
X
আব্দুল্লাহ আল মামুন
২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আর প্রবৃদ্ধির হার নয়; বরং কীভাবে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা যাবে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রকাশিত সংবাদ, আন্তর্জাতিক সংস্থার মূল্যায়ন এবং অর্থনৈতিক সূচকগুলো বলছে—আগামী অর্থবছর সহজ হবে না।
প্রথম চ্যালেঞ্জ—উচ্চ মূল্যস্ফীতি। দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। মানুষের প্রকৃত আয় কমছে, সঞ্চয় কমছে এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছে। মূল্যস্ফীতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে ভোগব্যয় কমবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে শিল্প ও ব্যবসার ওপর।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ—ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা। দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন এবং আর্থিকভাবে দুর্বল কিছু ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তা অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। ব্যাংকিং খাত দুর্বল হলে নতুন শিল্পে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাও কমে যায়। এতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়।
তৃতীয় চ্যালেঞ্জ—রাজস্ব আহরণের দুর্বলতা। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও খুবই কম। অথচ সরকারকে একই সঙ্গে উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা, ঋণের সুদ এবং ভর্তুকি বহন করতে হচ্ছে। ফলে বাজেটের ওপর চাপ বাড়ছে এবং ঋণনির্ভরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
চতুর্থ চ্যালেঞ্জ—জ্বালানি ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পণ্যের দাম বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করেছে। জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প উৎপাদন এবং পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যায়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপরই পড়ে।
পঞ্চম চ্যালেঞ্জ—বিনিয়োগে আস্থার সংকট। দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত নীতির স্থিতিশীলতা, আইন-শৃঙ্খলা, দ্রুত সেবা এবং স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রক পরিবেশকে গুরুত্ব দেন। লাইসেন্স ও অনুমোদন পেতে দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক জটিলতা, দুর্নীতির অভিযোগ এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের গতি কমিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সংস্কার কর্মসূচির অগ্রগতি এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতাও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ষষ্ঠ চ্যালেঞ্জ—কর্মসংস্থান। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কিছু বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সংকুচিত হওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং নতুন বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়ার কারণে বহু মানুষ কর্মসংস্থানের ঝুঁকিতে পড়েছেন। নতুন শিল্প না এলে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা পর্যাপ্ত সহায়তা না পেলে এই চাপ আরও বাড়তে পারে।
সপ্তম চ্যালেঞ্জ—দুর্বল প্রবৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাতের চাপ এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা একসঙ্গে প্রবৃদ্ধিকে মন্থর করতে পারে।
উপসংহার
আগামী অর্থবছরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে অর্থনীতিতে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। শুধু বড় বাজেট ঘোষণা করলেই হবে না; দরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং উন্নয়ন প্রকল্পে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত কেবল সংখ্যার হিসাব নয়; এটি মানুষের আস্থা, উদ্যোক্তার সাহস এবং রাষ্ট্রের নীতিগত বিশ্বাসযোগ্যতার সমন্বিত প্রতিফলন। আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কাজ হবে—এই আস্থা পুনর্গঠন।
আব্দুল্লাহ আল মামুন
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ভোলা বরিশাল