ভেঙে উপজেলার সঙ্গে বান্দরবানের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।
বাঁশখালী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বন্যার পানি নামছে বলে জানিয়েছেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ওমর সানি আঁকন।
তিনি বলেন, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে পানি নামতে শুরু করেছে। তবে তা একেবারে নেমে যায়নি। যার কারণে এখনও লোকজন পানিবন্দি রয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বাঁশখালী উপজেলার বন্যাদুর্গত পুকুরিয়া, সাধনপুর, কালীপুর ও বাহাড়ছড়া ইউনিয়ন সরজমিনে পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছেন।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের ইতোমধ্যে ৫৪০মেট্রিক টন চাল, রান্না ও শুকনো খাবার এবং নগদ ৪৩ লাখ টাকা টাকা বরাদ্দ ও বিতরণ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলা ও মহানগরে ৬ লাখ ৬২ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছে।
গত কয়েকদিনের অতি বৃষ্টি ও বন্যায় পানিতে ডুবে বাঁশখালীতে তিন, আনোয়ারা, সীতাকুণ্ড, হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও সাতকানিয়া উপজেলায় একজন করে মারা গেছে। চট্টগ্রাম নগরীতে মারা গেছে দুইজন।
ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী শনিবার সবচেয়ে বেশি পানিবন্দি মানুষ সাতকানিয়া উপজেলায়, ৩ লাখ ৫২ হাজার ৫০০ জন। এরপর বাঁশখালীতে দেড় লাখ।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন থেকে জানানো হয়, গত কয়েক দিনের বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে চট্টগ্রাম জেলার ১৫টি উপজেলায় ও মহানগরে ৫১৪টি সড়ক ও ১৭৬টি ব্রিজ-কালভার্ট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি অনেক স্থানে বিদ্যুৎ লাইনেরও ক্ষতি হয়েছে।
চট্টগ্রামে সাংবাদিকদের সঙ্গে মত বিনিময়কালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসাইন বলেছেন, টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতি ‘ভয়াবহ খারাপ’। স্থানীয় প্রশাসন যেরকম চাচ্ছে, আমরা ওরকম দিয়ে যাচ্ছি। আমরা রেডি, যা লাগবে তা দিব।