
X
রিয়াদ কেবল আঞ্চলিক নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতিরও কেন্দ্রবিন্দু
ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রায় আট দশক পরও স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রশ্নটি আরব–ইসরায়েল সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনিষ্পন্ন ইস্যু। এই সময়ে যুদ্ধ হয়েছে, শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, অসংখ্য কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সংঘাতের মূল রাজনৈতিক প্রশ্নটির কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। এই বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক সমীকরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে উঠে এসেছে সৌদি আরব।
২০২৪ সালে ‘টু-স্টেট সল্যুশন’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গঠিত বৈশ্বিক জোটের অন্যতম সহ-উদ্যোক্তা হয় সৌদি আরব। ইতালির রোমে অনুষ্ঠিত এই জোটের বৈঠকও প্রমাণ করে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে রিয়াদ এখন কেবল আঞ্চলিক নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতিরও কেন্দ্রবিন্দু।
তবে সৌদি আরবের এই অবস্থান নতুন নয়। বাদশাহ সালমান ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মূলত তাঁদের পূর্বসূরিদের নীতির ধারাবাহিকতাই অনুসরণ করছেন। গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে সৌদি নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি মৌলিক ধারণা—ইসরায়েলের সঙ্গে স্থায়ী ও সর্বজনগ্রাহ্য শান্তি তখনই সম্ভব, যখন তার ভিত্তি হবে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র।
এই কৌশলগত নীতির ভিত্তি স্থাপন করেন বাদশাহ ফয়সাল। তিনি ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে সৌদি জাতীয় নিরাপত্তানীতির অংশে পরিণত করেন। ১৯৮১ সালের ‘ফাহদ পরিকল্পনা’ এবং ২০০২ সালের ‘আরব শান্তি উদ্যোগ’ সেই নীতিরই ধারাবাহিক রূপ। উভয় প্রস্তাবেই অধিকৃত ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলের প্রত্যাহার এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিনিময়ে আরব বিশ্বের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ, সৌদি আরবের কাছে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া কখনোই ধারাবাহিক দুটি ধাপ নয়; বরং একই শান্তি কাঠামোর দুটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এই অবস্থানের পেছনে শুধু পররাষ্ট্রনীতি নয়, রাষ্ট্রীয় বৈধতার প্রশ্নও রয়েছে। সৌদি বাদশাহ কেবল রাষ্ট্রপ্রধান নন, তিনি দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম। ফলে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক বিবেচনার পাশাপাশি ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভবিষ্যতে আলোচনার প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে সেই বৈধতা অর্জন সম্ভব নয়; সৌদি নেতৃত্বের কাছে বাস্তবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই তার একমাত্র গ্রহণযোগ্য ভিত্তি।
২০২০ সালের আব্রাহাম চুক্তি এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, পরে মরক্কো ও সুদান ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করলেও ফিলিস্তিন প্রশ্নের কোনো সমাধান হয়নি। চুক্তিটি আঞ্চলিক কূটনীতিতে পরিবর্তন এনেছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি শান্তির রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে পারেনি। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক প্রশাসনগুলো সৌদি আরবকে এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুপস্থিত অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করেছে। রিয়াদকে ছাড়া আব্রাহাম চুক্তির পরিধি বাড়তে পারে, কিন্তু তার কৌশলগত পূর্ণতা আসে না।
৭ অক্টোবরের হামলা এবং পরবর্তী গাজা যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক বাস্তবতাকে আমূল বদলে দিয়েছে। যুদ্ধবিরতি, পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিক সমাধানের নতুন উদ্যোগ সামনে এলেও সৌদি আরবের মূল অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে—প্রথমে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বাস্তবায়ন, তারপর সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ।
এই অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব। আরব বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র জি–২০ সদস্য, বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি শক্তি এবং অপরিশোধিত তেলের সর্ববৃহৎ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে সৌদি আরবের সিদ্ধান্ত কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তার প্রভাব গোটা আরব ও মুসলিম বিশ্বে পড়ে।
এ কারণেই সৌদি আরবের সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের প্রভাব লেবানন, সিরিয়া, ইরাক কিংবা আলজেরিয়ার মতো দেশগুলোর ওপরও পড়তে পারে। এসব রাষ্ট্র এখনো ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি। একইভাবে পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম দেশগুলোও ফিলিস্তিন প্রশ্নের ন্যায়সংগত সমাধান ছাড়া সেই পথে হাঁটেনি। যদি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তিতে সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতায় পৌঁছায়, তাহলে এসব দেশের কূটনৈতিক অবস্থান পুনর্বিবেচনার পরিবেশও উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে যেতে পারে।
সেখানেই সৌদি আরবের সম্ভাব্য ভূমিকা আব্রাহাম চুক্তি থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন। এটি শুধু আরেকটি আরব রাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্থাপনের প্রশ্ন নয়; বরং এমন একটি সিদ্ধান্ত, যা আরব ও মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত সফল হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এই প্রক্রিয়ায় ইসরায়েল, ফিলিস্তিন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রত্যেকেরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের কৌশলগত অবস্থান স্পষ্ট—স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া একই শান্তি প্রক্রিয়ার দুটি সমান্তরাল শর্ত। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটির স্থায়ী বৈধতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। মধ্যপ্রাচ্যে টেকসই শান্তির ভবিষ্যৎও অনেকাংশে নির্ভর করছে এই নীতিকে ঘিরেই।
লেখক: সাংবাদিক ও ভূরাজনৈতিক গবেষক