
X
সার্বভৌমত্বেই ফিলিস্তিনের প্রকৃত মুক্তি
একটি রাষ্ট্রের পরিচয় কেবল তার ভূখণ্ড, জনসংখ্যা বা সরকারে সীমাবদ্ধ নয়; এর মূল ভিত্তি হলো সার্বভৌমত্ব। একটি সরকার তখনই প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে, যখন সে নিজের ভূখণ্ড, সীমান্ত, নিরাপত্তা ও জনগণের ওপর স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এই সার্বভৌমত্বই রাষ্ট্রকে অন্য সব প্রশাসনিক কাঠামো থেকে পৃথক করে এবং তার অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে।
এই বাস্তবতাই আবারও সামনে এসেছে গাজাকে ঘিরে। হামাসের বেসামরিক শাসনের অবসানের পথে প্রশাসনিক পরিবর্তনের আলোচনা চলছে। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের কাছে এখন মূল প্রশ্ন একটাই—এই পরিবর্তনের মাধ্যমে কি তারা তাদের হারানো সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও নিজ ভূখণ্ডের নীতি নির্ধারণের অধিকার ফিরে পাবে, নাকি সেগুলো আগের মতোই বহিরাগত শক্তির নিয়ন্ত্রণে থেকে যাবে?
প্রায় তিন বছর ধরে ইসরায়েল ও তাদের পশ্চিমা মিত্ররা বলে আসছে, গাজায় হামাসের শাসনই শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রধান অন্তরায়। তাদের মতে, হামাস ক্ষমতায় থাকলে যুদ্ধের অবসান ও গাজার পুনর্গঠন সম্ভব নয়। সেই প্রেক্ষাপটে হামাস সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছে, তারা গাজার বেসামরিক প্রশাসনের দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি)-এর কাছে হস্তান্তর করতে প্রস্তুত।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন এখনো অনিশ্চিত। তবু এটি একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। যদি সত্যিই হামাসই প্রধান বাধা হয়ে থাকে, তাহলে হামাস-পরবর্তী গাজায় কি রাজনৈতিক মুক্তির পথ খুলবে? নাকি প্রশাসনের মুখ বদলালেও সার্বভৌমত্বহীন ফিলিস্তিনের বাস্তবতা অপরিবর্তিত থাকবে? এই প্রশ্নের উত্তরই গাজার ভবিষ্যৎ, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সম্ভাবনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সমাধানে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আন্তরিকতার প্রকৃত পরীক্ষা।
এ পর্যন্ত আলোচনায় সবচেয়ে স্পষ্ট যে প্রস্তাবটি উঠে এসেছে, তা হলো একটি টেকনোক্র্যাটিক বা বিশেষজ্ঞনির্ভর প্রশাসন। এতে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের পরিবর্তে প্রকৌশলী, চিকিৎসক, অর্থনীতিবিদ, আইনজীবী ও অন্যান্য পেশাজীবীরা গাজার জনসেবা ও পুনর্গঠনের দায়িত্ব পালন করবেন। বৃহত্তর রাজনৈতিক সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তাদের ভূমিকা সীমিত থাকবে বেসামরিক প্রশাসন পরিচালনায়।
কিন্তু এখানেই আবার নতুন প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। হামাস প্রশাসন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পরও ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র নতুন শর্ত সামনে এনেছে- হামাসকে অবশ্যই নিরস্ত্র হতে হবে। তাদের যুক্তি, দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য এটি অপরিহার্য। কিন্তু হামাস ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার ছাড়া তাদের সশস্ত্র শাখা আল-কাসাম ব্রিগেড অস্ত্র সমর্পণ করবে না। এর পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক তদারকি এবং নতুন প্রশাসনের বৈধতা নির্ধারণের প্রশ্নও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
ফিলিস্তিন প্রশ্নে সবচেয়ে বেদনাদায়ক বাস্তবতা হলো, যখনই কোনো সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক সমাধানের সুযোগ তৈরি হয়েছে, তখনই নতুন নতুন শর্ত আরোপ করে সেই পথ আরও জটিল করা হয়েছে। এই প্রবণতা নতুন নয়।
