পরকীয়া নয়, অবহেলাই কি ভাঙনের বড় কারণ?

চৌধুরী তানভীর আহম্মেদ

মতামত

একটি সংসার ভেঙে যাওয়া মানে শুধু দুটি মানুষের আলাদা হয়ে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন,

2026-07-27T17:19:41+00:00
2026-07-27T17:52:19+00:00
বুধবার ৫ আগস্ট ২০২৬ ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার ৫ আগস্ট ২০২৬
   
পরকীয়া নয়, অবহেলাই কি ভাঙনের বড় কারণ?
চৌধুরী তানভীর আহম্মেদ
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ৫:১৯ পিএম  আপডেট: ২৭.০৭.২০২৬ ৫:৫২ পিএম  (ভিজিট : ১০৪)
প্রতীকী ছবি
X

প্রতীকী ছবি

একটি সংসার ভেঙে যাওয়া মানে শুধু দুটি মানুষের আলাদা হয়ে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, ভালোবাসা, বিশ্বাস, পারিবারিক বন্ধন এবং অনেক না বলা কষ্টের গল্প। 

একটি বিবাহবিচ্ছেদের পেছনে থাকে অসংখ্য আবেগ, ত্যাগ, প্রত্যাশা ও হতাশার ইতিহাস। পরিসংখ্যানের পাতায় এটি হয়তো একটি সংখ্যা, কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি বিচ্ছেদ একটি পরিবারের জীবনে তৈরি করে গভীর শূন্যতা।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে। অনেকের প্রশ্ন- বিবাহবিচ্ছেদের মূল কারণ কি শুধু পরকীয়া? নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কোনো সংকট? সম্পর্ক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পরকীয়া অনেক সময় মূল কারণ নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অবহেলা, মানসিক দূরত্ব, যোগাযোগের অভাব এবং পারিবারিক অশান্তির একটি পরিণতি।

সম্পর্ক ভাঙনের শুরু হয় নীরবে:
একটি সম্পর্ক সাধারণত হঠাৎ করে ভেঙে যায় না। ছোট ছোট অবহেলা, অমীমাংসিত অভিমান এবং না বলা কষ্ট ধীরে ধীরে একটি দেয়াল তৈরি করে। যে দুজন মানুষ একসময় একে অপরের সবচেয়ে কাছের ছিলেন, সময়ের সঙ্গে তারাই অনেক সময় মানসিকভাবে দূরে সরে যান।

বর্তমান ব্যস্ত জীবনে অনেক দম্পতির মধ্যেই দেখা যায়-কর্মক্ষেত্র, প্রযুক্তিনির্ভর জীবন, সামাজিক চাপ কিংবা ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে একে অপরকে সময় দেওয়ার সুযোগ কমে যায়। দিনের পর দিন জমে থাকা অভিমান একসময় সম্পর্কের ভিত দুর্বল করে দেয়। একই ঘরে থেকেও অনেক মানুষ অনুভব করেন এক ধরনের একাকীত্ব। নিজের কষ্ট, হতাশা কিংবা অনুভূতি ভাগ করে নেওয়ার মতো কাউকে না পেলে কেউ কেউ অন্য কারও কাছে মানসিক আশ্রয় খুঁজতে শুরু করেন।

পরকীয়ার শুরু অনেক সময় সাধারণ পরিচয় থেকে:
ভুল সম্পর্কের শুরু অনেক সময় খুব সাধারণভাবে হয়। একটি পরিচয়, বন্ধুত্ব, নিয়মিত কথোপকথন কিংবা সহানুভূতি প্রকাশ—এসবের মধ্য দিয়েই তৈরি হতে পারে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা।

প্রথমে হয়তো দুজন মানুষ নিজেদের ব্যক্তিগত সমস্যা, মন খারাপ বা হতাশার কথা ভাগাভাগি করেন। ধীরে ধীরে তৈরি হয় মানসিক নির্ভরতা। একপর্যায়ে কেউ কেউ বুঝতেই পারেন না, কখন একটি সাধারণ সম্পর্ক সীমারেখা অতিক্রম করেছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো সম্পর্কের সংকট তৈরি হলে তার সমাধান হওয়া উচিত খোলামেলা আলোচনা, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং প্রয়োজন হলে পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে। কারণ সাময়িক আবেগের একটি সিদ্ধান্ত অনেক সময় দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ও পরিবারের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

অবহেলা: সম্পর্ক ভাঙনের অন্যতম কারণ:
একটি দাম্পত্য সম্পর্ক শুধু দায়িত্ব পালনের ওপর টিকে থাকে না। প্রয়োজন ভালোবাসা, সম্মান, যত্ন এবং মানসিক উপস্থিতি। অনেক সময় দেখা যায়, স্বামী-স্ত্রী দুজনেই নিজেদের দায়িত্ব পালন করছেন, কিন্তু একে অপরের অনুভূতির জায়গাটিতে উপস্থিত নেই।