স্বাধীন রাষ্ট্রে নেতৃত্ব, সরকার বা রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে বিতর্ক স্বাভাবিক। নির্বাচন হয়, সরকার বদলায়, নতুন নেতৃত্ব আসে। কিন্তু ফিলিস্তিনের বাস্তবতা ভিন্ন। সেখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রশ্নটি কেবল জনগণের ভোটে নির্ধারিত হয় না; বহিরাগত শক্তির কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা-রাজনীতিও তা নির্ধারণে প্রভাব ফেলে। ফলে কে ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধিত্ব করবে কিংবা কোন সরকার গ্রহণযোগ্য হবে, সেই সিদ্ধান্তের ওপর তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বহু ক্ষেত্রেই সীমিত।
২০০৬ সালের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নির্বাচনে হামাস সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও সেই গণরায় আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। নির্বাচিত নেতৃত্বকে রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়, আন্তর্জাতিক সহায়তা স্থগিত হয় এবং ইসরায়েলের বিধিনিষেধ আরও কঠোর হয়। এরপর বিকল্প নেতৃত্বের আহ্বান বারবার এলেও প্রতিবারই নতুন শর্ত সামনে এসেছে।
এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ফিলিস্তিনিদের মনে গভীর অনাস্থা সৃষ্টি করেছে। তাই নতুন কোনো শান্তি উদ্যোগ এলেই তাদের কাছে আশার চেয়ে শঙ্কাই বড় হয়ে ওঠে। এটি যেন নিউটনের তৃতীয় সূত্রের রাজনৈতিক রূপক—দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্বচ্ছতা, ন্যায়বিচারের অভাব, সার্বভৌমত্বে ধারাবাহিক হস্তক্ষেপ এবং বারবার নতুন শর্ত আরোপের প্রতিক্রিয়ায় জন্ম নিয়েছে গভীর অবিশ্বাস। ফলে ফিলিস্তিনের সংকট আজ শুধু ভূখণ্ডের নয়; এটি আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধিত্ব করার বৈধ অধিকার শেষ পর্যন্ত কার? নির্বাচিত নেতৃত্ব গ্রহণযোগ্য হয় না, জাতীয় ঐক্যের সরকারও সন্দেহের মুখে পড়ে। সে ক্ষেত্রে টেকনোক্র্যাটিক প্রশাসনও বহিরাগত অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। যদি সার্বভৌমত্বই অনুপস্থিত থাকে, তবে প্রশাসনিক পরিবর্তন কি সত্যিই কোনো অর্থ বহন করে?
নিঃসন্দেহে গাজার সংকটের সমাধান সহজ নয়। হামাস একটি সশস্ত্র সংগঠন। নিরাপত্তার প্রশ্নে ইসরায়েলের নিজস্ব যুক্তি রয়েছে। ফিলিস্তিনিদের অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক মতপার্থক্য আছে। কিন্তু সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—গাজার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কার?
ধরা যাক, একটি দক্ষ টেকনোক্র্যাটিক প্রশাসন গঠিত হলো। তারা হাসপাতাল পুনর্নির্মাাণ করল, বিদ্যালয় চালু করল, বিদ্যুৎ ও জনসেবা ফিরিয়ে আনল। কিন্তু সীমান্ত, আকাশসীমা, নিরাপত্তা, পণ্য ও মানুষের চলাচল যদি বহিরাগত শক্তির নিয়ন্ত্রণেই থাকে, তাহলে সেই প্রশাসনের প্রকৃত ক্ষমতা কোথায়? সুতরাং প্রশাসনিক দক্ষতা কখনোই সার্বভৌমত্বের বিকল্প হতে পারে না।
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু তাই প্রশাসনের কাঠামো নয়, ক্ষমতার উৎস। নতুন প্রশাসনও যদি পুরোনো নিয়ন্ত্রণ, বহিরাগত অনুমোদন ও নতুন রাজনৈতিক শর্তের অধীন থাকে, তাহলে সমস্যার কেন্দ্র হামাস নয়; প্রকৃত সমস্যা সার্বভৌমত্বের অনুপস্থিতি। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য শুধু প্রশাসনিক কাঠামো নয়, স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ক্ষমতাও অপরিহার্য।
ফিলিস্তিন সংকটের স্থায়ী সমাধান তাই প্রশাসনের নাম বা নেতৃত্ব বদলে আসবে না। এর সমাধান নির্ভর করবে ফিলিস্তিনিরা তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা এবং সার্বভৌমত্ব কতটা ফিরে পায়, তার ওপর। অন্যথায় বদলাবে শুধু প্রশাসনের মুখ; সংকটের চরিত্র একই থাকবে।
সবশেষে প্রশ্নটি তাই খুবই সরল, কিন্তু গভীর- গাজায় নতুন প্রশাসন কি কেবল পুরোনো নিয়ন্ত্রণের নতুন রূপ হবে, নাকি সত্যিই ফিলিস্তিনিদের কাছে ফিরিয়ে দেবে তাদের অধিকার? এই প্রশ্নের উত্তরেই নির্ধারিত হবে ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ। কারণ, সার্বভৌমত্ব ছাড়া প্রশাসন পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু একটি জাতিকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন করা কখনোই সম্ভব নয়।
লেখক: সাংবাদিক ও ভূরাজনৈতিক গবেষক