একজন মানুষ যখন বারবার অনুভব করেন যে তার কথা শোনা হচ্ছে না, তার কষ্টের মূল্য দেওয়া হচ্ছে না কিংবা তার প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না, তখন তার মধ্যে তৈরি হতে পারে হতাশা। 

বিশেষজ্ঞরা বলেন, সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শত্রু অনেক সময় বড় কোনো ঘটনা নয়; বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট অবহেলা। কারণ অবহেলা ধীরে ধীরে ভালোবাসার জায়গা দখল করে নেয়।

সন্তানের ওপর পড়ে বিচ্ছেদের গভীর প্রভাব:
দাম্পত্য কলহ বা বিচ্ছেদের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে সন্তানদের ওপর। একটি শিশুর কাছে বাবা-মা শুধু অভিভাবক নন, তারা তার নিরাপত্তা ও ভালোবাসার প্রধান আশ্রয়।

অনেক পরিবার মনে করে, সন্তানের কথা চিন্তা করে যেকোনো পরিস্থিতিতে সংসার টিকিয়ে রাখা উচিত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিদিনের ঝগড়া, অশান্তি, অপমান এবং মানসিক চাপের পরিবেশেও শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

যে ঘরে নিয়মিত অশান্তি থাকে, সেখানে বেড়ে ওঠা সন্তান অনেক সময় ভয়, অনিশ্চয়তা এবং মানসিক চাপের মধ্যে বড় হয়। তাই শুধু একসঙ্গে থাকা নয়, সন্তানের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর অর্থ এই নয় যে বিচ্ছেদই সব সমস্যার সমাধান। বরং সম্পর্কের সংকট দেখা দিলে প্রথমে প্রয়োজন সমস্যার কারণ খুঁজে বের করা এবং তা সমাধানের আন্তরিক চেষ্টা করা।

সামাজিক চাপ ও ভুল ধারণা:
আমাদের সমাজে বিবাহবিচ্ছেদ এখনো অনেক ক্ষেত্রে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়। বিশেষ করে অনেক নারী ও পুরুষ সামাজিক চাপের কারণে অসুখী সম্পর্কেও দীর্ঘদিন থেকে যান।

‘মানুষ কী বলবে’- এই চিন্তা অনেক সময় ব্যক্তিগত সুখ ও মানসিক স্বাস্থ্যের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়। অথচ একটি সম্পর্কের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শান্তি, সম্মান এবং পারস্পরিক সহযোগিতা। শুধু সামাজিক পরিচয় ধরে রাখার জন্য এমন একটি সম্পর্ক টেনে নেওয়া, যেখানে প্রতিদিন মানসিক কষ্ট তৈরি হয়, তা সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত নাও হতে পারে।

সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন যত্ন ও শ্রদ্ধা:
একটি সুস্থ সম্পর্ক গড়ে ওঠে ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং পারস্পরিক সম্মানের মাধ্যমে। দাম্পত্য জীবনে মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু সেটি কীভাবে সমাধান করা হচ্ছে- সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

স্বামী-স্ত্রীর উচিত একে অপরের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা এবং সঙ্গীর সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করা। সম্পর্কের ছোট সমস্যাগুলো বড় হওয়ার আগেই সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রত্যেকের উচিত ব্যক্তিগত সীমারেখা, দায়িত্ববোধ এবং নৈতিক মূল্যবোধের প্রতি সচেতন থাকা।

ভাঙনের আগে প্রয়োজন সচেতনতা:
বিবাহবিচ্ছেদ শুধু একটি পারিবারিক ঘটনা নয়; এটি একটি সামাজিক বাস্তবতা। এর পেছনে যেমন ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে, তেমনি রয়েছে সম্পর্কের দীর্ঘদিনের সংকট। ভালোবাসার সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে শুধু একসঙ্গে থাকা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন একে অপরের পাশে থাকা, সম্মান করা এবং মানসিকভাবে যুক্ত থাকা।

একটি পরিবার তখনই সুন্দর হয়, যখন সেখানে থাকে নিরাপত্তা, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। আর যখন কোনো সম্পর্ক সেই ভিত্তি হারিয়ে ফেলে, তখন প্রয়োজন বাস্তবতাকে স্বীকার করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া।

ভাঙনের গল্পগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়- সম্পর্ক যত্ন চায়, সময় চায় এবং সবচেয়ে বেশি চায় পারস্পরিক সম্মান। কারণ একটি সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ভালোবাসা, আর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো অবহেলা।





Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : bulletinadbd@gmail.com
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy